মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে কাজে লাগিয়ে উত্তর কোরিয়া তাদের অস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচি দ্রুততর করছে। এমন এক বিশ্বে নিজেদের পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠাকে পাকা করছে, যেখানে আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন অনেকটাই ভেঙে পড়েছে।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরানের ওপর হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে উত্তর কোরিয়া পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে। এর মধ্যে এপ্রিল মাসেই চারটি উৎক্ষেপণ হয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারির পর এক মাসে এ সংখ্যা সর্বোচ্চ।
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন পারমাণবিক শক্তি বৃদ্ধির অঙ্গীকার করেছেন। তার পরপরই এসব পরীক্ষা করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থেকে সুবিধা নিচ্ছে পিয়ংইয়ং এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে কড়া ভাষা ব্যবহার করছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়ুংনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তর কোরিয়া বিশেষজ্ঞ লিম ইউল-চুল বলেন, এই উৎক্ষেপণগুলো একটি সুপরিকল্পিত কৌশলের অংশ বলে মনে হচ্ছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে পরিবর্তিত সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এক ধরনের ‘আইনহীন অঞ্চলে’ পরিণত হয়েছে। প্রচলিত আন্তর্জাতিক নিয়ম আর কার্যকর নয়। উত্তর কোরিয়া এই শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার সম্পূর্ণ করতে চাইছে।
পিয়ংইয়ং যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী হামলাকে ‘গ্যাংস্টারসুলভ’ বলে নিন্দা জানিয়েছে। তবে তারা তেহরানকে অস্ত্র সরবরাহ করেছে এমন প্রমাণ নেই। লক্ষণীয়ভাবে তারা প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে সরাসরি সমালোচনা করা থেকেও বিরত রয়েছে। আগামী মাসে ট্রাম্পের চীন সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। সেখানে একটি সম্মেলন হওয়ার কথা। এ সময় ট্রাম্প ও কিম জং উনের সম্ভাব্য বৈঠক নিয়েও জল্পনা চলছে।
কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ইউনিফিকেশনের জ্যেষ্ঠ গবেষক হং মিন বলেন, এই সম্মেলন উত্তর কোরিয়া ইস্যুকে আবার আলোচনায় আনতে পারে। তাই পিয়ংইয়ং হয়তো এই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ‘অপরিবর্তনীয় পারমাণবিক রাষ্ট্র’ হিসেবে বার্তা জোরালো করছে। তিনি আরও বলেন, তারা এটাও বোঝাতে চায় যে ইরানের তুলনায় তাদের প্রতিরোধক্ষমতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ওয়ার্কার্স পার্টির কংগ্রেসের পরপরই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের এই ধারা শুরু হয়। প্রতি পাঁচ বছরে একবার হওয়া এই কংগ্রেস রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সময় নির্বাচন থেকে বোঝা যায় উত্তর কোরিয়া তাদের অস্ত্র সক্ষমতার দৃশ্যমান অগ্রগতি দ্রুত তুলে ধরতে চায়। ওই কংগ্রেসে কিম জং উন ঘোষণা করেন, পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে উত্তর কোরিয়ার অবস্থান এখন স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয়।
এই উৎক্ষেপণগুলোর মধ্যে ছিল নিষিদ্ধ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ক্লাস্টার মিউনিশন। বিশ্লেষকদের মতে, এসব পরীক্ষায় প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং পারমাণবিক ও প্রচলিত উভয় ধরনের ব্যবহারের উপযোগী অস্ত্রে দক্ষতা বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
লিম ইউল-চুল বলেন, এতে ছোট আকারের পারমাণবিক ওয়ারহেড বসানোর সক্ষমতা এবং ‘স্যাচুরেশন অ্যাটাক’- অর্থাৎ বিপুল সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকার্যকর করে দেয়ার কৌশলের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তার মতে, উত্তর কোরিয়া এখন অস্ত্র উন্নয়ন থেকে সরে এসে ‘পারমাণবিক অপারেশনের স্বাভাবিকীকরণ’-এর দিকে এগোচ্ছে এবং ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন মধ্যপ্রাচ্যে ব্যস্ত, তখন উত্তর কোরিয়া মনে করছে আক্রমণাত্মক প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানো এবং পারমাণবিক ও প্রচলিত বাহিনী সমান্তরালে উন্নয়নের জন্য এটিই উপযুক্ত সময়। এই উৎক্ষেপণগুলো রাশিয়ার সমর্থনও প্রকাশ্যে দেখানোর একটি উপায় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইউক্রেন যুদ্ধে সহায়তার জন্য উত্তর কোরিয়ার হাজারো সেনা পাঠানোর বিনিময়ে মস্কো পিয়ংইয়ংকে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে। লিম ইউল-চুল বলেন, এটি দেখানোর চেষ্টা যে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের চাপ সত্ত্বেও তাদের শক্তিশালী মিত্র রাশিয়া রয়েছে। ফলে নিষেধাজ্ঞা কার্যত অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগে পিয়ংইয়ং ও মস্কো একটি সড়ক সেতু সংযোগ, ‘ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল’ নির্মাণ এবং একটি সামরিক স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন উদযাপন করেছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র, প্রাকৃতিক সম্পদ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রীসহ বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা উত্তর কোরিয়া সফর করেছেন। মস্কোয় নিযুক্ত উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত এমনকি দখলকৃত ইউক্রেনের খেরাসন অঞ্চলের রুশ-সমর্থিত প্রশাসনের সঙ্গে কৃষি সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা করেছেন বলে জানা গেছে।
সিউলের কোরিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষক ফিওদর টারটিটস্কি বলেন, উত্তর কোরিয়া এমন কয়েকটি দেশের একটি, যারা দখলকৃত ইউক্রেনেও কাজ করতে ভয় পায় না। উভয় পক্ষই এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগাচ্ছে।
রাশিয়ায় উত্তর কোরিয়ার শিল্পকর্ম প্রদর্শনী হয়েছে। সেখানে ইউক্রেন যুদ্ধকে মহিমান্বিত করা হয়েছে। মস্কোয় একটি উত্তর কোরীয় রেস্তোরাঁও চালু রয়েছে। একটি ভ্রমণ সংস্থার প্রশাসক ওলগা বলেন, এখানে হঠাৎ কোনো বড় বৃদ্ধি নেই, তবে সবসময়ই কিছু মানুষ আছে যারা এই দেশটিতে আগ্রহী। প্রায় ১৫০০ ডলারে ট্যুরের ব্যবস্থা করা হয়। তবে টারটিটস্কি মনে করেন, ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হলে এই সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। তার ভাষায়, এই সম্পর্ক প্রায় পুরোপুরি চলমান যুদ্ধের ওপর নির্ভরশীল।
