এক মাস আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে সাবেক এফবিআই পরিচালক রবার্ট মুলারের মৃত্যুকে সেলিব্রেট করেন। তার মৃত্যুর খবরে তিনি বলেছিলেন, ‘ভালো হয়েছে, সে মারা গেছে। এখন আর নিরীহ মানুষদের ক্ষতি করতে পারবে না।’
কিন্তু এই সপ্তাহান্তে হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস ডিনারে গুলির পর ট্রাম্প ও তার প্রশাসন ডেমোক্রেটদের বক্তব্যকে ‘ঘৃণার সংস্কৃতি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং তাদের সহিংস ভাষার জন্য দায়ী করেছেন। তাদের প্রধান উদাহরণ? এবিসির কৌতুক অভিনেতা জিমি কিমেল ট্রাম্পের সম্ভাব্য মৃত্যু নিয়ে একটি রসিকতা করেছিলেন। ঘটনার কয়েকদিন আগে কিমেল বলেছিলেন, ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পকে ‘একজন সম্ভাব্য বিধবার মতো উজ্জ্বল দেখাচ্ছে।’ অর্থাৎ, ট্রাম্পের জন্য কারও মৃত্যু উদযাপন করা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু তার নিজের মৃত্যু নিয়ে রসিকতা করা গ্রহণযোগ্য নয়- এমন এক দ্বিমুখী মানদণ্ড সামনে এসেছে।
রাজনৈতিক সহিংসতা ও দায় চাপানোর রাজনীতি
এই গুলির ঘটনা আবারও দেখিয়েছে- ট্রাম্প ও তার প্রশাসন ডেমোক্রেটদের বক্তব্যকে দায়ী করতে আগ্রহী, যদিও ট্রাম্পের নিজের বক্তব্যের ইতিহাসও অত্যন্ত বিতর্কিত। গত বছর চার্লি কার্ক হত্যাকাণ্ডের পর রিপাবলিকানরা যে দায় চাপানোর কৌশল নিয়েছিল, এবারও তারা অনেকটা সেই পথেই হাঁটছে। তবে এ পর্যন্ত এই কৌশল খুব কার্যকর হয়নি। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, সাধারণ আমেরিকানরা বরং ডানপন্থীদের বক্তব্যকেই বেশি সহিংস ও বিপজ্জনক হিসেবে দেখে। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাগুলো এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে উভয় পক্ষই নিজেদের পছন্দসই ব্যাখ্যা তৈরি করে, যা অনেক সময় আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
নৈতিক উচ্চতা অনেক আগেই হারিয়েছেন ট্রাম্প
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, এই সহিংসতা এসেছে ট্রাম্প ও তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলা অপমান ও দানবায়নের ফল হিসেবে। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, হামলাকারীর উদ্দেশ্য নিয়ে এত দ্রুত নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। অনেক ক্ষেত্রেই পরে জানা যায়, এসব হামলার পেছনে মানসিক স্বাস্থ্যের জটিলতাও ভূমিকা রাখে। অভিযুক্ত কোল টমাস অ্যালেন কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট রেখে গেছেন। সেখানে তিনি ট্রাম্পকে অ্যাডলফ হিটলারের সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং সমালোচকদের অস্ত্র কেনার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও তথ্য প্রয়োজন। একই সঙ্গে কিমেলের রসিকতা খারাপ লাগতেই পারে। কিন্তু ট্রাম্প নিজেই বহু আগেই এই নৈতিক অবস্থান হারিয়েছেন।
ট্রাম্পের বিতর্কিত বক্তব্যের উদাহরণ
ট্রাম্পের বক্তব্যের ইতিহাসে রয়েছে একাধিক বিতর্কিত ঘটনা। তিনি রবার্ট মুলারের মৃত্যু উদযাপন করেছেন। এক দম্পতির হত্যাকাণ্ড নিয়ে সংবেদনহীন মন্তব্য করেছেন। গোয়েন্দা সংস্থাকে ‘নাৎসি জার্মানি’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের ‘ফ্যাসিস্ট’ বলেছেন। প্রতিনিধি পরিষদের সাবেক স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির স্বামীর ওপর হামলাকে হালকাভাবে নিয়েছেন। ‘সেকেন্ড অ্যামেন্ডমেন্ট’ সমর্থকদের সহিংসতার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ‘ভালো ডেমোক্রেট মানে মৃত ডেমোক্রেট’ এমন বক্তব্য পুনঃপ্রচার করেছেন। সমর্থকদের ‘শারীরিকভাবে লড়াই’ করার আহ্বানসংবলিত বার্তা শেয়ার করেছেন। এই ধারাবাহিকতা দেখিয়ে দেয় যে, ট্রাম্প বহুবার এমন বক্তব্য দিয়েছেন যা সহিংসতার সীমার কাছাকাছি বা তা উসকে দিতে পারে।
রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে বিকৃত ধারণা
বর্তমান সময়ে একটি বড় সমস্যা হলো- কে রাজনৈতিক সহিংসতার জন্য দায়ী, তা নিয়ে মানুষের ধারণা ক্রমেই বিকৃত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই কোনো ঘটনার প্রকৃত তথ্য বের হওয়ার আগেই রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা দাঁড় করায়। যেমন, ট্রাম্পকে হত্যাচেষ্টার অভিযুক্ত থমাস ম্যাথিউ ক্রুকসকে অনেকেই বামপন্থী বলে দাবি করেছিলেন, যদিও তিনি নিবন্ধিত রিপাবলিকান ছিলেন। অন্যদিকে, বামপন্থীদের মধ্যেও অনেকেই চার্লি কার্কের হত্যাকারীকে ডানপন্থী প্রমাণ করতে চেয়েছেন, যার পক্ষে প্রমাণ নেই।
জনমত কী বলছে
গ্যালাপের এক জরিপে দেখা গেছে, ৬৯ ভাগ আমেরিকান মনে করেন রিপাবলিকানরা উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহারে সীমা ছাড়িয়েছে, যেখানে ডেমোক্রেটদের ক্ষেত্রে এই হার ৬০ ভাগ। তবে উভয় পক্ষই সহিংসতার জন্য একে অপরকে দায়ী করে। পাবলিক রিলিজিয়ন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জরিপে ৭২ ভাগ রিপাবলিকান ডেমোক্রেটদের দায়ী করেন। ৭৩ ভাগ ডেমোক্রেট রিপাবলিকানদের দায়ী করেন। অর্থাৎ, দুই পক্ষই নিজেদের নয়, প্রতিপক্ষকে সমস্যার মূল মনে করছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা হলো- মানুষ ক্রমেই মনে করছে রাজনৈতিক সহিংসতার পেছনে ‘চরমপন্থী বক্তব্য’ বড় ভূমিকা রাখছে। ২০১১ সালে এই মত ছিল ২৪ ভাগ, যা ধীরে ধীরে বেড়ে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ৬১ ভাগে।
একটি বিপজ্জনক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত
সব মিলিয়ে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে দুই পক্ষই মনে করছে- অন্য পক্ষই সহিংসতার জন্য দায়ী। এই পারস্পরিক অবিশ্বাস ও দোষারোপ রাজনৈতিক উত্তেজনা কমাবে না, বরং পরিস্থিতিকে আরও অন্ধকার ও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে। এটাই এখন আমেরিকার রাজনৈতিক বাস্তবতা- একটি গভীরভাবে বিভক্ত সমাজ, যেখানে সত্য ও ব্যাখ্যাও দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে।
