ব্যাংক খাতের সংস্কার: খেলাপি ঋণের দুষ্টচক্র থেকে মুক্তির রূপরেখা

ব্যাংক খাতের সংস্কার: খেলাপি ঋণের দুষ্টচক্র থেকে মুক্তির রূপরেখা

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশ সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার পর এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনার সবচেয়ে জরুরি কাজগুলোর একটি হলো আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি ভেঙে পড়া আর্থিক খাতকে পুনর্গঠন করা। একটি দেশের অর্থনীতি কেবল উৎপাদন বা বাণিজ্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; এটি দাঁড়িয়ে থাকে আস্থার ওপর- ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিনিয়োগকারীর আস্থা, এবং আইনের কার্যকারিতার ওপর আস্থা। এই আস্থার কেন্দ্রেই আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে খেলাপি ঋণ।
খেলাপি ঋণ বিশ্বের সব অর্থনীতিতেই আছে, কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর ব্যাপ্তি ও কাঠামোগত চরিত্র উদ্বেগজনক। রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি, এবং দীর্ঘদিনের দায়মুক্তির সংস্কৃতি মিলিয়ে এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে। লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ কেবল ব্যাংকের ব্যালান্সশিটের সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা, উন্নয়ন প্রকল্পের ধারাবাহিকতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।
খেলাপি ঋণ আদায়ের প্রধান আইনি ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয় অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এবং নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারা। অর্থঋণ আদালত প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে দেখা যাচ্ছে, আইন থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রিতা, বিচারক সংকট এবং প্রক্রিয়াগত জটিলতায় আটকে আছে। ফলে আইনের শক্তি কাগজে আছে, বাস্তবে তার প্রভাব সীমিত।
বর্তমান আইনের কিছু বিধান পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। যেমন, ডিক্রির টাকা পরিশোধে বাধ্য করার জন্য দায়িককে দেওয়ানী কারাগারে আটক রাখার বিধান রয়েছে, কিন্তু মেয়াদ সীমিত। খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনুযায়ী আটকাদেশের মেয়াদ ধাপে ধাপে বাড়ানোর ব্যবস্থা করা গেলে আইনের প্রতিরোধমূলক শক্তি বাড়বে। একইভাবে, মামলা দায়েরের সময়সীমা সংক্রান্ত বিধানগুলো বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে আরও কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একটি বড় সমস্যা হলো উচ্চ আদালতে রিট করে নিম্ন আদালতের মামলা বছরের পর বছর স্থগিত রাখা। এতে বাদী আর্থিক প্রতিষ্ঠান কার্যত অসহায় হয়ে পড়ে। রিট দায়েরের সময় ঋণগ্রহীতাকে হালনাগাদ পাওনার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আদালতে জমা দেয়ার বিধান থাকলে কৌশলী বিলম্ব কমবে এবং বিচারপ্রক্রিয়া অপব্যবহার থেকে রক্ষা পাবে।
মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তাদের অযথা হয়রানি একটি বাস্তব সমস্যা। সরল বিশ্বাসে দায়িত্ব পালন করলে তাদের আইনি দায়মুক্তির সুরক্ষা দেয়া প্রয়োজন, যাতে তারা ভীতি নয়, পেশাগত সততার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। একইসঙ্গে দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি কেবল নিম্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে ব্যবস্থাপনা পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করা জরুরি, যাতে ঋণ অনুমোদনের সংস্কৃতিতে শৃঙ্খলা আসে।
