এসপিএম প্রকল্পে অনিয়ম, তদারকির অভাবে ঝুঁকির মুখে

এসপিএম প্রকল্পে অনিয়ম, তদারকির অভাবে ঝুঁকির মুখে

ফন্ট সাইজ:

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এসপিএম প্রকল্পের অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক দরপত্রকে ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। মহেশখালী-মাতারবাড়ী এলাকায় জাহাজ থেকে তেল খালাসের জটিলতা দূর করতে নেয়া এসপিএম উইথ ডাবল পাইপলাইন প্রকল্প। সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পটি অনিয়ম, নিম্নমানের কাজ আর দুর্নীতির এক গোলকধাঁধায় আটকে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নকশা অনুযায়ী কাজ না হওয়া এবং তদারকির অভাবে প্রকল্পটি এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে। প্রকল্পের কাজ শেষ না হতেই মোটা অঙ্কের টাকা ছাড় করানো নিয়ে রয়েছে রহস্য। নেপথ্যে আলোচিত হচ্ছে পলাতক সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ ও তার ঘনিষ্ঠদের নাম।

সংশ্লিষ্ট মহল অভিযোগ তুলেছে, এই দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতার মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে, যা দেশের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ব্যবস্থাপনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি দরপত্র জমা দেয়ার শেষ তারিখ নির্ধারণ করা হয়। তবে এই সময়টি ছিল জাতীয় নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন পর এবং নতুন মন্ত্রিসভার শপথের দিন, যা অনেকের মতে একটি ‘স্পর্শকাতর সময়’। এই প্রেক্ষাপটে দরপত্র গ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাকে অস্বাভাবিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনরা।
তথ্য অনুযায়ী, মোট ৯টি আন্তর্জাতিক কোম্পানি দরপত্র ক্রয় ও প্রি-বিড মিটিংয়ে অংশ নিলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র ৩টি প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত প্রস্তাব জমা দেয়। এটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের ঘাটতির একটি বড় প্রমাণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দরপত্র আহ্বানের সময়সূচি নির্বাচনকালীন অস্থিরতার সঙ্গে মিলে যাওয়ায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রস্তুতির পর্যাপ্ত সময় পায়নি। ওই সময় ভিসা অন অ্যারাইভাল সুবিধা স্থগিত ছিল এবং বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দল পাঠানো, প্রকল্প মূল্যায়ন এবং পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব প্রস্তুত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

জাহাজ থেকে তেল খালাসের জটিলতা দূর করতে নেয়া হয় এসপিএম উইথ ডাবল পাইপলাইন প্রকল্প। এসপিএম মহেশখালী দ্বীপের পশ্চিম পাশে বঙ্গোপসাগরে স্থাপন করা হবে। বিদেশ থেকে বড় জাহাজে আমদানি করা জ্বালানি তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে মহেশখালী এলাকায় স্থাপিত স্টোরেজ ট্যাংকে জমা হবে। সেখান থেকে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ডিপো, ইস্টার্ন রিফাইনারির স্টোরেজ ট্যাংক ছাড়াও প্রয়োজনে তেল বিপণন কোম্পানির বিভিন্ন স্টোরেজ ট্যাংকে জমা করা যাবে। এসপিএম প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৫ সালের নভেম্বরে। ২০২৩ সালের জুনে চালু করার কথা ছিল। কিন্তু নানা রকম অনিয়ম এবং সিন্ডিকেটের বেড়াজালে আটকা পড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, যে কোনো প্রকল্পের কাজ শেষে ‘প্রজেক্ট কমপ্লিশন রিপোর্ট’ (পিসিআর) জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এসপিএম-এর ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয়নি। মূলত নকশা অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন না হওয়া এবং কারিগরি ত্রুটির কারণেই প্রতিবেদন তৈরি বা জমা দেয়া যাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পের কাজ বাস্তবে যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়নি। নির্মাণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত নিম্নমানের মালামাল ব্যবহার করা হয়েছে এবং নির্মাণশৈলী বা ‘ওয়ার্কম্যানশিপ’ ছিল অত্যন্ত নাজুক। যাদের দিয়ে এই কাজ করানো হয়েছে, তাদের এ ধরনের বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। প্রকল্পের সুপারভিশন বা তদারকি ব্যবস্থাও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। মূল নকশা অনুসরণ না করায় প্রকল্পটি এখন কারিগরিভাবে ত্রুটিপূর্ণ রয়ে গেছে। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ মানবজমিনকে বলেন, টেন্ডারের বিষয়টি এখনও ক্লোজ হয়নি। টেকনিক্যাল বিষয়টি মূল্যায়ন হচ্ছে। কোনো অস্বচ্ছতার বিষয় থাকলে দেখা হবে। তবে আমার কাছে এখনও ফাইলটি আসেনি। ফাইল এলে দেখবো।


ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন