প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, কারও রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবশালী অবস্থান দেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে থেমে গেলে চলবে না। যে অপরাধী, তাকে অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। আপনারা আইনের লোক, কোনো বিশেষ দলের নন। কারও রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবশালী পরিচয় দেখে থমকে যাবেন না। যে অপরাধী, তাকে অপরাধী হিসেবেই গণ্য করবেন। গতকাল সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার আপসহীন। একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে প্রথম কাজ। পুলিশ প্রশাসনের নির্দিষ্ট কিছু পদ নয়, বরং প্রতিটি পদই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে কর্মকর্তা যে পজিশনেই দায়িত্বরত থাকুন না কেন, প্রশাসনের সকল পদে কাজ করার পেশাদার মানসিকতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। শুধুমাত্র পদোন্নতি কিংবা পছন্দের জায়গায় পোস্টিংয়ের প্রত্যাশা করলে তা পেশাদারিত্বের সঙ্গে আপস হয়ে যায়। নিজের চাহিদা অনুযায়ী পোস্টিং পেলে সাময়িকভাবে তুষ্ট হওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু এটি প্রফেশনালিজমের পরিপন্থি। তাই আহ্বান থাকবে, যার যেখানে দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে, সেই কাজটি গুরুত্বসহকারে পালন করুন। তবেই আমরা একটি দক্ষ, গতিশীল এবং পেশাদার পুলিশ প্রশাসন গড়ে তুলতে পারবো।
এ সময় তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার যেমন চিরস্থায়ী নয়, তেমনি প্রশাসনের কোনো পদই কারও জন্য চিরকাল সংরক্ষিত থাকে না। আমরা চিরস্থায়ী নই। এটি অতীতেও বিভিন্ন সময় প্রমাণিত হয়েছে এবং পৃথিবীর সব দেশেও এটি প্রমাণিত। ঠিক একইভাবে জনপ্রশাসন কিংবা পুলিশ প্রশাসনের কোনো পদও কারও জন্যই চিরস্থায়ী নয়।
তারেক রহমান বলেন, প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের ধরন পাল্টে গেছে। বর্তমানে পুলিশিং আর কেবল শহর বা জেলার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। ‘ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইম (আন্তর্জাতিক সংঘবদ্ধ অপরাধ)’ এখন বড় বাস্তবতা। কয়েক দশক আগের তুলনায় বর্তমানের চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি বিস্তৃত। তাই প্রতিটি পুলিশ কর্মকর্তাকে আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ এবং বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হতে হবে। সময়ের এই দাবি পূরণ করতে না পারলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব হয়ে পড়বে। সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, গণতান্ত্রিক, নিরাপদ ও মানবিক একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই মন্তব্য করে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনি ইউনিফর্মের বাইরে গিয়ে আমার এই কথার সঙ্গে একমত পোষণ করবেন। আমি বিশ্বাস করি, একজন নাগরিক হিসেবে ইউনিফর্মে থেকেও আপনি একজন মানুষ হিসেবে এই আকাক্সক্ষার প্রতিফলন চাইবেন। একজন বাংলাদেশি হিসেবে এই কথাটি শুধু একটি সেøাগান নয়, আমরা এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে চাই।
তিনি বলেন, সারা দেশের মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আপনারা সরাসরি ভূমিকা রাখছেন। আপনাদের ওপর অর্পিত এই দায়িত্ব যদি সফলভাবে পালনে সক্ষমতার পরিচয় দেন, তবে আমি বিশ্বাস করি একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে আমরা একধাপ এগিয়ে যেতে সক্ষম হবো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৌশলী ও ইতিবাচক কার্যক্রমের মাধ্যমে পুলিশের ওপর জনগণের আস্থা ও নির্ভরতা সৃষ্টি হলে ৫ই আগস্ট পরবর্তী মব ভায়োলেন্স-এর মতো সমস্যাগুলো সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব। গত দেড়-দুই বছরে এমন অনেক পরিস্থিতি আপনারা দক্ষতার সঙ্গে সামাল দিয়েছেন। দীর্ঘ দুই দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের পর ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বর্তমান সরকার জনগণের কাছে একটি গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক সরকার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এই সরকার পুলিশ বাহিনীকে এমন এক রূপে দেখতে চায় যেখানে পুলিশ হবে সত্যিকারের জনবান্ধব এবং মানুষের আস্থার প্রতীক। সাধারণ মানুষ যেন পুলিশ প্রশাসনকে সরকারের দর্পণ বা আয়না হিসেবে দেখতে পায়। সুতরাং পুলিশ প্রশাসনের সাফল্য মানেই সরকারের সফলতা। একটি শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনে আপনাদের ভূমিকা অপরিহার্য।