ঋণগ্রহীতাকে বাধ্য করার ক্ষেত্রে কেবল দেওয়ানী কারাবাস নয়, আরও কার্যকর প্রশাসনিক বিধিনিষেধ যুক্ত করা যেতে পারে—যেমন পাসপোর্ট জব্দ, নতুন ব্যবসা নিবন্ধনে নিষেধাজ্ঞা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হওয়ার অযোগ্যতা। এগুলো শাস্তি নয়; বরং দায়বদ্ধতার কাঠামো।
উত্তরাধিকারীদের দায়বদ্ধতার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। যদি তারা মৃত ঋণগ্রহীতার সম্পত্তি ভোগ করে, তবে ঋণের দায় থেকেও তারা মুক্ত থাকতে পারে না। আইনকে এ বাস্তবতা স্পষ্টভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
বর্তমান কাঠামোয় মূল মামলার আগেই জামানত নিলামের সুযোগ না থাকায় বহু সম্পদের মূল্য সময়ের সঙ্গে কমে যায়। উপযুক্ত ক্রেতা পেলে মামলার চলমান অবস্থাতেই নিলামের সুযোগ রাখা গেলে ঋণ পুনরুদ্ধার দ্রুততর হবে। একইভাবে সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া সংক্ষিপ্ত করা প্রয়োজন, যাতে অযথা জেরা ও সময়ক্ষেপণ বন্ধ হয়।
ছোট ও মাঝারি অঙ্কের মামলার আপিল জেলা পর্যায়েই নিষ্পত্তির বিধান করলে উচ্চ আদালতের ওপর চাপ কমবে। জামানতবিহীন ঋণের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সংস্থার মাধ্যমে সম্পদ অনুসন্ধানের ব্যবস্থা করলে বাস্তব পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে।
ঋণ খেলাপির উৎপত্তিতে যেসব সহযোগী পক্ষ জড়িত—সিএনএফ এজেন্ট, কাস্টম কর্তৃপক্ষ বা অন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষ—তাদের আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা জরুরি। এতে দায়বদ্ধতার পরিধি বাড়বে। মধ্যস্থতা কার্যক্রম বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থঋণ মামলায় বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা বাতিল বা সীমিত করা হলে দ্রুত বিচার সম্ভব। আইনের অপব্যবহার করে ভুয়া লইয়ার সার্টিফিকেট দেখিয়ে মামলা স্থগিত রাখার সংস্কৃতি আদালতের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। এটি বন্ধে কঠোর বিধান দরকার।
মামলার আর্জিতে বন্ধকী সম্পত্তির পাশাপাশি অন্যান্য সম্পত্তির তালিকা যুক্ত করার বিধান থাকলে আদালত ঋণগ্রহীতার প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা বুঝতে পারবে এবং বিকল্প উৎস থেকে আদায় সম্ভব হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলোর একটি হলো—মামলা চলাকালে ঋণ বিতরণে অনিয়ম ধরা পড়লে আদালত যেন সরাসরি দুদক বা তদন্ত সংস্থাকে নির্দেশ দিতে পারে। এতে ব্যাংকিং খাতে প্রতিরোধমূলক শৃঙ্খলা তৈরি হবে।
বিদেশে পলায়ন রোধে আদালতের অনুমতি ছাড়া দেশত্যাগ নিষিদ্ধ করা, পাসপোর্ট জব্দ করা এবং বিদেশে পলাতকদের ফিরিয়ে আনার কূটনৈতিক নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা আদালতকে দেওয়া সময়ের দাবি।
মামলার শুরুতেই বন্ধকী সম্পত্তি সনাক্ত ও মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা এবং বিবাদী অনুপস্থিত থাকলে একতরফা নয়, দো-তরফা রায়ের বিধান রাখা—এসব সংস্কার বিচারপ্রক্রিয়াকে কৌশলী বিলম্ব থেকে মুক্ত করবে।
সবশেষে, আইন সংস্কারের পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন অপরিহার্য। পর্যাপ্ত অর্থঋণ আদালত, বিশেষায়িত বিচারক এবং প্রযুক্তিনির্ভর কেস ম্যানেজমেন্ট ছাড়া দ্রুত বিচার সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার ওপর। খেলাপি ঋণ কেবল আর্থিক সমস্যা নয়; এটি ন্যায়বিচার, সুশাসন এবং রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন। তাই আইন সংস্কার মানে কেবল টাকা উদ্ধার নয়—বরং একটি জবাবদিহিমূলক আর্থিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা।

লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন