টানটান উত্তেজনার পর হাসলো বাংলাদেশ। চট্টগ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে রচিত হলো নতুন ইতিহাস। গতকাল সফরকারী নিউজিল্যান্ডকে সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে ৫৫ রানে হারায় বাংলাদেশ। এতে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ নিজেদের করে নিয়েছে মেহেদী হাসান মিরাজের দল। শুরুতে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়লেও নাজমুল হোসেন শান্ত এবং লিটন কুমার দাসের অসাধারণ ব্যাটিং দৃঢ়তায় লড়াই করার মতো পুঁজি পায় স্বাগতিকরা। এরপর বল হাতে জ্বলে ওঠেন বাঁহাতি পেসার মোস্তাফিজুর রহমান। তার দুর্দান্ত বোলিং তোপে কিউইদের শক্তিশালী প্রতিরোধ ভেঙে যায়। প্রথম ম্যাচ হারার পর দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে টানা ২ জয়ে অসামান্য সাফল্য তুলে নিলো টাইগার শিবির। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এটি স্বাগতিকদের ৩য় ওয়ানডে সিরিজ জয়। ১৩ বছর পর সিরিজ জিতলো বাংলাদেশ। এর আগে ২০১০ ও ২০১৩তে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জেতে বাংলাদেশ। অভিজ্ঞদের পাশাপাশি তরুণদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স এই জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
অধিনায়ক হিসেবে মিরাজও গড়লেন টানা ৩ ওয়ানডে সিরিজ জয়ের অনন্য এক ব্যক্তিগত রেকর্ড। দেশের মাটিতে এটি টাইগারদের ২৭তম এবং সব মিলিয়ে ৩৩তম সিরিজ জয়ের অনবদ্য কীর্তি।
চট্টগ্রামে বাংলাদেশের ২৬৫ রানের জবাবে ৪৪.৫ ওভারে ২১০ রানে অলআউট হয়ে যায় নিউজিল্যান্ড। দীর্ঘ দিন পর একাদশে ফিরে ৯ ওভারে মাত্র ৪৩ রান খরচ করে ৫টি উইকেট শিকার করেন বাঁহাতি এই পেসার মোস্তাফিজুর রহমান। চট্টগ্রামের এই মাঠে কোনো পেসারের ৫ উইকেট পাওয়ার এটিই প্রথম ঘটনা। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে এটি তার ৬ষ্ঠবারের মতো ৫ উইকেট পাওয়ার কীর্তি। এমন অসাধারণ অর্জনের মাধ্যমে তিনি কিংবদন্তি পেসার ওয়াসিম আকরাম এবং কিউই তারকা ট্রেন্ট বোল্টের পাশে নিজের নাম লেখালেন। শেষ পর্যন্ত ৪৪.৫ ওভারে ২১০ রানে গুটিয়ে যায় সফরকারীদের গোটা ইনিংস। শরিফুল ইসলাম এবং রানা চমৎকার বোলিং করেন। শরিফুল ৭ ওভারে ১৯ রান দিয়ে ১টি উইকেট পান। অন্যদিকে রানা ২টি এবং অধিনায়ক মিরাজ ২টি উইকেট নিয়ে দলের জয়ে বড় অবদান রাখেন। ম্যাচ শেষে তৃপ্ত অধিনায়ক মিরাজের কণ্ঠে ছিল দলগত ঐক্যের সুর, ‘সবাই মিলে মাঠে দারুণ খেলেছি বলেই আমাদের এই সিরিজ জয় আজ সম্ভব হয়েছে’।
