স্কুল ক্রিকেট থেকে যেভাবে বিসিবিতে ইসরাফিল খসরু

স্কুল ক্রিকেট থেকে যেভাবে বিসিবিতে ইসরাফিল খসরু

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নতুন অ্যাডহক কমিটিতে রাজনৈতিক নেতাদের স্বজনদের আধিক্য নিয়ে দেশ জুড়ে চলছে তীব্র সমালোচনা। কমিটিতে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছেলে ইসরাফিল খসরু, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলে, আরেক মন্ত্রী ববি হাজ্জাজের স্ত্রী এবং বিএনপির শীর্ষ নেতা মির্জা আব্বাসের ছেলের উপস্থিতি ক্রীড়াঙ্গনে বিতর্কের ঝড় তুলেছে।

সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ এই কমিটিকে ‘বাবার দোয়া ক্রিকেট বোর্ড’ বলে তীব্র কটাক্ষ করেছেন। মূলত কোনো পেশাদার ক্রিকেটীয় ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়াই ইসরাফিলের মতো রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের বিসিবির ফিন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো নিয়ে জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। কী যোগ্যতায় তারা দেশের ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রণভার পেলেন, তা নিয়ে সর্বত্র উঠছে প্রশ্ন।

দেশের ক্রিকেটের এই ক্রান্তিলগ্নে উদ্ভূত এই স্বজনপ্রীতি ও যোগ্যতার বিতর্ক নিয়ে মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিতেই দৈনিক মানবজমিনের মুখোমুখি হন ইসরাফিল খসরু। এই সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের অবস্থান, ক্রিকেট নিয়ে তার পূর্ব অভিজ্ঞতা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সমালোচনার জবাব দেয়ার চেষ্টা করেছেন। দেশের ক্রিকেট এখন কোন পথে এগোবে, নব্বই দিনের এই অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব শেষে তারা আদৌ কী উপহার দেবেন, সেই লক্ষ্যগুলোর বিস্তারিত আজ জানবো আমরা।

রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে ক্রিকেটে হঠাৎ আপনাদের পদার্পণ নিয়ে তীব্র সমালোচনা চলছে। এটিকে কীভাবে দেখছেন?
ইসরাফিল: সমালোচনা সবসময় ভালো। এটি আমাকে মোটিভেট করে। গত সতেরো বছর রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে প্রকাশ্যে ক্রীড়াঙ্গনে কাজের সুযোগ পাইনি। আমি নিজে স্কুল ক্রিকেট খেলেছি। বিদেশে উচ্চশিক্ষার পরও ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা কমেনি। চট্টগ্রামে একাধিক একাডেমির সঙ্গে আমি দীর্ঘদিন জড়িত। পেছনের সারি থেকে সবসময় ক্রিকেটকে সমর্থন দিয়েছি। বর্তমানে বাংলাদেশ ক্রিকেটে গুণগত পরিবর্তন আনার একটি বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে। মূলত সেই প্রবল ইচ্ছা থেকেই এখানে যুক্ত হওয়া।

আপনার ক্রিকেটে আসার পেছনের গল্পটি কী?
ইসরাফিল: আমার জীবনের প্রথম দশ বছর চট্টগ্রামে কেটেছে। ঢাকায় স্কলাস্টিকাতে ভর্তি হওয়ার পর ক্রিকেটে ঝোঁক বাড়ে। আমি নিয়মিত স্কুল ক্রিকেট খেলেছি। আমাদের স্কুল তখন নির্মাণ চ্যাম্পিয়ন ছিল। বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক কোচ সারোয়ার ইমরান স্যারের হাত ধরেই আমার খেলা শুরু। উনার অধীনে কয়েক বছর খেলে অনেক কিছু শিখেছি। এরপর আমেরিকায় চলে যাই। দেশে ফিরে রাজনৈতিক বৈরিতায় সরাসরি কাজ করা হয়নি। এখন সেই সুযোগ পেয়েছি।

সংগঠক হিসেবে কাজ করার ইচ্ছে নাকি শুধুই ভালোবাসা?
ইসরাফিল: দুটোই কাজ করেছে। আমি শতদল ক্লাব ও এক্সিম ক্রিকেটার্সের কাউন্সিলর। অনেক বছর ধরে ক্রিকেটের সঙ্গেই যুক্ত আছি। উদ্দেশ্য কী সেটাই আসল বিষয়। আমার মূল লক্ষ্য ক্রিকেটের সার্বিক উন্নয়ন ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা। ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় স্টেকহোল্ডার আমাদের খেলোয়াড়রা। ডিরেক্টররা আজ আছেন, কাল নেই। আমাদের প্রধান কাজ হলো ক্রিকেটারদের সঠিক সার্ভিস দেয়া। তাদের কাছে গিয়ে চাহিদাগুলো বোঝা আমাদের দায়িত্ব।

তামিম ইকবালের মাধ্যমেই কি আপনার এই কমিটিতে আসা?
ইসরাফিল: তামিমের সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক বছরের। সে চট্টগ্রামের ছেলে, আমিও তাই। বাংলাদেশ ক্রিকেট নিয়ে আমাদের প্রায়ই আলাপ হতো। সে সদ্য অবসর নিয়েছে। তাই তার থেকে বৈশ্বিক ক্রিকেটের চাহিদাগুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেতাম। আমাদের দুজনের চিন্তাভাবনা মিলে যায়। মূলত তার অনুরোধেই আমার এখানে আসা। আমরা দুজনে একসঙ্গে বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য ভালো কিছু করতে চাই। নিশ্চয়ই আমরা সফল হবো।

বোর্ডে আসার পর কোন বিষয়টি আপনাকে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছে?
ইসরাফিল: ক্রিকেট বোর্ডের অনেক রেসপনসিবিলিটি আছে। তাদের ফান্ডের তুলনায় খেলোয়াড়দের পেছনে পুনরায় বিনিয়োগ হয়নি। আমাদের একাডেমির সুবিধাগুলো আন্তর্জাতিক মানের নয়। টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর তুলনায় আমরা বেশ পিছিয়ে। এটি আমাকে চরম বিস্মিত করেছে। তবে নারী দল ভালো করছে, এটি ইতিবাচক।

স্টেডিয়ামগুলোর ভগ্নদশা নিয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী?
ইসরাফিল: সম্পদের অভাব নেই, কিন্তু দূরদর্শিতার চরম অভাব ছিল। নির্বাচন ছাড়া বোর্ড এলে তাদের মধ্যে কোনো তাগিদ থাকে না। এক ধরনের একঘেয়েমি ও স্থবিরতা কাজ করে। আমরা এই মাইন্ডসেট বদলাতে চাই। খেলোয়াড়দের পেছনে বিনিয়োগ বাড়ালেই তারা পারফরম্যান্স দিয়ে দর্শক মাঠে ফেরাবে। তখন স্পন্সরশিপ ও টিভি স্বত্ব এমনিতেই বাড়বে।

ঘরোয়া ক্রিকেট ও জৌলুস হারানো ফ্র্যাঞ্চাইজি লীগ নিয়ে আপনাদের কী ভাবনা?
ইসরাফিল: পাইপলাইন সচল রাখতে হলে নিয়মিত খেলা হতে হবে। ঢাকা প্রিমিয়ার লীগ বা জাতীয় লীগ সর্বত্রই পেশাদারিত্বের অভাব ছিল। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ নিয়েও বড় সংস্কার প্রয়োজন। আমরা ফ্র্যাঞ্চাইজিদের বলেছি, আপনাদের বিনিয়োগ সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকবে। আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে স্পন্সররা পুনরায় ফিরবে।

ফিন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে বিশাল অঙ্কের ফান্ড পরিচালনা কতোটা চ্যালেঞ্জিং?
ইসরাফিল: সদিচ্ছা থাকলে যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যায়। এই বিশাল ফান্ড ক্রিকেটের উন্নয়নের জন্য। আমরা চাই প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগ লীগ যেন নিয়মিত মাঠে গড়ায়। তৃণমূল পর্যায়ে নজর দিতে হবে।

নব্বই দিনের এই স্বল্প মেয়াদে আপনাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী?
ইসরাফিল: সময় খুব বেশি নেই, এটা সত্য। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো বোর্ডকে নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মাঝে আনা। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে দায়িত্ব তুলে দেয়া প্রধান কাজ। ক্রিকেট প্রশাসনে যে স্থবিরতা ছিল, আমরা সেটি ভেঙে একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ভিত্তি গড়ে দিয়ে যেতে চাই। আমরা বিশ্বাস করি, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের ক্রিকেট সামনের দিনগুলোতে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যাবে। দেশের ক্রিকেটে সমর্থকদের হারানো আস্থা আমরা ফিরিয়ে আনবই, এটি এখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। ধন্যবাদ সবাইকে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন