ধর্ষণে কিশোরীর অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভপাত ইস্যুতে ভারত সরকারকে সুপ্রিম কোর্টের তিরস্কার

ধর্ষণে কিশোরীর অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভপাত ইস্যুতে ভারত সরকারকে সুপ্রিম কোর্টের তিরস্কার

ফন্ট সাইজ:

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বৃহস্পতিবার ১৫ বছর বয়সী এক ধর্ষণের শিকার কিশোরীর ৩১ সপ্তাহের গর্ভপাত অনুমোদনের আগের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের করা কিউরেটিভ পিটিশনকে তীব্রভাবে সমালোচনা করেছে। নারীর নিজের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। আদালত সরকারকে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত- এ ক্ষেত্রে মেয়েটি ও তার পরিবারের সিদ্ধান্তকে সম্মান করার আহ্বান জানিয়েছে। আদালত আরও বলেছে, ধর্ষণের ফলে গর্ভধারণ হলে কোনো সময়সীমা থাকা উচিত নয় এবং এ সংক্রান্ত বিদ্যমান আইন পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। ধর্ষণের কারণে গর্ভধারণ হলে কোনো সময়সীমা থাকা উচিত নয়। আইনকে সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, ধর্ষণের পর এই শিশুটি যে যন্ত্রণা ভোগ করেছে, তার কোনো ক্ষতিপূরণ সম্ভব নয়।

তিনি অতিরিক্ত সলিসিটার জেনারেল ঐশ্বর্যা ভাটিকে তিরস্কার করে বলেন, নাগরিকদের সম্মান দিন, ম্যাডাম। এই মামলায় চ্যালেঞ্জ করার অধিকার আপনার নেই। শুধু ভুক্তভোগী বা তার পরিবারই তা করতে পারে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি।

বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি বলেন, আমরা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে সম্মান করি। আপনারও করা উচিত। তিনি সরকারকে বলেন, সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির তথ্য অভিভাবকদের সামনে তুলে ধরতে হবে এবং সিদ্ধান্ত তাদের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। যদি তারা সন্তানটি রাখতে চায়, সেটাই হোক। কিন্তু যদি মনে করে মেয়েটির মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে, তাহলে তারা সিদ্ধান্ত নেবে। সেক্ষেত্রে আপনারা এই কিউরেটিভ আবেদন চাপিয়ে দেবেন না।

আদালত আরও বলেন, এটিকে রাষ্ট্র ও নাগরিকদের মধ্যে সংঘাত বানাবেন না। একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও কাউন্সেলর নিয়ে আসুন। যারা সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম, তাদের জন্য আমরা সিদ্ধান্ত নেব না।
সরকারের পক্ষে ঐশ্বর্যা ভাটি যুক্তি দেন যে এই পর্যায়ে গর্ভপাত সম্ভব নয়। তার মতে, একমাত্র বিকল্প হলো শিশুটির জন্ম দেয়া এবং পরে দত্তক দেয়া। তিনি বলেন, গভীর দুঃখের সঙ্গে আমাদের এই আবেদন আনতে হচ্ছে। এই রিপোর্ট এসেছে এইমস (অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস) থেকে। গর্ভপাত সম্ভব নয়। শিশু জন্ম নেবে এবং গুরুতর বিকৃতি থাকতে পারে। অপ্রাপ্তবয়স্ক মায়ের আজীবন স্বাস্থ্য সমস্যা হতে পারে। তিনি আরও বলেন, শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থে তাকে জন্ম দিয়ে দত্তক দেয়া উচিত। আর মাত্র চার সপ্তাহ বাকি আছে।

কিন্তু প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত জবাবে বলেন, এটি শিশু ধর্ষণের ঘটনা। ভুক্তভোগী সারা জীবন মানসিক ক্ষত বহন করবে। ভবিষ্যতে তার দাম্পত্য জীবন জটিল হলেও- কোন যন্ত্রণা বেশি? তিনি আরও বলেন, এইমসে দক্ষ চিকিৎসক আছেন। তারা মেয়েটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবেন। ভাবুন তো- প্রতিটি মুহূর্তে সে এই ভ্রƒণ বহন করছে, তার মানসিক যন্ত্রণা কতটা! এটি একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর বিষয় হলে ভিন্ন হতে পারত। কিন্তু এটি একটি ১৫ বছরের শিশুর অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণ। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যদি এটি শিশুর সঙ্গে ভ্রƒণের সংঘর্ষে পরিণত হয়, তাহলে শিশুকেই মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার সুযোগ দিতে হবে। বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন হলে আইনকে কঠোর হতে হবে। আদালত আরও বলে, এই বয়সে তার নিজের স্বপ্ন ও লক্ষ্য থাকার কথা। কিন্তু আমরা কি তাকে মা বানাতে চাই? সে ইতিমধ্যেই প্রচণ্ড কষ্ট ও অপমান সহ্য করেছে।

গত সপ্তাহে আদালত ওই কিশোরীকে গর্ভপাতের অনুমতি দেয়। বিচারপতি বি ভি নাগরত্না ও বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া বলেন, তাকে সন্তান জন্ম দিতে বাধ্য করা তার মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন। তারা বলেন, নারীর প্রজনন-স্বাধীনতা সর্বোচ্চ গুরুত্বের হওয়া উচিত। আদালত উল্লেখ করে, মেয়েটি তীব্র মানসিক চাপে ছিল এবং দুইবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। তাকে গর্ভধারণ চালিয়ে যেতে বাধ্য করা তার মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন। সরকারের পক্ষে সলিসিটার জেনারেল তুষার মেহতা একটি মেডিক্যাল রিপোর্টের কথা উল্লেখ করেন। সেখানে বলা হয়েছে এই পর্যায়ে গর্ভপাত করলে মা ও ভ্রƒণের ঝুঁকি রয়েছে। তিনি যুক্তি দেন, মামলাটি আইনগত ২৪ সপ্তাহের সীমা অতিক্রম করে আদালতে এসেছে এবং দেরিতে গর্ভপাত ঝুঁকিপূর্ণ। আবেদনকারীর পক্ষ থেকে বলা হয়, এই গর্ভধারণ ইতিমধ্যেই তার জীবন, বিশেষ করে শিক্ষা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। প্রতিটি দিনই তার জন্য ভয়াবহ মানসিক যন্ত্রণার।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন