হরমুজ টু হারভেস্ট

হরমুজ টু হারভেস্ট

ফন্ট সাইজ:

বিশ্ব অর্থনীতি যখন কোভিড-পরবর্তী পুনরুদ্ধারের ধাপ অতিক্রম করে একধরনের নাজুক স্থিতিশীলতায় পৌঁছাতে শুরু করেছিল, তখনই আবার নতুন করে এক বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে মানবসভ্যতা। এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সংকীর্ণ কিন্তু কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ—হরমুজ প্রণালী। পৃথিবীর মানচিত্রে এটি হয়তো খুব বড় কিছু নয়, কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবাহে এর ভূমিকা রক্তনালীর মতো অপরিহার্য। এই প্রণালীকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এখন শুধু ভূরাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা জ্বালানি, সার এবং খাদ্য নিরাপত্তার এক গভীর বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাগুলোর (২০২৫ সালের আপডেট অনুযায়ী) বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২১ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেট হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ২০-২১ শতাংশ। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-এর প্রায় ২০-২২ শতাংশ এই পথের ওপর নির্ভরশীল। কাতার, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি রপ্তানিকারক, তার প্রায় পুরো রপ্তানিই এই প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। ফলে এখানে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামকে অস্বাভাবিকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের বাজার প্রবণতা বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি ওঠানামা করছে, যা আগের বছরের তুলনায় গড়ে ১২-১৫ শতাংশ বেশি। এলএনজি স্পট মার্কেটেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যেখানে এশীয় বাজারে দাম প্রায় ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধি শুধু শিল্পোন্নত দেশগুলোতেই নয়, বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর আরও বেশি চাপ সৃষ্টি করছে।
কিন্তু জ্বালানির পাশাপাশি আরও একটি নীরব সংকট তৈরি হচ্ছে —তা হলো সারের বাজার। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক সার সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক ইউরিয়া উৎপাদনের প্রায় ৪৫-৫০ শতাংশ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসে। একই সঙ্গে অ্যামোনিয়া উৎপাদনের ক্ষেত্রেও এই অঞ্চলের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ। এই সারগুলোর বড় একটি অংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। ফলে এই রুটে বিঘ্ন মানেই বিশ্বব্যাপী হারভেস্ট বা কৃষি উৎপাদনের ওপর সরাসরি চাপ।
২০২৬ সালের শুরু থেকেই ইউরিয়া সারের আন্তর্জাতিক মূল্য টনপ্রতি প্রায় ৪৫০ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৭০০ ডলারে পৌঁছেছে, অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি। অ্যামোনিয়ার দামও একই সময়ে প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, কারণ তারা ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল।
এই সংকট একটি চেইন প্রতিক্রিয়ার মতো কাজ করে। প্রথমে জ্বালানির দাম বাড়ে, যার ফলে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পায়। প্রাকৃতিক গ্যাস হচ্ছে ইউরিয়া উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল, যার উৎপাদন খরচের প্রায় ৭০-৮০ শতাংশই গ্যাস নির্ভর। ফলে গ্যাসের দাম বাড়লে সারের উৎপাদন কমে যায় বা দাম বেড়ে যায়। এরপর কৃষকরা কম সার ব্যবহার করতে বাধ্য হন, যার ফলে ফসলের উৎপাদন কমে যায়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, সারের ব্যবহার ১০ শতাংশ কমে গেলে ফসল উৎপাদন গড়ে ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
বাংলাদেশের মতো একটি আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশই আমদানির ওপর নির্ভরশীল, যার বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৪৩ শতাংশ গ্যাস বা এলএনজি-নির্ভর। ফলে এলএনজি সরবরাহে সামান্য বিঘ্নও বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বছরে প্রায় ২৬-২৭ লক্ষ টন ইউরিয়া সার ব্যবহার করে, যার একটি বড় অংশ আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির ফলে সরকারকে ভর্তুকি বাবদ অতিরিক্ত ১৫-২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। তবুও অনেক সময় সরবরাহে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে, যা সরাসরি কৃষকদের প্রভাবিত করছে।
ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকরা অভিযোগ করছেন যে তারা প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার পাচ্ছেন না বা উচ্চমূল্যে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে বোরো ও আমন মৌসুমে উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদি বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকে, তবে খাদ্যশস্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
সংকটের বাস্তব চিত্র ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দৈনিক যুগান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল বিশেষ করে রাজশাহীতে ৩৮-৩৯ ডিগ্রি তাপপ্রবাহ, শুষ্ক গরম হাওয়া ও তীব্র বিদ্যুৎ সংকটে কৃষি বিপর্যস্ত। চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রায় অর্ধেক হওয়ায় সেচযন্ত্রের বড় অংশ অচল হয়ে পড়েছে। ১৫ হাজারের বেশি গভীর নলকূপের অনেকগুলোই বন্ধ থাকায় বোরো ধানসহ বিপুল জমি সেচবঞ্চিত। জ্বালানি ঘাটতি ও দীর্ঘ লোডশেডিং মিলিয়ে খাদ্য উৎপাদন এখন গুরুতর ঝুঁকির মুখে।
এই সংকটের প্রভাব শুধু কৃষি বা জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলছে।২০২৬ সালের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯-১০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে, যা গত কয়েক বছরের তুলনায় বেশি। চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ফলে অনেক পরিবার তাদের ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক বৈষম্যও বাড়তে পারে, কারণ উচ্চ আয়ের মানুষ এই ধাক্কা তুলনামূলকভাবে সহজে সামাল দিতে পারলেও নিম্ন আয়ের মানুষ তা পারছে না।
সরকার এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য অফিস সময় কমানো, বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, এবং বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষকদের জন্য ভর্তুকি ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এগুলো মূলত স্বল্পমেয়াদি সমাধান।
দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট মোকাবিলায় কাঠামোগত পরিবর্তন অপরিহার্য। জ্বালানি খাতে নবায়নযোগ্য উৎস—বিশেষ করে সৌর ও বায়ু শক্তির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৫ শতাংশেরও কম নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে। তবে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
একই সঙ্গে সারের ক্ষেত্রে স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিকল্প জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা গেলে কম সার ব্যবহার করেও ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। ড্রিপ ইরিগেশন, প্রিসিশন ফার্মিং-এর মতো প্রযুক্তি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এই সংকট আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনে দিয়েছে—বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। একটি সরু জলপথে বিঘ্ন মানেই পুরো বিশ্বের অর্থনীতি কেঁপে ওঠা—এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
ব্যক্তিগত পর্যায়েও এই পরিস্থিতি আমাদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানায়। জ্বালানি সাশ্রয়, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো এবং সঠিক তথ্যের ওপর নির্ভর করা এখন অত্যন্ত জরুরি। কারণ সংকটের সময়ে গুজব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

মোটকথা, “হরমুজ টু হারভেস্ট” - হরমুজ প্রণালি থেকে কৃষি উৎপাদন পর্যন্ত এই যাত্রা কেবল ভৌগোলিক বা অর্থনৈতিক রূপান্তরের গল্প নয়; এটি এক গভীর বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে একটি আঞ্চলিক অস্থিরতা ধীরে ধীরে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জে রূপ নিচ্ছে। এ সংকট হয়তো সাময়িকভাবে প্রশমিত হবে, কিন্তু এর শিক্ষা দীর্ঘমেয়াদি ও গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতের জন্য আরও স্থিতিশীল, বহুমুখী ও টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো নির্মাণে এখনই পরিকল্পিত প্রস্তুতি জরুরি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মানবসভ্যতা প্রতিটি সংকট থেকেই শিক্ষা নেয় এবং নতুন পথের সন্ধান করে; এই সংকটও তার ব্যতিক্রম হবে না।


লেখক: প্রফেসর ড. খালিদুর রহমান
পরিসংখ্যান বিভাগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন