ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য মাত্রায় অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একইসঙ্গে নির্বাচনে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে তেমন কিছুই দেখেনি বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি। তবে শুরুতে তুলনামূলক সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা গেলেও, ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরা সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচনী কার্যক্রমের পুরাতন রাজনৈতিক চর্চা বজায় রেখেছেন। ফলে নির্বাচনে দল ও জোটের মধ্যে সংঘাত, আন্তঃদলীয় কোন্দল, ক্ষমতার জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং সহিংসতা ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছে টিআইবি। সোমবার ঢাকার টিআইবি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন প্রতিক্রিয়া ও হলফনামা বিশ্লেষণ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবি। প্রতিবেদনে সার্বিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচনে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর কোনো উপাদান দেখা যায়নি। টিআইবি’র দৃষ্টিতে মোটামুটিভাবে গ্রহণযোগ্য, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়েছে। ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা স্থানীয় পর্যায়ে অন্য দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। যারা ভোট দিয়েছেন, তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশ ছিল। তাই ফ্যাক্টের ওপর ভিত্তি করেই বলা হয়েছে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য মাত্রায় অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে।
প্রতিবেদনে টিআইবি বলছে, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অন্তর্ভুক্তি ছিল। নির্বাচনকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগ কর্তৃক অবৈধ ও প্রতিহত করার ঘোষণা ও তৎপরতা এবং নির্বাচন ও নির্বাচনী পরিবেশে আওয়ামী লীগের নেতিবাচক ভূমিকায় সক্রিয় উপস্থিতি দেখা গেছে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন প্রতিহত করার অবস্থান সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে তাদের কর্মী-সমর্থকরা নির্বাচনে ভোটার হিসেবে অংশ নিয়েছেন। যদিও একাংশ ভোট বর্জন করে থাকতে পারেন, যা সাধারণ ভোটারদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগের ভোট টানার জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের অনেকেই, বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াত জোট এবং জাতীয় পার্টিসহ দল ও প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়েছে। এতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও সাড়া দিয়েছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচনে সরাসরি অংশগ্রহণকারী কোনো কোনো দলে যোগদান ও প্রচারণায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। ফলে আওয়ামী লীগ একদিকে দল হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নেতিবাচক, এবং অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিকভাবে দলটির নেতাকর্মী-সমর্থকরা ভোটসহ রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন। উভয় ভূমিকার ক্ষেত্রে দলটির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা বিদ্যমান ছিল।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নির্বাচনে ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ আসনে ভোটারদের একটি নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে এবং ৪৬ দশমিক ৪ শতাংশ আসনে ভোটারদের হুমকি দিয়ে তাড়ানো বা কেন্দ্রে প্রবেশ করতে বাধা দেয়া হয়েছে। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৪০ শতাংশ আসনে একাধিক অনিয়মের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এদের মধ্যে ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ আসনে অনিয়ম এবং আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনায় প্রার্থীর পক্ষ থেকে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। সে প্রেক্ষিতে ৭৫ শতাংশ আসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তাছাড়াও, ভোটে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ আসনে জালভোট দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিধি লঙ্ঘন/আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ/অনিয়ম প্রতিরোধে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা ছিল ২১ দশমিক ৪ শতাংশ আসনে। ভোটগ্রহণের আগেই ব্যালটে সিল মারা, প্রতিপক্ষের পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে না দেয়াসহ বুথ দখল করা হয়েছে ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ আসনে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক ভোটারদের অসহযোগিতা দেখানো হয়েছে ১০ দশমিক ৭ শতাংশ আসনে। রিটার্নিং অফিসারসহ নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পক্ষপাতমূলক কার্যক্রম ১০ দশমিক ৭ শতাংশ আসনে। তাছাড়া ৭ দশমিক ১ শতাংশ আসনে ভোট গণনায় জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে।
পর্যবেক্ষণের আলোকে টিআইবি আরও জানিয়েছে, নির্বাচনের দিনে কেন্দ্রগুলোতে বিভিন্ন অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। স্বতন্ত্র নারী প্রার্থীর ওপর হামলা, কেন্দ্রের বাইরে ভয়ভীতি প্রদর্শন, স্বতন্ত্র প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। কিছু কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্টদের ঢুকতে না দেয়া, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দিয়ে নিজেরাই এজেন্ট সেজে বসে থাকার ঘটনাও ঘটেছে। বানোয়াট নিয়মের অজুহাতে ভোটারদের হেনস্তা করা, একজনের ভোট অন্যজন প্রদান, ভোটের সময় টাকা বিতরণ; অনেকে একসঙ্গে বুথে ঢুকে অবৈধভাবে ব্যালট পেপারে সিল মারা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক স্বতন্ত্র প্রার্থীর পোলিং এজেন্টকে ভয় দেখানো, এজেন্টদের হয়রানি করার ঘটনা ঘটেছে নির্বাচনের দিন। এ ছাড়া, ভোটার তালিকার সঙ্গে নাম ও ছবি না মেলায় অনেক ভোটার কেন্দ্রে গেলেও ভোট দিতে পারেননি।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নির্বাচনী আচরণবিধি প্রতিপালনে রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীদের নির্বাচন কমিশনকে অসহযোগিতার মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। ৯৯ শতাংশ প্রার্থী কোনো না কোনো নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করেছেন। দৈবচয়ন পদ্ধতিতে নমুনাভিত্তিকভাবে নির্বাচিত ৭০টি আসনের মধ্যে ২১.৪ শতাংশ আসনে এক বা একাধিক জালভোট প্রদানের ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে এবং ৪০ শতাংশ আসনে একাধিক অনিয়মের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। প্রচারণা ব্যয়ের সীমা (অনলাইন ও অফলাইন) একক ও যৌথভাবে ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে, শীর্ষ দুই দল বিএনপি, ও জামায়াত প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এই লঙ্ঘনের মাত্রা সর্বাধিক। ব্যয়সীমা অতিক্রান্ত প্রার্থী গড়ে ১ কোটি ৬৪ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ টাকা ব্যয় করেছেন।
টিআইবি’র পর্যবেক্ষণ
সংসদ নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে
স্টাফ রিপোর্টার
১৭ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
