পোশাক-টেক্সটাইল খাতের নতুন প্রযুক্তি নিয়ে বিটিকেজি এক্সপো বুধবার

পোশাক-টেক্সটাইল খাতের নতুন প্রযুক্তি নিয়ে বিটিকেজি এক্সপো বুধবার

ফন্ট সাইজ:

চার দিনব্যাপী বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টেক্সটাইল, নিটিং অ্যান্ড গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রি এক্সিবিশন (বিটিকেজি এক্সপো ২০২৬) শুরু হচ্ছে আগামী বুধবার (২৯ এপ্রিল)। দেশের পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের উদ্যোক্তাদের কাছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি, রং, রাসায়নিক ও যন্ত্রপাতি তুলে ধরতে রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরা (আইসিসিবি) প্রাঙ্গণে এ মেলা চলবে ২ মে পর্যন্ত।

শনিবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকরক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।

বিকেএমইএ ও ইনফরচেইন ডিজিটাল টেকনোলজি কোম্পানি লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে এ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হচ্ছে। আয়োজকরা জানান, প্রায় ৩০টি দেশের এক হাজারের বেশি প্রদর্শক এতে অংশ নেবেন। ২৯ এপ্রিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার সম্মতি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি থাকবেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। এছাড়া ২রা মে বিকালে সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু।

সংবাদ সম্মেলনে মোহাম্মদ হাতেম জানান, তৈরি পোশাক খাত দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাত থেকে প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় হয়েছে, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি। এই খাত দেশের মোট জিডিপিতে ১২-১৩ শতাংশ অবদান রাখছে এবং ৪০ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শিল্পকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ ও টেকসই উৎপাদনের দিকে যেতে হবে। এ ধরনের আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী সেই পথকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, মেলাটি আগে অন্য একটি সংগঠন আয়োজন করলেও চলতি বছর তা হয়নি। সেই প্রেক্ষাপটে উদ্যোক্তারা মনে করেছেন, ব্যবসা পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে বাংলাদেশ বাজার হারাবে এবং রপ্তানি আদেশ অন্য দেশে সরে যাবে।

তিনি জানান, বৈশ্বিক ফ্যাশন খাত দ্রুত ‘ফাস্ট ফ্যাশন’, রিসাইক্লিং ও সার্কুলার অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে। এ অবস্থায় নতুন প্রযুক্তির বিকল্প নেই। তাই খাত সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের এসব প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করানোই এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য। যদিও সাধারণত জানুয়ারিতে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়, তবে নানা কারণে এবার এপ্রিল মাসে আয়োজন করা হয়েছে। আগামী বছর থেকে আবার জানুয়ারিতে ফেরার আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল অবস্থায় রয়েছে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে। এ অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে মেলার মাধ্যমে প্রযুক্তি ও সক্ষমতা তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশসহ কানাডা, চীন, তাইওয়ান, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, হংকং, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পণ্য ও প্রযুক্তি প্রদর্শন করবে। প্রদর্শনীতে টেক্সটাইল যন্ত্রপাতি, রং ও রাসায়নিক, সেলাই ও বয়ন প্রযুক্তি, এমব্রয়ডারি, কাটিং ও সেলাই যন্ত্র, ওয়াশিং ও ড্রাই ক্লিনিং প্রযুক্তিসহ আধুনিক সরঞ্জাম তুলে ধরা হবে।

বিকেটিজি ২০২৬-এর আহ্বায়ক ফজলে শামীম এহসান বলেন, চলমান সংকটের মধ্যেও এ ধরনের আয়োজন বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করবে। নতুন প্রযুক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
এক প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ব্যবসার পরিস্থিতি বর্তমানে খুবই খারাপ। ব্যাংকিং খাতের নানা অসহযোগিতার কারণে অনেক কারখানা এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে, আরও বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এলসি খোলা, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম এবং ঋণসুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে কাস্টমসের জটিলতা ও কিছু ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগও করেন তিনি, যা বাণিজ্য কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে বলে জানান।
জ্বালানি সংকটকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, বাস্তবে শিল্প-কারখানায় প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে ফিলিং স্টেশন থেকে কনটেইনারে তেল সরবরাহ বন্ধ থাকায় কারখানাগুলো বিপাকে পড়ছে। বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক; লোডশেডিং গড়ে ২-৩ ঘণ্টা, কোনো কোনো এলাকায় ৬-৮ ঘণ্টা পর্যন্ত হচ্ছে, যা উৎপাদনে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। তিনি বলেন, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সময়মতো রপ্তানি করা যাচ্ছে না, ফলে এয়ার শিপমেন্ট বা ডিসকাউন্টের মতো অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের মজুরি দিতে হচ্ছে, ফলে ব্যয় আরও বাড়ছে। জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির প্রভাবও যুক্ত হয়েছে এতে।

মোহাম্মদ হাতেম আরও বলেন, বিপিসি নির্দেশনা দিয়েছে যে কনটেইনারে করে তেল সরবরাহ করা যাবে না। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন মনিটরিং করছে এবং প্রয়োজনে জরিমানাও করছে। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, কারখানা থেকে কি জেনারেটর ফিলিং স্টেশনে নিয়ে গিয়ে সেখানে তেল ভরে আনা সম্ভব? বাস্তবে তা সম্ভব নয়।

সবমিলিয়ে উৎপাদন খরচ কমপক্ষে ২০ শতাংশ বেড়েছে বলে জানান তিনি। তবে ক্রেতাদের কাছ থেকে এই বাড়তি ব্যয় সমন্বয় করা যাচ্ছে না, কারণ আগেই মূল্য নির্ধারিত থাকে। অন্যদিকে, বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় ক্রেতারা অর্ডার কমিয়ে দিচ্ছেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে কমছে এবং শিল্প-কারখানাগুলো বর্তমানে মোট সক্ষমতার মাত্র ৫০-৬০ শতাংশ ব্যবহার করে চলছে, যা পরিস্থিতির গভীরতা নির্দেশ করে।

এসময় ফুয়েল কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো সব স্থানে কার্যকরভাবে জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান। তিনি বলেন, কিছু এলাকায় সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও অনেক জায়গায় এখনো ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ প্রধান বাজারগুলোতে ভোক্তা ব্যয় কমেছে, যার প্রভাব পড়ছে পোশাকখাতে। ফলে শুধু বাংলাদেশ নয়, বৈশ্বিকভাবেই ক্রয়াদেশ কমে গেছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আগামী মৌসুমে অর্ডার প্রবাহ বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন