দেশের ভবিষ্যৎ নির্বাচন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য এবং আন্তর্জাতিক মানের করতে মোট ১৯টি সুপারিশ দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন। যার মধ্যে ছয়টিতে অগ্রাধিকার দিয়েছে ইইউ। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্বাচন আন্তর্জাতিক মানের এবং আরও বিশ্বাসযোগ্য করতে এসব সুপারিশ দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইইউ পর্যবেক্ষক দলের প্রধান ইভার্স ইজাবস। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এই সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে ছয়টিতে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। সুপারিশে সংসদীয় নির্বাচন পরিচালনাকারী আইনি কাঠামো সংশোধনের কথা বলা হয়েছে। সুপারিশে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের জন্য পক্ষপাতহীনতা ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার মানদণ্ড অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিদ্যমান অখণ্ডতা সুরক্ষাব্যবস্থা বজায় রেখে এবং অতিরিক্ত সুরক্ষাব্যবস্থা অন্বেষণ করার পাশাপাশি বাংলাদেশে যেসব ভোটার নির্বাচনের দিনে সশরীরে ভোট দিতে অক্ষম তাদের অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে। নির্বাচনী চক্রের মধ্যবর্তী সময়ে ভোটার ও নাগরিক শিক্ষা কর্মসূচি সমর্থন করতে হবে। রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের শর্তাবলি পুনর্বিবেচনা করা এবং ভিত্তিহীন নিবন্ধন রোধে যুক্তিসঙ্গত সুরক্ষাব্যবস্থা বজায় রাখারও সুপারিশ করা হয়েছে।
বিদ্যমান আইনের বিধান মেনে দলের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চাকে মাঠপর্যায়ের কর্মী, নারী, ও তরুণ-তরুণীদের অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণের মাধ্যমে শক্তিশালী করার পরামর্শ দিয়ে বলা হয় প্রচারণা নিয়ন্ত্রণ কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
নির্বাচনী প্রচারণার অর্থায়ন সংক্রান্ত বিধানগুলো পর্যালোচনা ও শক্তিশালী করতে হবে। এর মাধ্যমে আরপিও, প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি আদর্শ ফরম্যাট নিরীক্ষিত নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব জমা দিতে বাধ্য করতে হবে।
সাংবাদিক এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে শারীরিক ও ডিজিটাল হয়রানি ও আক্রমণ থেকে কার্যকরী সুরক্ষা দিতে আইনি ও কার্যনির্বাহী কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে হবে। স্বাধীন জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি সুশীল সমাজ, বিশেষজ্ঞদের নেতৃত্বে স্বাধীন কৌশলগত যোগাযোগ ইউনিট প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তথ্যগত ও নির্বাচনী সততা রক্ষার লক্ষ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফরমগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক আইনি বাধ্যবাধকতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে সকল রাজনৈতিক দল দলীয় কমিটিতে যেন ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখার লক্ষ্য অর্জন নিশ্চিত করে তার উদ্যোগ নিতে হবে।
উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের মধ্যে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু ও প্রতিবন্ধীদের মনোনীত করা আবশ্যকতা প্রবর্তনের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। মনোনয়ন সংক্রান্ত আবেদনপত্র নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত ও বাস্তবসম্মত সময়সীমা প্রবর্তনের উদ্দেশ্যে আরপিও সংশোধন করতে হবে। নির্বাচন তদন্ত ও বিচার কমিটিগুলো (ইইএসি) কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য উপলভ্য করতে পর্যাপ্ত উপকরণ বরাদ্দ করতে হবে। অন্যান্য সুপারিশের মধ্যে আছে ব্যালট গণনা প্রক্রিয়া পুনঃমূল্যায়নপূর্বক এর শুদ্ধতা নিশ্চিতকরণ ব্যবস্থাসমূত সুদৃঢ় করা, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ভোট গণনার সময় স্বচ্ছতা বজায় রাখার লক্ষ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ: আওয়ামী লীগবিহীন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ইলেকশন অবজারভার মিশন। ইভার্স ইজাবস বলেছেন, ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল বিশ্বাসযোগ্য, দক্ষভাবে পরিচালিত এবং বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও আইনের শাসন পুনরুদ্ধারের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ইজাবস আরও বলেন, একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনী প্রক্রিয়া কীভাবে গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবনকে ত্বরান্বিত করতে পারে- এই নির্বাচন তারই বাস্তব উদাহরণ। একই সঙ্গে ২০০৮ সালের পর এই প্রথম নির্বাচন প্রকৃত অর্থে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলেও ইইউ’র পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়।
২৭ দেশের জোটের প্রতিনিধিরা প্রতিবেদনে কিছু উদ্বেগের কথাও তুলে ধরেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় পর্যায়ে বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক সহিংসতা এবং অনলাইনে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও অপপ্রচারের কারণে নির্বাচনী পরিবেশ আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগও সীমিত ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। ইইউ মিশন বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করে জানিয়ে বলেছে, কমিশন স্বাধীন ও স্বচ্ছতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে এবং অংশীজনদের আস্থা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ইজাবস বলেন, শান্তিপূর্ণ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ ভোটগ্রহণ, স্বচ্ছভাবে ভোট গণনা এবং ফলাফলের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে যে, একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণকে এগিয়ে নিতে পারে। এবারের নির্বাচন একটি নতুন আইনি কাঠামোর অধীনে অনুষ্ঠিত হয়, যা আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ২০২৫ সালের সংশোধনীগুলো নির্বাচনকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য করতে সহায়তা করেছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা পুনর্গঠন এবং ক্ষমতার ভারসাম্য জোরদারে কিছু সংস্কার উদ্যোগও নেয়া হয়েছিল। তবে এসব অগ্রগতির পরও ইইউ মিশন মনে করে, দেশের নির্বাচনী আইনগত কাঠামো এখনো খণ্ডিত অবস্থায় রয়েছে। বিদ্যমান সংশোধনীগুলো সব দুর্বলতা ও অস্পষ্টতা দূর করতে পারেনি।
ইভার্স ইজাবসের বক্তব্যের পর তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বা পরিকল্পিত কারচুপির বিষয়টি জানতে চেয়ে এক সাংবাদিক বলেন, এখনো ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ রয়েছে-এ বিষয়ে এই মিশনের পর্যবেক্ষণ কী? জবাবে ইভার্স বলেন, ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নির্বাচন পর্যবেক্ষণের সর্বোত্তম মানদণ্ড অনুসরণ করে কাজ করেছে। তাদের পর্যবেক্ষণে এমন কোনো প্রমাণ বা ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি, যা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বা পরিকল্পিত কারচুপির সঙ্গে মেলে কিংবা নির্বাচনের ফলাফলের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। তবে ইভার্সের মতে, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অভিযোগ ও আপিল নিষ্পত্তির জন্য আইনগত ব্যবস্থা রয়েছে এবং এই প্রক্রিয়ার কিছু শক্তি ও দুর্বলতা আছে। বিশেষ করে, নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী আপিল নিষ্পত্তির সময়সীমা আরও দ্রুত হওয়া প্রয়োজন বলে তারা সুপারিশ করেছেন। নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম হওয়া নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়ার প্রয়োজন আছে কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে ইভার্স বলেন, নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে বাংলাদেশের নিজস্ব আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন জরুরি। রাজনৈতিক পরিসরে নারীদের আরও সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।

বাহাউদ্দীন বাবলু
২ মাস আগেভোট গণনা এবং রেজাল্টশীট তৈরি করার সময় প্রিজাইডিং অফিসার স্থানীয় ভাবে চরম চাপের মধ্যে থাকে যা তার স্বাভাবিক কার্যকমে ব্যাঘাত ঘটে। চাপমুক্ত থেকে কি ভাবে ভোট গণনা এবং রেজাল্ট শিট তৈরি করা যায় সেই বিষয়ে ভাবা উচিত।