দেশে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন করে শিক্ষা আন্দোলনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন নাগরিক প্ল্যাটফরমের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ‘সরকারের অগ্রাধিকার ও শিক্ষা খাত: বাজেট বাস্তবতা’ শীর্ষক সংলাপে তিনি এই মন্তব্য করেন। সংলাপে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফরমের আয়োজনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডি’র অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, শুধু শিক্ষার্থীদের স্কুলে ভর্তি করালেই হবে না। যে শিক্ষার্থী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হচ্ছে, তার মান কেমন হচ্ছে- সেটাই এখন বড় বিষয়। তিনি বলেন, আগে আমরা শিক্ষায় প্রবেশাধিকার নিয়ে লড়াই করেছি। এখন সময় এসেছে শিক্ষার ফলাফল নিয়ে লড়াই করার। শিক্ষা খাতে নানা ধরনের সংকট ও বৈষম্যের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শিক্ষার মান যদি উন্নয়ন করা না যায়, শিক্ষাক্ষেত্রের বিশৃঙ্খলাগুলো যদি ঠিক করা না যায়, পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোকে যদি সময়মতো ধরে রাখা না যায়, তাহলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হবে না। ঝরে পড়ার হার যদি বাড়ে, নারীদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম যদি বৃদ্ধি পায়, তাহলে সেটি আমাদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়।
আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলে ড. দেবপ্রিয় বলেন, আমরা এখনো আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও তুলনীয় শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারিনি। এটাও এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ভবিষ্যৎ শ্রমবাজার নিয়ে সাম্প্রতিক এক গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, এআই, রোবটিক্স সহ প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে আগামী দিনে প্রায় ৫৬ লাখ কর্মসংস্থান হারিয়ে যেতে পারে। আবার নতুন করে ৫০ লাখ কাজও সৃষ্টি হবে। তবে নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের জন্য দেশের তরুণরা প্রস্তুত কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। ড. দেবপ্রিয় বলেন, যে নতুন কাজগুলো সৃষ্টি হবে, তার জন্য আমাদের যুবসমাজ প্রস্তুত কি না, সেটি নিয়ে আমাদের আশঙ্কা রয়েছে।
নতুন শিক্ষা আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশে নতুন করে আরেকটি শিক্ষা আন্দোলনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এই আন্দোলন শুধু স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য নয়, শিক্ষার মান নিশ্চিত করার জন্য। তিনি বলেন, শিক্ষা আন্দোলনকে যদি রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করা না যায়, তাহলে শুধু কারিগরি মতামত দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না। তিনি জানান, নতুন সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি জোট গড়ে শিক্ষা আন্দোলনকে রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেয়ার চিন্তা-ভাবনা চলছে। শুধু কারিগরি মতামত দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়; এজন্য সামাজিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ প্রয়োজন। তিনি বলেন, বর্তমানে শিক্ষা খাত নিয়ে ছয় ধরনের প্রচলিত বয়ান বা ব্যাখ্যা রয়েছে, যেগুলোকে নাগরিক প্ল্যাটফরমের গবেষণায় চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে বরাদ্দের পরিমাণ ও তার কার্যকর ব্যবহার নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো শিক্ষককে এখন আর শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করতে দেয়া হবে না। শিক্ষকদের দক্ষতার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রশিক্ষণ ছাড়া শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত এরইমধ্যে নেয়া হয়েছে। এ কারণে সাড়ে ১৪ হাজার শিক্ষক তার বিরুদ্ধে মিছিলও করেছেন। তবে সরকার এ অবস্থান থেকে সরে আসবে না। তিনি জানান, প্রশিক্ষণ শেষ করে আগামী ৪ থেকে ৬ মাসের মধ্যে এসব শিক্ষক আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরবেন।
ববি হাজ্জাজ বলেন, গত কয়েক বছরে শিক্ষা খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন সরকার সেই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার কাজ করছে। তিনি জানান, বেসরকারি স্কুলগুলোর তদারকির জন্য একটি নিয়ন্ত্রক পর্ষদ গঠনের কাজ শুরু হয়েছে। আগামী ১৪ই মে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা শুরু হবে।
অর্থনীতিবিদ ও গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য আনু মুহাম্মদ বলেন, শিক্ষা খাতে বরাদ্দের দিক দিয়ে বাংলাদেশ সারা বিশ্বের মধ্যে তো বটেই, দক্ষিণ এশিয়ায়ও তলানির দিকে। শিক্ষা-স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বললেই সরকারের টাকা থাকে না। তিনি বলেন, অন্যান্য দেশ শিক্ষা খাতে পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ দিতে পারলে, বাংলাদেশ কেন পারবে না? এটা একবারে হবে না ঠিক, কিন্তু এক বছর পরিকল্পনা নিয়ে করতে হবে।
নাগরিক প্ল্যাটফরমের কোর গ্রুপ সদস্য রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষা বাজেটে আনুষঙ্গিক বিষয় ঢোকানো হয়, যার ফলে অনেক সময় আকার বড় দেখায়। পরীক্ষার বদলে প্রাথমিকে শ্রেণিকক্ষভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়ন থাকতে হবে। আমাদের স্থায়ী একটি শিক্ষা কমিশন দরকার। তবে সেই কমিশন যেন ঠুঁটো জগন্নাথের মতো না হয়।
সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে নো কম্প্রোমাইজ। এমপিদের সন্তানদের নিজ এলাকার স্কুলে পড়াতে হবে। তাদের এলাকায় চিকিৎসা নিতে হবে। এটি হলে এমপি হওয়ার জন্য যারা শত শত কোটি টাকা নিয়ে ঘুরছে, তাদের আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
জামায়াতে ইসলামীর এমপি শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, শিক্ষকদের মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। প্রতিষ্ঠান পলিটিসাইজ করলে চলবে না।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য এনসিপি নেতা মাহমুদা মিতু অতীতে শিক্ষা খাতে হওয়া দুর্নীতির তদন্ত দাবি করেন।
জামায়াতে ইসলামীর সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ বলেন, স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করে দেয়া উচিত। প্রত্যেক স্কুলে নতুন বিল্ডিংয়ের আগে পুরনো বিল্ডিংয়ের অ্যাসেসমেন্ট করতে হবে।
সংলাপে উপস্থিত ছিলেন- সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী, স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা, সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ প্রমুখ।
