পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফায় ভোটদানের হারকে বলা হচ্ছে অভূতপূর্ব, নজিরবিহীন। ভারতের নির্বাচনী ইতিহাসেও এই হার সর্বকালীন রেকর্ড করতে চলেছে বলে মনে করছেন নির্বাচনী বিশ্লেষকরা। নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী, প্রথম দফার এই নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে ভোট পড়েছে ৯২.৩৫ শতাংশ।
রেকর্ড ভোটদানের হারের অভিমুখ নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। এই বিপুল ভোটদানের হার কোন পক্ষকে নিশ্চিত জয়ের দিকে নিয়ে যাবে তা নিয়ে সকলেই দ্বিধায়। অবশ্য তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি উভয় পক্ষই দাবি করেছে, তারা চালকের আসনে পৌঁছে গেছে। তৃণমূল কংগ্রেস দাবি করেছে, তারা সরকার গড়ার কাছাকাছি সংখ্যায় ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছে। দ্বিতীয় দফায় ভোট হবে শাসকদলের ‘ঘাঁটি’ বলে পরিচিত দক্ষিণবঙ্গে। সেই সংখ্যা যোগ হওয়ার পরে বিজেপি দুরমুশ হয়ে যাবে। অন্যদিকে বিজেপি দাবি করেছে, তারা একশোর বেশি আসনে জিতে গেছে।
প্রথম দফার ভোট নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় বলেন, আমি যদি মানুষের নাড়ী বুঝতে পারি, তবে আপনাদের বলি, আমরা ইতিমধ্যেই চালকের আসনে বসে আছি।’তিনি আরও বলেন, ‘এ বার প্রত্যেকেই ভোট দিয়েছেন। কারণ, কেউ কোনও ঝুঁকি নিতে রাজি ছিলেন না।
তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ ও শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু দাবি করেছেন, তৃণমূল কংগ্রেস কম করে হলেও ১২৫টি আসন পাবে। দুই নেতাই দাবি করেছেন, তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট শতাংশ এবং আসন দুই-ই বাড়বে।
অন্যদিকে বিজেপির সাবেক রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার বলেন, প্রথম দফার ১৫২টি আসনের মধ্যে তারা একশোটিতে জিতবেন। তবে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী বিজেপি ১২৫টি আসন পাবে বলে আশাবাদী। বিজেপির জাতীয় সভাপতি নিতিন নবীন প্রথম দফার ভোট নিয়ে এতটাই উৎসাহী যে, তিনি বলেছেন, তারা প্রায় দুই তৃতীংশ আসন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসছেন।
প্রথম দফার ভোটর হারে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, ভোটের অধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ কেউ ছাড়তে চাননি। বিশেষ করে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বিধানসভা কেন্দ্রগুলোতে আগামী দিনের এনআরসির কথা ভেবে একজোট হয়ে সকলে ভোট দিয়েছেন বলে দাবি করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক সুনির্মল মাইতি। তিনি বলেন, তবে মুসলিমদের ভোট নানা সমীকরণে এবার বিভক্ত। তাই অন্যান্যবারের মতো সবটাই তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম।
তৃণমূল কংগ্রের এক জ্যেষ্ঠ্য নেতা এই প্রতিবেদককে বলেন, আমরা জানতাম বিপুল ভোট পড়বে। কারণ, এসআইআর করে যেমন মৃত এবং স্থানান্তরিত ভোটারদের নাম বাদ দেয়া হয়েছে, তেমনই বহু বৈধ নাগরিককেও ভোটের বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে যাদের নাম রয়েছে, তারা চক্রান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। বিপুলসংখ্যক মহিলা ভোট দিয়েছেন। যে সমর্থন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকেই গেছে।
নির্বাচনী পরিসংখ্যান নিয়ে কাজ করেন এমন এক গবেষক উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, শান্তিপূর্ণ ভোটের পরিবেশও এবার ভোটের হার বৃদ্ধির একটা কারণ। এছাড়া ভোটার তালিকার সংশোধনের ফলে যে ১২ শতাংশ ভোটার অর্থাৎ ৮৩ লাখ ৮৬ হাজার ভোটার কমে গেছে তার নিরিখে ভোটদানের শতাংশ বেড়েছে। তাছাড়া এসআইআরের পরে সব রাজ্যেই ভোটদানের প্রবণতা বেড়েছে। পশ্চিমবঙ্গও ব্যতিক্রম নয়। সকলের মধ্যে একটা ভীতি কাজ করেছে, ভোট না দিলে নাম কাটা যাবে। আর তাই বিভিন্ন রাজ্য থেকে পরিযায়ী শ্রমিকরা রাজ্যে ফিরে এসে ভোট দিয়েছেন।
নির্বাচনী বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, যেভাবে পুরুষদের ছাপিয়ে ৯২.৬৯ শতাংশ নারী এই দফার নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন তার একটা সুফল মমতার তৃণমূল কংগ্রেস পেতে পারেন। নারীদের জন্য বিভিন্ন খয়রাতি প্রকল্প এক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে বলে তৃণমূল কংগ্রেসপন্থীদেরও দাবি। অবশ্য অন্য একটি অংশের মতে, রাঢ় বাংলায় তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় কোন্দল, জনজাতি সমাজে ভাঙ্গন, প্রার্থী নির্ধালন নিয়ে অন্তর্দন্দ্ব এবং সরকার বিরোধীতা তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে কাজ করবে।
বিজেপিপন্থীদের বিশ্লেষণ, হিন্দু ভোটের সমীকরণ বিজেপিকে সুবিধা করে দিয়েছে। ফলে মালদহ ও দুই দিনাজপুরের কিছু অংশ বাদে উত্তরবঙ্গে বিজেপি ভালো ফল করবে। উত্তরবঙ্গের ৫৪টি আসনের মধ্যে অন্তত ৩৫-৪০টি আসনে বিজেপি জয়ী হবে। দক্ষিণবঙ্গেও বিজেপির অন্তত ২৫-৩০ আসনে জয় আসবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিজেপির পরিসংখ্যানবিদদের মতে, ২৫ শতাংশ মুসলিম ভোট এবং হিন্দুভোটের ২০ শতাংশও যদি তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে যায় তাহলেও বিপুলসংখ্যক হিন্দু ভোট বিজেপির দিকেও গেছে ।
জেলাওয়ারি ভোটদানের হারের সর্বশেষ যে চিত্র পাওয়া গেছে, তাতে কোচবিহারে ৯৫.১৭ শতাংশ ভোট পড়লেও জলপাইগুড়িতে ৯৪.০৯ শতাংশ, উত্তর দিনাজপুরে ৯৩.৩৩ ও দক্ষিণ দিনাজপুরে ৯৫.২২ শতাংশ মালদহে ৯৩,৪১ এবং মুর্শিদাবাদে ৯৩.৩২ শতাংশ ভোটা ভোট দিয়েছেন। দক্ষিণবঙ্গের বীরভূমে ৯৮.১৯ শতাংশ, বাঁকুড়ায় ৯১.৭৬ শতাংশ, ঝাড়গ্রামে ৯২.০৪ শতংশ, পূর্ব মেদিনীপুরে ৯০.৬৪ এবং পুশ্চম মেদিনীপুরে ৯১.৯৭ শতাংশ ভোট পড়েছে।
উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফায় বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল)ভোট হয়েছে বিধানসভার ২৯৪টি আসনের মধ্যে ১৫২ টি আসনে। আগামী ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় বাকি ১৪২টি আসনে ভোট হবে। দুই দফার ভোট একসঙ্গে গণনা হবে ৪ মে।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে নজিরবিহীন ভোটের হার
তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি উভয়েই দাবি করেছে তারাই চালকের আসনে
পরিতোষ পাল, কলকাতা
ভারত
২ মাস আগে
২৪ এপ্রিল (শুক্রবার), ২০২৬, ১২ঃ০১ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