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সততা, মেধা এবং দক্ষতাই হবে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির মূল নীতি। এই নীতি বাস্তবায়নে কর্মকর্তাদের আন্তরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। পুলিশের দায়িত্ব যেহেতু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না এবং দিন-রাত এমনকি ছুটির দিনেও কাজ করতে হয়, তাই পুলিশ সদস্যদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করার ব্যাপারে সরকার অত্যন্ত আন্তরিক। তিনি বলেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণে আপনাদের উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় করতে হয়, যা দায়িত্বেরই অংশ। বর্তমান সরকার জনগণের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে চায়। তবে কেউ যেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট বা কোনো প্রকার নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে না পারে, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহার এবং জনগণের সামনে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ-এর প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবে। এ নিয়ে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই।
সরকার প্রধান বলেন, পুলিশ আন্তরিক হলে আইনি ও কৌশলগত ভূমিকার মাধ্যমে অনেক বড় দাঙ্গা বা ঘটনা শুরুতেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তিনি পুলিশকে ‘সরকারের আয়না’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, পুলিশের আচরণের ওপরই নির্ভর করে মানুষ সরকারকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে। তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলেন, কোনো ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড বরদাস্ত করা হবে না। দেশের সব ধর্মের মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করা পুলিশের নৈতিক দায়িত্ব।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্যে বিগত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের ফলে সৃষ্ট ভঙ্গুর অর্থনীতির চিত্র তুলে ধরেন। অডিটর জেনারেলের প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি কয়েকটি চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কোয়ার্টারের জন্য একেকটি বালিশ কেনা হয়েছে ৮০ হাজার টাকায়। যেখানে পাশের দেশে একই ধরনের প্রকল্প ১৪ হাজার কোটি টাকায় শেষ হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশে খরচ হয়েছে প্রায় ৯৬ হাজার কোটি টাকা। ৩০ হাজার টাকার ড্রেসিং টেবিলের দাম দেখানো হয়েছে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। কর্ণফুলী টানেলের দুই পাশে গাছ লাগানোর জন্য বরাদ্দ ৫০ কোটি টাকা কোনো কাজ ছাড়াই তুলে নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া টানেলের পাশে অপ্রয়োজনীয় বিলাসবহুল (লাক্সারি) অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণে শত শত কোটি টাকা অপচয় করা হয়েছে।
পিরোজপুর জেলার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, একটি মন্ত্রণালয় (এলজিআরডি) থেকে কাজ না করেই কেবল কাগজ দেখিয়ে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে একটি জেলাতেই প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার হদিস নেই। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই যে অপ্রয়োজনীয় খরচ ও ঋণ, এর বোঝা দেশের ২০ কোটি মানুষের মাথার ওপর। আজ যদি এই টাকাগুলো থাকতো, তবে আপনাদের আবাসন, পরিবহন (ট্রান্সপোর্টেশন) এবং আইটি ইউনিটের দাবিগুলো আমরা মুহূর্তেই পূরণ করতে পারতাম। বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রী ২০২৬ সালের পুলিশ সপ্তাহের স্লোগান- ‘আমার পুলিশ, আমার দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ সার্থক করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আসুন, আমরা আমাদের অবস্থান থেকে দেশকে কতটুকু দিতে পারি, সেই শপথ নিই। শাপলা হলের এই অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

SM Rafiqul Islam
২ মাস আগেমাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে স্বাগত জানাই।দেশ থেকে দূর্ণীতি রোধে সরকারকে কঠোর হওয়ার বিকল্প নেই। সরকারি দপ্তরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দূর্ণীতি ক্যান্সারের মত ছড়িয়ে পড়েছে। কোন কর্মকর্তার কাজের জবাবদিহিতা নেই। সুতরাং সরকারী কর্মকর্তাদের সবাইকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। জাজাকআল্লাহ খাইরান।