প্রধানমন্ত্রীর টেলিকম ও আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেছেন, মোবাইল ব্যবহারকারী হিসেবে বিশ্বে আমাদের অবস্থান শীর্ষে থাকলেও এর সেবার মানের দিক দিয়ে আমাদের অবস্থান তলানিতে। এশিয়ার ভেতরে আমরা নেপাল-ভুটানের চেয়েও পেছনে। আমাদের বুঝতে হবে আমাদের অবস্থানটা কোথায়। আমরা এখান থেকে উন্নতি করতে চাই। যদি আমাদের মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড দুটোরই সার্ভিস ভালো হতো তাহলে গ্রাম না শহরে আছি এটা নিয়ে আমাদের এত চিন্তা করতে হতো না। এটা আমাদের কালেক্টিভ ফেইলিয়র আবার কালেক্টিভ ওপরচুনেটি (সুযোগ)। শনিবার দুপুরে রাজধানীর একটি বেসরকারি হোটেলে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত ‘নতুন টেলিকম পলিসি: উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আইসিটি উপদেষ্টা বলেন, আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ আছে- ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। এর অর্থ সবার আগে বাংলাদেশের জনগণ বা আমাদের ক্রেতা-ভোক্তা, এটা আমাদের প্রথম পায়োরিটি। দ্বিতীয়ত, ব্যবসা ও অর্থনীতির বিকাশ এবং তৃতীয়ত বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়ানো। ব্যবসাবান্ধব বাংলাদেশের মাধ্যমে আগামীতে এফডিআই জিডিপি’র ২ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে, যা প্রায় ৪০০ শতাংশ বৃদ্ধির সমান। তিনি বলেন, সরকার প্রতি নাগরিকের জন্য একটি একক ডিজিটাল আইডি তৈরির কাজ পরিকল্পনা করছে। জন্ম হওয়া শিশু থেকে শুরু করে একজন বৃদ্ধ সকলেরই একটি ডিজিটাল আইডি থাকবে। তার সঙ্গে যুক্ত থাকবে ডিজিটাল ওয়ালেট। ওই ওয়ালেটে মানুষ ব্যাংকিং লেনদেনও করতে পারবে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নাগরিকের পরিচয় ও আর্থিক লেনদেন একটি সমন্বিত প্ল্যাটফরমে চলে আসবে। এতে করে সরকারি-বেসরকারি সেবা গ্রহণ আরও সহজ, দ্রুত ও কার্যকর হবে। আগামী ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে ধাপে ধাপে এ কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। রেহান আসিফ বলেন, বর্তমানে দেশের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ এখনো স্মার্টফোন ব্যবহার করেন না, যা ডিজিটাল সেবা বিস্তারের বড় বাধা। এজন্য দেশে ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে সাশ্রয়ী মূল্যে স্মার্টফোন সরবরাহের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। যেমন ৮শ’/৯শ’ টাকায় একটা বাটন ফোন পাওয়া যায় কিন্তু এই টাকায় স্মার্টফোন কেনা যায় না। তাই ডিভাইসের উচ্চমূল্য কমাতে সরকার কাজ করছে এবং ভবিষ্যতে প্রায় আড়াই হাজার টাকায় একটি স্মার্টফোন দেয়ার লক্ষ্য রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের নাগালে স্মার্টফোন পৌঁছাবে এবং ডিজিটাল সেবায় অংশগ্রহণ বাড়বে। স্মার্টফোন সহজলভ্য করা গেলে ডিজিটাল বিভাজন কমবে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আর্থিক খাতসহ বিভিন্ন সেবায় প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বিস্তৃত হবে। এজন্য ডিভাইসের কর কাঠামোসহ পুরো ভ্যালু চেইন পর্যালোচনা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে পুরো ভ্যালু চেইন ডিভাইস, উৎপাদন, সেবা ও রাজস্ব ভাগাভাগি সবকিছু পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। শিল্পটি আর্থিকভাবে টেকসই না হলে ভালো সেবা দেয়া সম্ভব নয়। তাই ভারসাম্যপূর্ণ কর ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও জোর দেয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, টেলিকম খাতকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা উচিত নয়। এটি দেশের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে। ভবিষ্যতে প্রযুক্তি খাতই বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় উৎস হয়ে উঠতে পারে। আমাদের প্রথম লক্ষ্য হচ্ছে কানেক্টিভিটি নিশ্চিত করা। ৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে ৫-জি এবং ১০০ এমবিপিএস বা তার বেশি গতির ইন্টারনেটে যুক্ত করার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে। এটি চ্যালেঞ্জিং হলেও উচ্চাকাক্সক্ষী লক্ষ্য নিয়েই এগোতে চায় সরকার। একইসঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারও বাড়ানো হবে। এআইকে হুমকি নয়, বরং বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে সরকার।
এ সময় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী বলেন, দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের টেকসই উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি বাস্তবায়নে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক ও টাওয়ার অবকাঠামোয় বড় পরিসরের বিনিয়োগ জরুরি। তিনি বলেন, বর্তমান গতিতে অবকাঠামো উন্নয়ন অব্যাহত থাকলে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগবে। যা ফাইভ-জি ও আধুনিক ডিজিটাল সেবার বিস্তারে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগে আকৃষ্ট করে এই খাতে গতি আনতে হবে। দ্রুত পরিবর্তনশীল টেলিকম প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারলে খাতটির অগ্রগতি ব্যাহত হবে। ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি সমন্বিত, অংশগ্রহণমূলক ও সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন অপরিহার্য। টেলিকম খাতের উন্নয়নে শুধু হার্ডওয়্যার নয়, বরং সফটওয়্যার ও সিস্টেমভিত্তিক উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একইসঙ্গে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগের মধ্যে একটি যৌক্তিক ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। তিনি বলেন, টেলিকম খাত একটি কানেক্টিভিটি বিজনেস, যেখানে এককভাবে এগোনো সম্ভব নয়, বরং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব। সেকেলে বা এনালগ চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক প্রযুক্তিকে গ্রহণ করতে হবে। প্রযুক্তির ইতিহাস দেখলে দেখা যায়, প্রতিটি বড় উদ্ভাবন উৎপাদনশীলতার মাত্রা বদলে দিয়েছে। তবে প্রতিটি ‘কোয়ান্টাম লিপ’-এর পর সেই প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে গিয়ে যদি নতুন উদ্ভাবনকে উপেক্ষা করা হয়, তাহলে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। টেলিকম খাতেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য।
নতুন টেলিকম নীতিমালা প্রণয়নের প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি বলেন, দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই অংশীজনদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করে ধাপে ধাপে এই নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। একাধিকবার বৈঠক, মতামত গ্রহণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে। নীতিমালা নিয়ে সমালোচনা স্বাভাবিক, তবে তা অবশ্যই তথ্যভিত্তিক হওয়া উচিত। মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মন্তব্য করলে তা পুরো শিল্পখাতকে ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে। টেলিকম খাতের উন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতা, তথ্যভিত্তিক মতামত এবং ভবিষ্যৎমুখী চিন্তাভাবনা জরুরি। ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে একটি ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করার আহ্বানও জানান তিনি।
টিআরএনবি’র সভাপতি সমীর কুমার দে’র সঞ্চালনায় আয়োজিত সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন টিআরএনবি’র সাধারণ সম্পাদক মাসুদুজ্জামান রবিন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রযুক্তিবিদ সুমন আহমেদ সাবির। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেনÑ ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সভাপতি এম এ হাকিম, ফাইবার এট হোমের চেয়ারম্যান মইনুল হক সিদ্দিকী, মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (এমটব) মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মাসুদ কামাল প্রমুখ।
