মাথাপিছু আয়ে ভারতকে ছাড়ানোর গল্প: অর্জন না বিভ্রম?

মাথাপিছু আয়ে ভারতকে ছাড়ানোর গল্প: অর্জন না বিভ্রম?

ফন্ট সাইজ:

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সর্বশেষ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে এমন একটি তথ্য উঠে এসেছে, যা বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে গর্বের। প্রতিবেদন বলছে, চলতি ২০২৬ সালে বর্তমান বাজারমূল্যে মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশ ভারতকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াতে পারে ২ হাজার ৯১১ ডলারে, আর ভারতের ক্ষেত্রে তা হতে পারে ২ হাজার ৮১২ ডলার। সংখ্যার ব্যবধান সামান্য হলেও এর প্রতীকী তাৎপর্য বিশাল এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই।

তবে উৎসাহের আতিশয্যে ভেসে যাওয়ার আগে একটু থামা দরকার। একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবা দরকার এই সংখ্যা কি সত্যিকারের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রতিফলন, নাকি কেবল বিনিময় হারের খেলা?

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু এই প্রবণতাকে 'বিস্ময়কর' বলেছেন। কিন্তু কিছু ভারতীয় বিশ্লেষক সঙ্গত প্রশ্নই তুলেছেন এটি কি বাংলাদেশের প্রকৃত উন্নয়নের ছবি, নাকি মুদ্রার ওঠানামার কারণে তৈরি হওয়া সাময়িক একটি পরিসংখ্যানগত বিভ্রম? প্রশ্নটি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ ডলারভিত্তিক মাথাপিছু জিডিপি একটি চঞ্চল সূচক। কোনো দেশের মুদ্রার মান কমে গেলে উৎপাদন অপরিবর্তিত থাকলেও ডলারে তার মূল্যমান সংকুচিত হয়ে যায়। ২০২৫ সালে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে বাংলাদেশ একবার পিছিয়েও পড়েছিল। এই ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে।

ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পিপিপি-ভিত্তিক হিসাবে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই পদ্ধতিতে দেশীয় মুদ্রার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া হয় বলে এটি জীবনমানের অনেক বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। সেখানে ২০২৫ সালে ভারতের মাথাপিছু আয় ছিল ১১ হাজার ৭৮৯ ডলার, আর বাংলাদেশের ১০ হাজার ২৭১ ডলার, ব্যবধান প্রায় ১৫ শতাংশ। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩১ সালে এই ব্যবধান আরও প্রসারিত হবে। তখন ভারত পৌঁছাবে ১৮ হাজার ৪৮৫ ডলারে, বাংলাদেশ থাকবে ১৪ হাজার ৮৫৭ ডলারে।

তাই প্রশ্ন জাগে মাথাপিছু আয়ের এই সাময়িক এগিয়ে যাওয়া কি সাধারণ মানুষের জীবনে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে? প্রান্তিক মানুষের থালায় কি আরেক মুঠো ভাত বাড়ছে? শ্রমিকের মজুরি কি বাড়ছে? স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগ কি সত্যিকার অর্থে বৃদ্ধি পাচ্ছে? আয়বৈষম্যের ক্রমবর্ধমান খাদ কি সংকুচিত হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পেলে কোনো পরিসংখ্যানই জনগণের কাছে অর্থবহ হয়ে ওঠে না।

ঐতিহাসিকভাবে দেখলে, ১৯৮৯ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ মাথাপিছু আয়ে ভারতের চেয়ে এগিয়ে ছিল। ২০১৮ সালে আবার সেই অবস্থান ফিরে পেয়েছিল। কিন্তু এই ওঠানামার ইতিহাস প্রমাণ করে, এ ধরনের তুলনামূলক অবস্থান স্থায়ী নয়, বরং পরিস্থিতিনির্ভর। আইএমএফ নিজেই বলছে, ২০২৭ সাল থেকে ভারত আবার এগিয়ে যাবে এবং অন্তত ২০৩১ সাল পর্যন্ত সেই অবস্থান ধরে রাখবে।

মোদ্দাকথা হলো, মাথাপিছু জিডিপির এই সাময়িক অগ্রগতিকে উদযাপন করা যায়, কিন্তু এটিকে উন্নয়নের চূড়ান্ত মাপকাঠি ভাবা হবে বিপজ্জনক আত্মতুষ্টি। একটি দেশের প্রকৃত অগ্রগতি পরিমাপ হয় মানুষের জীবনমান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং আয়বণ্টনের সুষমতায়। কেবল একটি সংখ্যার উপরে-নিচে ওঠানামায় নয়। পরিসংখ্যানের উৎসবে মেতে ওঠার চেয়ে বরং এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কাঠামোগত সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং সুশাসন নিশ্চিত করাই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য।

লেখক: সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ইমেইল: [email protected]



কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন