অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সাবেক এমপি মিতার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

ফন্ট সাইজ:

চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও রূপালী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান মিতার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বুধবার দুদকের চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-২ মামলাটি করেন একই কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মুসাব্বির আহমেদ।
জানা যায়, চট্টগ্রাম-৩ আসনের সাবেক সংসদ-সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতা ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনবার এমপি ছিলেন। দায়িত্ব পালনকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন তিনি। তবে ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর চট্টগ্রামের কোথাও তাকে দেখা যায়নি। অনেকটা আত্মগোপনে চলে গেছেন। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, মাহফুজুর রহমান ২০০২-০৩ করবর্ষ থেকে ২০২৪-২৫ করবর্ষ পর্যন্ত আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছেন। অনুসন্ধানে দেখা যায়, সংসদ সদস্য হিসেবে ভাতা ও সম্মানী, গৃহভাড়া, লভ্যাংশ, ঋণ, গাড়ি বিক্রি এবং অন্যান্য উৎস মিলিয়ে তিনি মোট ১০ কোটি ৬৬ লাখ ৮৩ হাজার ৭৪৯ টাকা আয় দেখিয়েছেন। তবে আয়কর নথিতে প্রদর্শিত ব্যবসা ও মৎস্য খাতের উল্লেখযোগ্য অঙ্কের আয়ের পক্ষে অনুসন্ধানকালে গ্রহণযোগ্য কোনো কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। একইভাবে ২০১১-১২ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষ পর্যন্ত স্ত্রীর কাছ থেকে ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ঋণ নেয়ার দাবি করা হলেও এর বৈধ উৎস বা প্রমাণ মেলেনি বলে জানিয়েছে দুদক।

রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট সময়ে তার পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয় ছিল ৯ কোটি ৯১ লাখ ৪৬ হাজার ৪৩২ টাকা। এতে তার সঞ্চয় দাঁড়ায় ৭৫ লাখ ৩৭ হাজার ৩১৭ টাকা। অন্যদিকে অনুসন্ধানে তার নামে ২ কোটি ২৩ লাখ ৯৮ হাজার ৮২২ টাকার স্থাবর এবং ৮ কোটি ৩৯ লাখ ৬৮ হাজার ৬৪২ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে মোট সম্পদের পরিমাণ ১০ কোটি ৬৩ লাখ ৬৭ হাজার ৪৬৪ টাকা। ব্যয় বাদে বৈধ সঞ্চয়ের তুলনায় ৯ কোটি ৮৮ লাখ ৩০ হাজার ১৪৭ টাকার সম্পদের উৎস পাওয়া যায়নি বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগের সময়কাল ধরা হয়েছে ২০০২ সাল থেকে ৩০শে জুন ২০২৪ পর্যন্ত।
দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এর উপপরিচালক সুবেল আহমেদ বলেন, সাবেক সংসদ সদস্য ও রূপালী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত প্রায় ৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। মামলায় দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তকালে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জানা যায়, ২০২০ সালে মিতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অনুসন্ধানে নেমে সেখান থেকে সরে আসে দুদক। মিতার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগটি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে কঠোর গোপনীয়তা অবলম্বন করে কমিশন। ২০২১ সালে অভিযোগ নিষ্পত্তির বিষয়টি অনুমোদন করার পর ২রা মার্চ তৎকালীন দুদক সচিব ড. মু. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার অব্যাহতির বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠি দিয়ে জানান। এরপর বিষয়টি মাহফুজুর রহমান মিতাকে চিঠি দিয়ে জানানোর পাশাপাশি মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সচিবকে অনুলিপি দিয়ে জানানো হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে ৯ই মার্চ অবসরে যাওয়া দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের আগ্রহে তড়িঘড়ি করে মিতার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শেষ করা হয়।
সূত্র জানায়, ২০১৮ সালে দ্বিতীয় দফায় এমপি হওয়ার পর আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন মাহফুজুর রহমান মিতা। ওই সময় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১৯৭ কোটি টাকার বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আনোয়ার ল্যান্ডমার্ক, মেসার্স বিশ্বাস বিল্ডার্স ও মেসার্স ডলি কনস্ট্রাকশনের কাছ থেকে ১০ শতাংশ কমিশন আদায় করেন তিনি। শুধু তাই নয়, ঠিকাদাররা কাজ শুরু করলে সেখানে অনৈতিক হস্তক্ষেপ করে নিজের লোক দিয়ে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী সরবরাহ করেন চট্টগ্রাম-৩ আসনের সাবেক এই এমপি। এ ছাড়া বিআইডব্লিউটিএর গুপ্তছড়া জেটি নির্মাণ দুর্নীতিতেও মাহফুজুর রহমান মিতার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া যায় সে সময়। সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া ঘাটে ৫২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা দিয়ে নতুন একটি জেটি নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছিল তৎকালীন সরকার। তা নির্মাণের কাজ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এসএস রহমানকে দেয়ার জন্য ডিও দিয়েছিলেন মিতা। এখানেও কমিশনের বিনিময়ে নিজস্ব ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া ২০১৮ সালের সন্দ্বীপের পিআইও অফিস থেকে টেন্ডার হওয়া ২৭টি ব্রিজের কাজ সাবেক এমপি মিতা তার নিজস্ব লোকজনের মধ্যে ১৫ শতাংশ টাকা কমিশনের বিনিময়ে ভাগ-বাটোয়ারা করেন বলে জানা যায়। দুদক সূত্রে জানা গেছে, টেন্ডার ও কমিশন বাণিজ্যের হাত থেকে রক্ষা পায়নি সন্দ্বীপের শিক্ষা খাতও। ২০২০ সালে দুদকে আসা অভিযোগে বলা হয়, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাজের টেন্ডারে কোনো ঠিকাদার মিতার অনুমতি ছাড়া অংশ নিতে পারেননি। নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশন দেয়ার বিনিময়ে এই অধিদপ্তরের সব টেন্ডারে এমপি মনোনীত একজন করে ঠিকাদার অংশ নেন। কমিশন নিয়ে কাজ পাইয়ে দেয়ার ওয়াদা দিয়ে তা রক্ষা করেন মিতা। ফলে সেই কাজও পান তার আশীর্বাদপুষ্ট ঠিকাদার।



কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন