বাড়ছে লোডশেডিং

বাড়ছে লোডশেডিং

ফন্ট সাইজ:

লাভলী আক্তার। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলার বুধন্তি ইউনিয়নের একজন বাসিন্দা। বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে পরিবারের ছোট ছোট শিশু ও বৃদ্ধস্বজনদের নিয়ে চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন তিনি। বিদ্যুতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতেই শুরুতে বললেন, প্রচণ্ড গরম। তারমধ্যে বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকে। দিন-রাতে সমান তালে বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। এক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যায়। বিদ্যুৎ আসলে এক ঘণ্টা থাকে। বৃষ্টি বা ঝড় হলে তো কথাই নেই। সেই রাতে আর আসবে না বিদ্যুৎ। তিনি জানান, কমপক্ষে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না সেখানে। তারা পল্লী বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। তবে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ায় লোডশেডিং একটু কমিয়ে দিয়েছে।

সারা দেশেই বিদ্যুতের লোডশেডিং বাড়ছে। গ্রামের কোথায় কোথায় বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার মধ্যে রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী গ্রাহকরা। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে। এতে প্রভাব পড়ছে লোডশেডিং পরিস্থিতিতে। গ্রীষ্মের শুরু থেকেই লোডশেডিং নতুন মাত্রা পেয়েছে। গরম যত বাড়ছে, তত বাড়ছে বিদ্যুতের ঘাটতিও। এটা মে-জুনে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন। জ্বালানি সংকটের এই সময়ে উৎপাদন ধরে রেখে চাহিদামতো সরবরাহে হিমশিম খাচ্ছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। কয়েকদিন ধরে দিনের কোনো কোনো ঘণ্টায় দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করা হচ্ছে। এর মধ্যে ভারতীয় কোম্পানি আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। এতে লোডশেডিং আরও বেড়েছে। তবে রাজধানী ঢাকায় লোডশেডিং তেমন না হলেও সেচ কার্যক্রমে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখতে রাজধানীতেও পরীক্ষামূলকভাবে লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
বাংলাদেশ পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সন্ধ্যা ৮টায় বিদ্যুতের চাহিদা দাঁড়ায় ১৬ হাজার ৬৪৭ মেগাওয়াট। এই সময়ে উৎপাদন হয়েছে ১৪ হাজার ৪৬৭ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৮৬ মেগাওয়াট।

ওইদিন বিদ্যুতের ঘাটতি সর্বোচ্চ ২ হাজার ৪৬৮ মেগাওয়াট পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। এটা লোডশেডিং করতে হয়েছে। তবে গত কয়েকদিনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের লোডশেডিং ২ হাজার মেগাওয়াটের কম হয়নি। এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে গত কয়েকদিন তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং একাধিক এলাকায় তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস রয়েছে। এর ফলে আবাসিক খাতে ফ্যান, এসি ও কুলিং ডিভাইসের ব্যবহার বেড়েছে। কৃষিতে বোরো সেচের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। শিল্প খাতেও বৈদ্যুতিক জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা হঠাৎ লাফিয়ে বাড়লেও উৎপাদন সেই হারে বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলেই লোডশেডিং বাড়ছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে সাব-স্টেশন পর্যায়ে বিদ্যুতের দৈনিক গড় চাহিদা প্রায় সাড়ে ১৫ থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু প্রকৃত উৎপাদন ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। এখানেই ঘাটতি প্রায় ১ থেকে ২ হাজার মেগাওয়াট। পিক আওয়ারে এই ঘাটতি আরও বেশি। কিন্তু গ্রাহক পর্যায়ে চাহিদা আরও বেশি। তাই বিদ্যুতের প্রকৃত চাহিদা ও লোডশেডিং সরকারি তথ্যের চেয়ে বেশি বলে জানান খাত সংশ্লিষ্টরা।
পিডিবি ও পিজিসিবি সূত্র জানায়, আমদানিসহ দেশে বর্তমানে দৈনিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩২ হাজার ৩২২ মেগাওয়াট। গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ এবার চাহিদা সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াট হতে পারে বলে প্রাক্কলন করেছে সরকার। কিন্তু গরম বাড়লেও জ্বালানি সংকটে চাহিদানুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো।

বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে পিডিবি’র সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, ভারত থেকে আমদানি করা আদানির বিদ্যুতের একটি ইউনিট পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। এটি উৎপাদনে ফিরতে কয়েকদিন সময় লাগতে পারে। সেখান থেকে ৭৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসতো। এ জন্য বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়েছে। তবে তারা জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাতেও বেশি ঘাটতি কমানো যাবে না। ফলে আরও লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি ধরা হয়েছে: জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। বৃহস্পতিবার সর্বোচ্চ চাহিদা ধরা হয়েছে ১৭ হাজার মেগাওয়াট। একই সময়ে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হতে পারে। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি হতে পারে ৩ হাজার মেগাওয়াট। এ ঘাটতি পূরণে লোডশেডিং করতে হবে। গতকাল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বিদ্যুৎ বিভাগ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম সচিব উম্মে রেহানার। এতে জানানো হয়, বুধবার বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াট। সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৬৮১ মেগাওয়াট। তার মানে, ২ হাজার ৮৬ মেগাওয়াটের মতো লোডশেডিং হয়েছিল।

জ্বালানির প্রস্তুতিতে ঘাটতি সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা অনেক, কিন্তু গ্যাস ও জ্বালানি স্বল্পতার কারণে উৎপাদন করা যাচ্ছে না। গ্যাস ব্যবহার করে ৫ হাজার ২৭৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে বুধবার। যদিও উৎপাদনক্ষমতা ১২ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট; অর্থাৎ গ্যাসের স্বল্পতার কারণে অর্ধেকের কম উৎপাদন করা গেছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে হলে দিনে ২০০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ প্রয়োজন। যদি ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাসও সরবরাহ করা হয়, তাহলে ৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেত। কিন্তু গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে ৮৫ থেকে ৯০ কোটি ঘনফুট। উৎপাদন খরচ সাশ্রয় করতেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল কম ব্যবহার করা হয়। অনুষ্ঠানে বলা হয়, শিল্পাঞ্চল বেড়েছে, গরম বেড়েছে। বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে।

সব মিলিয়ে বিদ্যুতের চাহিদাটা অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু জ্বালানি সংকট অনেক বেশি। কয়লাভিত্তিক ৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি কারণে বন্ধ। তবে ২৬শে এপ্রিল এটি উৎপাদনে ফিরতে পারে। এ ছাড়া বাঁশখালীতে এসএস পাওয়ারের একটি ইউনিটে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম আসছে। ২৮শে এপ্রিল থেকে এটি পাওয়া যেতে পারে। আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে ১ হাজার ৯৮২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়তে পারে। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, গ্রাম ও শহরের মধ্যে লোডশেডিং সমন্বয় করার নির্দেশনা দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ, যাতে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত না হয়। এ ছাড়া ভারসাম্য বজায় রেখে যাতে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।

জ্বালানি সংকট নিরসনে সরকারি ও বিরোধী দলের ১০ সদস্যের কমিটি গঠন: জ্বালানি সংকট নিরসনে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। সরকারি দলের ৫ জন এবং বিরোধী দলের ৫ জন সংসদ সদস্যকে নিয়ে এই কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন। এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে বিরোধীদল। শিগগিরই তারা ৫ জন সদস্যের তালিকা দেবে বলে জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকে। বুধবার জ্বালানি সংকট নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী এই প্রস্তাব দেন এবং সরকারি দলের ৫ জন সদস্যের নাম জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে আমরা সকলেই আলোচনা করে একমত হয়েছিলাম বা একটি বিষয়ে আমরা সকলেই উপনীত হয়েছিলাম এটি একটি বৈশ্বিক প্রবলেম, সারা বিশ্বেই এই সমস্যায় উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা উনার বক্তব্যে বাংলাদেশের এটি যে কনসার্ন, সেটি এক্সপ্রেস করেছিলেন। প্রস্তাব দিয়েছিলেন উনাদের কাছে কিছু পরামর্শ আছে। সরকারি দল এবং বিরোধী দল আমরা একসঙ্গে সেই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে পারি।
তিনি বলেন, আমি আমার বক্তব্যে বলেছিলাম বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সকল সময় দেশের স্বার্থে, মানুষের স্বার্থে যেকোনো আলোচনা করতে প্রস্তুত রয়েছে। তারই প্রেক্ষাপটে আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি যে, আমরা আমাদের পক্ষ থেকে ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করছি। আমি বিরোধীদলীয় নেতাকে অনুরোধ করবো, উনারাও যদি ৫ জনের নাম দেন, তাহলে এই ১০ জন বসে এই বিষয়গুলোর উপর আলোচনা করতে পারেন। কোনো পরামর্শ থাকলে এই কমিটির মাধ্যমে সেটি সরকারের কাছেও আসলো। সরকার সেটার মধ্যে কোনো বাস্তবতা থাকলে অবশ্যই সেটি কার্যকর করার উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

তারেক রহমান বলেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, সংসদ সদস্য এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান, মইনুল ইসলাম খান শান্ত, মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু- এই ৫ জনের নাম উপস্থাপন করছি। আমি বিরোধীদলীয় নেতাকে অনুরোধ করবো, উনাদের পক্ষ থেকে নামগুলো যদি দ্রুত আমাদের কাছে দেন, তাহলে এই কমিটি দ্রুত কাজ শুরু করতে পারবে।

সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ বিষয়টাকে ইতিবাচকভাবে নেয়ার জন্য। আমরা আশা করি- এই সংসদ জাতীয় সকল সমস্যার সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু হবে ইনশাআল্লাহ্‌। আমরা মনে করি এই সংসদের জন্য এটি একটি নবযাত্রা। এটাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। আমরা শিগগিরই ইনশাআল্লাহ্‌ নামগুলো পেশ করবো।

পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের স্বার্থে সরকার ও বিরোধী দল এক থাকলে যেকোনো সংকট কাটিয়ে উঠা সম্ভব হবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন