নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের অর্ধেকই ঋণগ্রস্ত: সুজন

ফন্ট সাইজ:

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে অর্ধেকই ঋণগ্রস্ত বলে জানিয়েছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। এ ছাড়া নির্বাচনে নানা প্রশ্ন উঠলেও কোনো তদন্ত ছাড়াই নির্বাচন কমিশনের গেজেট প্রকাশ করার সমালোচনা করেছে সংস্থাটি। বলা হয়েছে, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ওঠা প্রশ্নের তদন্ত করার পর গেজেট প্রকাশ করা নির্বাচন কমিশনের উচিত ছিল। বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের তথ্য উপস্থাপন করেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক দিলীপ কুমার সরকার।
সুজন সম্পাদক বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আপাতদৃষ্টিতে শান্তিপূর্ণ মনে হলেও নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা তদন্ত করার পর গেজেট প্রকাশ করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ছিল। অভিযোগ উঠলে নির্বাচন কমিশন তদন্ত করে প্রয়োজনে ফলাফল বাতিল কিংবা পুনঃনির্বাচনের নির্দেশ দিতে পারে। তার অভিযোগ, এবারের নির্বাচনেও নানা প্রশ্ন উঠলেও কোনো তদন্ত ছাড়াই গভীর রাতে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করেছিলাম ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের নিয়ে তদন্ত করে গেজেট প্রকাশ করতে।
তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে অনেক প্রার্থীর বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ ছিল। কেউ কেউ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ (স্টে অর্ডার) নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। পাশাপাশি দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তিনি দাবি করেন, নির্বাচন সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে সুপারিশ করা হয়েছিল নির্বাচনের অন্তত ছয় মাস আগে ঋণখেলাপিদের ঋণ নিয়মিত করতে হবে এবং কোনোভাবেই ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশ নিতে দেয়া যাবে না। এসব সুপারিশ অনুসরণ করা হলে বর্তমান বিতর্কের সৃষ্টি হতো না।
ভোটের হার উল্লেখ করে দিলীপ কুমার সরকার বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫৯.৪৪% ভোট পড়েছে। গণভোটে বাতিলকৃত ভোটের সংখ্যা ৭৪ লাখ ২২ হাজার ৬৩৭টি (৯.৫৫%)। গণভোটে সর্বমোট প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ০২৩টি; যা শতকরা হারে ৬০.২৬%।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ত্রয়োদশ সংসদে আধিক্য রয়েছে ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও পারিবারিকভাবে সম্পদশালীদের। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এই নির্বাচনে ঋণগ্রহীতার হার বৃদ্ধি পেয়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই হার ছিল ৪৪.৮১%; বর্তমানে হার ৪৯.৪৯%। নির্বাচনে বিজয়ী ২৯৭ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ১৪৭ জন ঋণগ্রহীতা। এদের মধ্যে পাঁচ কোটি টাকার অধিক ঋণ গ্রহণ করেছেন ৩৬ জন এবং ১২৬ জন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
নারী প্রার্থীদের তথ্য জানিয়ে বলা হয়, এই নির্বাচনে ৮৫ জন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৭ জন বিজয়ী হয়েছেন। এই ৭ জনের মধ্যে ৬ জন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এবং একজন স্বতন্ত্র। এ ছাড়া ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের ৭৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। বিজয়ী হয়েছেন ৪ জন। এই ৪ জনই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সদস্য। দলটি থেকে ৬ জন সংখ্যালঘু প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সর্বমোট ২৯৭ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ১৪৭ জন ঋণ গ্রহীতা।
শীর্ষ দশজন ঋণগ্রহীতার তালিকা প্রকাশ করে সুজন। তারা হলেন- হবিগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য এস এম ফয়সলের ঋণের পরিমাণ ২ হাজার ১৬ কোটি ৮০ লাখ ৮৯ হাজার ৭৩৭ টাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. খালেদ হোসেন মাহবুবের ঋণ ১ হাজার ৪শ’ ৪২ কোটি ৯৫ লাখ ৬০ হাজার ৩৩৪ টাকা, চট্টগ্রাম-৬ আসনের সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর ঋণ ১ হাজার ৩৫৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা, মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আফরোজা খানমের ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৩শ’ ৩৪ কোটি ৫২ লাখ ১৩ হাজার ৯৯৫ টাকা, মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল্লাহ’র ঋণ ১ হাজার ১১৪ কোটি ৬ লাখ ৭২ হাজার ৫৯০ টাকা, সিলেট-১ আসনের খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের ঋণ ৮৩৯ কোটি টাকার বেশি, বগুড়া-১ আসনের কাজী রফিকুল ইসলামের ঋণ ৭৪৬ কোটি ৬ লাখ ৪ হাজার ৫৬৩ টাকা, শরীয়তপুর-৩ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপুর ঋণ ৩২৬ কোটি ৬ লাখ ৫৪ হাজার ৫৬৩ টাকা, ফেনী-৩ আব্দুল আউয়াল মিন্টুর ঋণ ২৯৫ কোটি ৪০ লাখ ১৩ হাজার ৯৭৫ টাকা এবং রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের ঋণ ২৯৫ কোটি ২৮ লাখ ৩৪ হাজার ৬৪৫ টাকা।
প্রার্থীদের বয়স প্রসঙ্গে বলা হয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্যের মধ্যে ১১ জনের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে নির্বাচিত সকল সংসদ সদস্যই বয়সে তরুণ অর্থাৎ ৩৫ বছরের কম বয়সী। অপরদিকে ৩৫-ঊর্ধ্ব থেকে ৫৫ বছর বয়সী ৮৫ জন, ৫৫-ঊর্ধ্ব থেকে ৭৫ বছর বয়সীর সংখ্যা ১৮০ জন। ৭৫ বছর ঊর্ধ্ব বয়স ১৯ জনের এবং ৭৫ ঊর্ধ্ব সকলেই বিএনপি থেকে নির্বাচিত।
সুজন আরও জানায়, দ্বাদশ সংসদের তুলনায় ত্রয়োদশ সংসদে বিজয়ীদের মামলা সংশ্লিষ্টতা বেশি। এবারের নির্বাচনে বিজয়ী ১৪২ জনের বিরুদ্ধে বর্তমানে মামলা রয়েছে এবং ১৮৫ জনের বিরুদ্ধে অতীতে মামলা ছিল। মামলা সংশ্লিষ্টতায় বিএনপি এগিয়ে, দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। বর্তমানে ৪৩ জনের বিরুদ্ধে ৩০২ ধারায় মামলা রয়েছে; অতীতে ছিল ৪২ জনের বিরুদ্ধে।
প্রার্থীদের সম্পদ বিশ্লেষণ করে সুজন জানায়, নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্যদের মধ্যে ২৭১ জনের সম্পদ কোটি টাকার অধিক। বিএনপি’র ২০৯ জন সংসদ সদস্যদের মধ্যে ২০১ জন কোটি টাকার অধিক সম্পদের মালিক। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদের মধ্যে কোটিপতির সংখ্যা বেশি। আয়কর সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, ২৬৮ জন আয়কর প্রদানকারীদের মধ্যে ৩৬ জন কর প্রদান করেন ৫ হাজার বা তার কম। ১৩৬ জন লক্ষাধিক টাকার আয়কর প্রদান করেন। এ ছাড়া বাৎসরিক আয় বিশ্লেষণ করে জানা যায়, কোটি টাকার বেশি আয়কারী এমপিদের মধ্যে ৪৩ জন বিএনপি’র এবং একজন জামায়াতে ইসলামীর। ৩৩ জনের বার্ষিক আয় পাঁচ লাখ টাকার কম, ১৩৮ জনের ৫ থেকে ২৫ লাখ টাকা, ৪৫ জনের ২৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা, ২৯ জনের ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা এবং ৪৬ জনের আয় ১ কোটির বেশি।
সুজন আরও জানায়, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে ব্যবসায়ীদের হার বেশি। বিজয়ী ২৯৭ জন সংসদ সদস্যদের মধ্যে ১৮২ জনের পেশা ব্যবসা, ৩৬ জনের পেশা আইন, ২২ জনের পেশা শিক্ষা, ১৩ জনের কৃষি, ৮ জনের রাজনীতি এবং ৫ জন চাকরিজীবী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির জাতীয় কমিটির সদস্য একরাম হোসেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন