মাটির গন্ধ থেকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিঃ অধ্যাপক ড. এম. এ. রহিমের জীবন, গবেষণা ও এক অনন্য যাত্রার গল্প

মাটির গন্ধ থেকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিঃ অধ্যাপক ড. এম. এ. রহিমের জীবন, গবেষণা ও এক অনন্য যাত্রার গল্প

ফন্ট সাইজ:

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। বাংলাদেশের কোনো এক গ্রামীণ প্রান্তরে, শিশির ভেজা পাতার ওপর দিয়ে হাঁটছেন এক গবেষক । তাঁর চোখে কৌতূহল, হাতে নোটবুক, আর মনে একটাই প্রশ্ন “এই মাটিতে আর কী সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে?” এই মানুষটিই আজকের অধ্যাপক ড. এম. এ. রহিম যিনি বাংলাদেশের ফল গবেষণাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, আর যার হাতে গড়ে উঠেছে শতাধিক নতুন ফলের জাত।

২০২৬ সালে যখন তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয় দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’, তখন সেটি ছিল কেবল একটি পুরস্কার নয় ছিল এক জীবনের নিরলস সাধনার স্বীকৃতি।শুরুটা ছিল খুব সাধারণ, স্বপ্নটা ছিল অসাধারণ।

একজন কৃষিবিজ্ঞানীর জন্ম হয় না কোনো ল্যাবরেটরিতে তার শুরু হয় মাটির কাছ থেকে। ড. এম. এ. রহিমের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। শৈশব থেকেই প্রকৃতি, গাছপালা এবং কৃষির প্রতি গভীর আগ্রহ তাঁকে টেনে নেয় এই পথের দিকে। সেই আগ্রহই তাঁকে নিয়ে যায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে তিনি কৃষিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

এরপর জ্ঞান অর্জনের পরিধি বাড়াতে তিনি পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে, অর্জন করেন লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি। যুক্তরাষ্ট্রে পোস্টডক গবেষণার মাধ্যমে তাঁর গবেষণার দৃষ্টিভঙ্গি পায় আন্তর্জাতিক মাত্রা। কিন্তু তাঁর লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট এই জ্ঞান ফিরিয়ে আনতে হবে দেশের মাটিতে, দেশের কৃষকের কাছে।

বাংলাদেশে ফল গবেষণার ক্ষেত্রে ড. রহিম যেন এক নীরব বিপ্লবের নাম। তাঁর গবেষণার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল প্রয়োগযোগ্যতা। শুধু গবেষণা প্রবন্ধে সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি এমন ফলের জাত উদ্ভাবনে মনোযোগ দেন, যা কৃষকের জন্য লাভজনক এবং দেশের জন্য টেকসই।

ফলাফল? ১২৮টিরও বেশি নতুন ফলের জাত। এই সংখ্যাটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয় এটি হাজার হাজার কৃষকের জীবনে পরিবর্তনের গল্প। বিশেষ করে “BAU কুল” যা আজ দেশের বাজারে বহুল জনপ্রিয় তাঁর গবেষণারই ফসল।

ড. এম. এ. রহিমের পরিচয় কেবল একজন বিজ্ঞানী নয়, তিনি একজন শিক্ষক, যিনি ভবিষ্যৎ তৈরি করেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি তৈরি করেছেন এক শক্তিশালী গবেষণা সংস্কৃতি। তাঁর তত্ত্বাবধানে ১০০-এর বেশি পিএইচডি এবং শত শত স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী গবেষণা সম্পন্ন করেছেন। এই শিক্ষার্থীরাই আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কৃষি উন্নয়নের নেতৃত্ব দিচ্ছেন যা তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি।

বর্তমানে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে তাঁর নেতৃত্বে কৃষি গবেষণা পেয়েছে নতুন গতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টারে তাঁর তত্ত্বাবধানে উদ্ভাবিত চারটি কাঁঠালের জাত DIU Jackfruit-1, 2, 3 এবং 4 জাতীয় স্বীকৃতি পেয়েছে। এই সাফল্য শুধু একটি গবেষণার ফল নয়; এটি দেখায় কীভাবে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও গবেষণায় জাতীয় পর্যায়ে অবদান রাখতে পারে।

ড. রহিমের ঝুলিতে রয়েছে অসংখ্য সম্মাননা প্রধানমন্ত্রীর গোল্ড মেডেল, বঙ্গবন্ধু কৃষি পদক, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস ও এগ্রিকালচার গোল্ড মেডেল, প্রথম আলো কৃষি লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড।

সম্ভবত একজন কৃষকের হাসি, যখন সে দেখে তার জমিতে ফলন বেড়েছে। সম্ভবত একজন শিক্ষার্থীর সফলতা, যে তাঁর কাছ থেকে শেখা জ্ঞান দিয়ে নতুন কিছু তৈরি করছে। ২০২৬ সালের স্বাধীনতা পুরস্কার তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু এটি শেষ নয় বরং একটি নতুন সূচনার প্রতীক। কারণ, একজন গবেষকের কাজ কখনো থেমে থাকে না। প্রতিটি নতুন প্রশ্ন, প্রতিটি নতুন সমস্যা তাঁর কাছে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়।

অধ্যাপক ড. এম. এ. রহিমের জীবন আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় উন্নয়ন কেবল বড় বড় প্রকল্পে নয়, ছোট ছোট উদ্ভাবনে লুকিয়ে থাকে। একটি নতুন ফলের জাত, একটি উন্নত চাষ পদ্ধতি এসবই বদলে দিতে পারে একটি দেশের অর্থনীতি। তাঁর কাজ প্রমাণ করে, যদি গবেষণা বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে তা মানুষের জীবনে সরাসরি পরিবর্তন আনতে পারে।

বর্তমানে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-এ কর্মরত থেকে নতুন প্রজন্মকে কৃষিবিজ্ঞানের জ্ঞান ও গবেষণায় দক্ষ করে তুলতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডীন, কৃষিবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান এবং খ্যাতিমান কৃষিবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. এম. এ. রহিম তাঁর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও গবেষণার মাধ্যমে তরুণ শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করে চলেছেন, গড়ে তুলছেন ভবিষ্যতের দক্ষ কৃষিবিজ্ঞানী প্রজন্ম।

ড. এম. এ. রহিমের গল্প আসলে একজন মানুষের গল্প নয় এটি বাংলাদেশের কৃষির সম্ভাবনার গল্প।
একজন মানুষ কীভাবে নিজের জ্ঞান, শ্রম এবং দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে একটি খাতকে এগিয়ে নিতে পারেন তার জীবন্ত উদাহরণ তিনি। মাটির কাছ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা পর্যন্ত তাঁর এই যাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয় ,যে মানুষ মাটিকে বুঝতে পারে, সে-ই পারে ভবিষ্যৎ গড়তে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন