রাজশাহী জেলার দুর্গাপুর উপজেলার দাউকান্দি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে সাম্প্রতিক যে ঘটনাটি আলোচনায় এসেছে- একজন নারী শিক্ষিকার সঙ্গে শারীরিক লাঞ্ছনার অভিযোগ- তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। এ ধরনের ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক সংকট নয়; এটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতির প্রতিফলন। বিশেষ করে যখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় সামনে আসে, তখন বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
উল্লেখযোগ্য যে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ইতিমধ্যে দলীয়ভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, যা প্রমাণ করে যে সংগঠন হিসেবে দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণকে প্রশ্রয় দেয়া হয় না। তবে প্রশ্ন থেকে যায়- শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কি যথেষ্ট, নাকি আমাদের আরও গভীরে গিয়ে সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করতে হবে?
ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, ঘটনাটির শুরুতে উভয়পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং পরে তা শারীরিক সংঘর্ষে রূপ নেয়। এখানে দোষারোপের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো? কেন একজন রাজনৈতিক কর্মী, যিনি জনগণের প্রতিনিধি হওয়ার দাবি করেন, তিনি আত্মনিয়ন্ত্রণ হারান? এবং কেন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ এমন উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে?
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং আইনের শাসন। যদি তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এই মূল্যবোধ ধারণ করতে ব্যর্থ হন, তবে উপরের স্তরের উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের স্বপ্ন বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। রাজনৈতিক আদর্শ কেবল নীতিমালায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তা আচরণে প্রতিফলিত হতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটে কয়েকটি প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ জরুরি-
প্রথমত, তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ জোরদার করতে হবে, যেখানে আচরণবিধি, আইনগত সচেতনতা এবং নৈতিকতা গুরুত্ব পাবে।
দ্বিতীয়ত, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের ক্ষেত্রে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে অন্যদের জন্য তা দৃষ্টান্ত হয়।
তৃতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সংবেদনশীল স্থানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমিয়ে একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, নারী সম্মান ও নিরাপত্তার বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর করতে হবেÑ কোনো পক্ষেরই অনাকাক্সিক্ষত আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়।
সবশেষে, একটি উদার ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়তে হলে নেতৃত্বের পাশাপাশি তৃণমূলকেও একই মূল্যবোধে বিশ্বাসী হতে হবে। দায়িত্বশীল আচরণ, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ- এই তিনটি গুণই হতে পারে সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি। অন্যথায়, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা পুরো ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে দিতে পারে।
গণতন্ত্র কেবল একটি শাসনব্যবস্থা নয়; এটি একটি চর্চা- যা শুরু হয় ব্যক্তি থেকে, বিস্তৃত হয় সমাজে, এবং প্রতিষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রে।
লেখক - শিক্ষক ও গবেষক
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