টস হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নামে স্বাগতিক বাংলাদেশ। শুরুটা ছিল চরম হতাশার। কিউই ফাস্ট বোলার উইল ও’রোক ইনিংসের শুরুতেই বেশ ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন। ১ম ওভারেই ০ রানে সাজঘরে ফেরেন সাইফ হাসান। উইকেটরক্ষক টম ল্যাথামের হাতে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন এ ওপেনার। এরপর দলীয় ৯ রানের মাথায় ফিরে যান আরেক ওপেনার তানজিদ হাসান। তিনি করেন মাত্র ১ রান। ৩ নম্বরে ব্যাট করতে নামা সৌম্য সরকার কিছুটা প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিলেন। তবে তিনিও খুব বেশি দূর এগোতে পারেননি। ১৮ রান করে তিনিও ও’রোকের শিকার হন। মাত্র ৩২ রানের মধ্যে টপ অর্ডারের ৩ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটারকে হারিয়ে চরম বিপদে পড়ে যায় স্বাগতিক দল। মনে হচ্ছিল বড় কোনো স্কোর হয়তো আর গড়া সম্ভব হবে না। গ্যালারির দর্শকদের চোখে-মুখে তখন চরম হতাশা। তবে ক্রিকেট যে চরম অনিশ্চয়তার খেলা সেটি আবারো মাঠে প্রমাণ হলো। খাদের কিনারা থেকে দলকে টেনে তোলার কঠিন দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেন শান্ত ও লিটন।
৪র্থ উইকেটে ১৬০ রানের এক মহাকাব্যিক জুটি গড়েন দুই অভিজ্ঞ ব্যাটার। ঘরোয়া লীগ এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে খেলার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তারা ধীরে ধীরে দলের রান বাড়াতে থাকেন। শান্ত ১১৯ বল খেলে ৯টি চার এবং ২টি বিশাল ছক্কার সাহায্যে ১০৫ রান করেন। এটি ওয়ানডেতে তার ৪র্থ সেঞ্চুরি। অন্যদিকে লিটন দাস ৯১ বল খেলে ৩টি চার এবং ১টি ছক্কার সাহায্যে ৭৬ রান করে জেডেন লেনক্সের বলে আউট হন। লিটনের বিদায়ের পর আগ্রাসী রূপ নেন হৃদয়। তিনি ২৯ বলে ২টি চার এবং ১টি ছক্কার সাহায্যে ৩৩ রান করে অপরাজিত থাকেন। শেষদিকে মিরাজ ১৮ বলে ২২ রানের একটি কার্যকরী ইনিংস খেলেন। কিউই বোলার বেন লিস্টার ১০ ওভারে ৬২ রান দিয়ে ২টি উইকেট তুলে নেন। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ৫০ ওভার শেষে ৮ উইকেট হারিয়ে ২৬৫ রানের সম্মানজনক সংগ্রহ দাঁড় করায় লাল সবুজের দল।
২৬৬ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই হোঁচট খায় সফরকারীরা। দলীয় ৮ রানের মাথায় হেনরি নিকোলসকে সাজঘরে ফেরত পাঠান মোস্তাফিজ। এরপর দ্রুত ফিরে যান উইল ইয়াং এবং অধিনায়ক টম ল্যাথাম। গতিময় তরুণ পেসার নাহিদ রানা তুলে নেন ইয়াংয়ের গুরুত্বপূর্ণ উইকেটটি। মাত্র ৬১ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে তীব্র চাপে পড়ে যায় নিউজিল্যান্ড। ৪র্থ উইকেটে নিক কেলি এবং মুহাম্মদ আব্বাস মিলে প্রাথমিক বিপর্যয় সামাল দেয়ার চেষ্টা করেন। কেলি দুর্দান্ত হাফ সেঞ্চুরি তুলে নেন। তিনি ৮০ বল খেলে ৫৯ রান করেন। তার ইনিংসে ১টি ছক্কা এবং ৬টি চার ছিল। অন্যদিকে আব্বাস ৩৬ বল খেলে ২৫ রান করেন। এই জুটি ভাঙেন মোস্তাফিজ। এরপর ডিন ফক্সক্রফট একা লড়াই চালিয়ে যান। তিনি ৭২ বল খেলে ৭৫ রানের একটি ঝড়ো ইনিংস খেলেন। তার ইনিংসে ছিল ৭টি বিশাল ছক্কা। কিন্তু অপর প্রান্ত থেকে তাকে কেউ সেভাবে সঙ্গ দিতে পারেননি।
ফক্সক্রফট এক প্রান্ত আগলে রাখলেও মোস্তাফিজের বোলিং তোপে বাকিরা ছিলেন সম্পূর্ণ অসহায়।
