বর্তমানে গণহত্যা আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসাবে স্বীকৃত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে একাত্তরে যত নৃশংস গণহত্যা ঘটেছিল বিশ্বে আর কোথাও এমন ঘটনা ঘটেছিল বলে জানা নেই। এমনই একটি গণহত্যার ঘটনা ঘটে ১৯৭১ সালের ২০শে মে চুকনগরে। ইতিহাসের প্রয়োজনে এই একক গণহত্যার বিশ্ব স্বিকৃতির দাবিতে আজ সোচ্চার মানুষ। খুলনা জেলার পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত চুকনগর বাজার। কোন কিছু বোঝার আগেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অস্ত্র দিয়ে বের হতে থাকে গুলি আর গুলি। পাখির মতো মরতে থাকে মানুষ। পাশেই বয়ে চলা ভদ্রা নদীতে ফেলা হয় কয়েক হাজার মানুষের লাশ। সেদিন রক্তে লাল হয়ে যায় ভদ্রা নদীর পানি।
চুকনগরের গণহত্যায় কত লোক শহীদ হয়েছিল তার প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে রয়েছে দ্বিধাদ্বন্ধ। প্রকৃত সংখ্যা না পাওয়া গেলেও ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষ গণহত্যার শিকার হয়েছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা থেকে তথ্য পাওয়া যায়। ভদ্রা, খড়িয়া, ঘ্যাংরাইল নদী ও কাঁচা রাস্তায় দাকোপ, বটিয়াঘাটা, রামপাল, তেরখাদা ও ফকিরহাট থেকে খুলনা-ডুমুরিয়া হয়ে চুকনগর ছিল তখনকার বিবেচনায় ভারতমুখো সর্বাধিক নিরাপদ পথ। পার্শ্ববর্তী জেলা থেকেও সহজেই শরণার্থীরা পৌঁছে যেত চুকনগরে। অন্যদিকে সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় ট্রানজিট রুট হিসাবে সবসময় ব্যস্ততা লেগেই থাকতো। এলাকার ফসলি জমিতে আজও পাওয়া যায় সেদিনের শহীদদের হাড়গোড় ও শরীরে থাকা বিভিন্ন অলংকার। স্থানীয়দের দেয়া তথ্যমতে, ভদ্রা নদীতে লাশ ফেলার দায়িত্ব দেয়া হয়েছি প্রায় ২৫ জনকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে প্রথমে যতগুলো লাশ গুনে রাখা হয়েছিল তার চেয়ে বেশি লাশ ভদ্রা নদীতে ফেলা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন খুলনা ও বাগেরহাট ও এর আশেপাশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ চুকনগর হয়ে ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এজন্যে একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে রাতের মধ্যেই চুকনগরে এসে পৌঁছায়।
ওই রাতে কয়েক হাজার মানুষ পাতোখোলা বিল, কাঁচাবাজার, মাছবাজার, কাপুড়িয়া পট্টি, কালী মন্দিরসহ বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করে। পরদিন ২০শে মে সকালে কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাক বাহিনীর একটি ট্রাক ও একটি জিপ এসে চুকনগর সাতক্ষীরা সড়ক ধরে মালতিয়া মোড়ের ঝাউতলায় এসে হঠাৎ থেমে যায়। রাস্তার পাশে পাট ক্ষেতে কাজ করছিলেন চিকন আলী মোড়ল নামের এক বৃদ্ধ। গাড়ির শব্দে উঠে দাঁড়ালে পাকবাহিনী প্রথমে তাকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর একই গ্রামের সুরেন্দ্র নাথ কুণ্ডুকে হত্যা করে। তারপর চুকনগর বাজারের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করতে থাকে নিরীহ মানুষদের। কিছু সময়ের মধ্যেই নিরব হয়ে যায় চুকনগরের এলাকা। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি নিষ্ঠুর ও জঘন্যতম দিন। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য চুকনগরের গণহত্যার ঘটনাটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্থান পায়নি। শুধুমাত্র চুকনগরে সেদিনের শহীদদের স্মরণে নির্মাণ করা হয়েছে একটি বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ। এজন্য ২০ মে জাতীয় গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়াসহ বিশ্ব স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
চুকনগর গণহত্যা একাত্তর স্মৃতিরক্ষা পরিষদের সভাপতি সাবেক অধ্যক্ষ এবিএম শফিকুল ইসলাম বলেন, চুকনগর গণহত্যা পৃথিবীর সবচাইতে বড় গণহত্যা। একইস্থানে এত মানুষের হত্যার ঘটনা আমার জানা নেই। ৫৪ বছর পরে হলেও প্রকৃত ইতিহাসের প্রয়োজনে এই স্বীকৃতি আমাদের দরকার।
