দুই অক্ষরের ‘গুপ্ত’, তোলপাড় রাজনীতি

দুই অক্ষরের ‘গুপ্ত’, তোলপাড় রাজনীতি

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কোনো ইস্যু তৈরি হতে খুব বেশি সময় লাগে না। কখনও একটি বক্তব্য, কখনও একটি স্লোগান, কখনও একটি শব্দ হঠাৎ করেই জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে আসে। সাম্প্রতিক সময়ে তেমনই একটি শব্দ হলো ‘গুপ্ত’। মাত্র দুই অক্ষরের এই শব্দটি জাতীয় সংসদ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়াল, রাজনৈতিক মিছিল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যন্ত বিস্তৃত আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শব্দটি নিয়ে ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল, ছাত্ররাজনীতি এবং জনপরিসরে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তা কেবল একটি শব্দের অভিঘাত নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরে জমে থাকা অসহিষ্ণুতা, সন্দেহ এবং প্রতীকী সংঘাতের বহিঃপ্রকাশ।

জাতীয় সংসদে সরকারদলীয় একজন সদস্য যখন ‘গুপ্ত’ শব্দের প্রসঙ্গ টেনে বিরোধী পক্ষকে আক্রমণ করেন, তখন তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়। বিরোধীদলীয় নেতা সেই বক্তব্যকে অসংসদীয় আখ্যা দিয়ে তা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানান। সংসদের ভেতরে এই ধরনের বাকবিনিময় নতুন কিছু নয়। কিন্তু এই ঘটনার তাৎপর্য অন্য জায়গায়। এখানে প্রশ্ন কেবল কে কী বললেন, তা নয়; বরং একটি শব্দ কীভাবে রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতীক হয়ে উঠছে এবং সংসদীয় ভাষা কীভাবে ক্রমেই সংঘর্ষের ভাষায় রূপ নিচ্ছে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

‘গুপ্ত’ শব্দটি কেন এত আলোচিত, তার উত্তর খুঁজতে গেলে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিতে হয়। দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই সরাসরি অভিযোগের পাশাপাশি ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে রূপক, ইঙ্গিত, ব্যঙ্গ কিংবা সাংকেতিক শব্দ ব্যবহারের সংস্কৃতি নতুন নয়। তবে এখন সেই প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে। কারণ রাজনৈতিক মেরুকরণ যত বেড়েছে, ভাষাও তত প্রতীকনির্ভর হয়ে উঠেছে। ‘গুপ্ত’ যেন এখন কেবল একটি শব্দ নয়, বরং সন্দেহ, গোপন আনুগত্য, দ্বিচারিতা কিংবা ছদ্মবেশী অবস্থানের একটি রাজনৈতিক প্রতীক।

সমস্যা হলো, যখন রাজনীতিতে প্রতীক বাস্তবতার জায়গা দখল করে, তখন যুক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। একটি শব্দ তখন আর কেবল শব্দ থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে পক্ষ-বিপক্ষ নির্ধারণের হাতিয়ার। এর ফলে রাজনৈতিক বিতর্ক নীতিনির্ভর না হয়ে ব্যক্তিনির্ভর এবং আবেগনির্ভর হয়ে পড়ে। জনগণের সামনে তখন প্রকৃত প্রশ্নগুলো আড়ালে চলে যায়। দ্রব্যমূল্য, বেকারত্ব, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা কিংবা আইনশৃঙ্খলার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চাপা পড়ে যায় শব্দের সংঘাতে।

সংসদের ঘটনাটি আরও একটি বিষয় সামনে এনেছে। সেটি হলো সংসদীয় ভাষার ক্রমাবনতি। সংসদ একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক মঞ্চ। এখানে মতবিরোধ থাকবে, তর্ক হবে, কড়া সমালোচনাও থাকবে। কিন্তু সেই ভাষা হতে হবে শালীন, যুক্তিনির্ভর এবং দায়িত্বশীল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের সংসদে বহু বছর ধরেই ভাষার রাজনৈতিক সৌন্দর্য কমে গেছে। যুক্তির জায়গায় এসেছে কটাক্ষ, তথ্যের জায়গায় এসেছে তির্যক মন্তব্য, আর নীতির জায়গায় এসেছে ব্যক্তি আক্রমণ। ‘জনগণ বসে থাকবে না’ আঙুল চুষবে না, তাকিয়ে থাকবে না, তখন সেটি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। এই ধরনের বাক্য জনতার উদ্দেশে এক ধরনের ইঙ্গিত বহন করে। বিরোধী দল সেটিকেই হুমকি হিসেবে দেখেছে, এবং সেই জায়গা থেকেই তারা বক্তব্যটি এক্সপাঞ্জ করার দাবি তুলেছে। তাদের প্রশ্ন, সংসদের ভেতরে দাঁড়িয়ে জনগণকে এভাবে উসকে দেওয়ার মতো ভাষা কি গ্রহণযোগ্য?

তবে বিরোধী রাজনীতিও এখানে পুরোপুরি দায়মুক্ত নয়। কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায় সব দলই কোনো না কোনো সময়ে প্রতীকী ভাষার রাজনীতি করেছে। কখনও ‘স্বাধীনতার পক্ষ’, কখনও ‘গণতন্ত্রের শত্রু’, কখনও ‘দেশবিরোধী’, কখনও ‘বিদেশি শক্তির দালাল’ ইত্যাদি অভিধা দিয়ে প্রতিপক্ষকে চিহ্নিত করার সংস্কৃতি বহু পুরনো। ফলে আজ যে দল একটি শব্দের প্রতিবাদ করছে, অতীতে তারাও হয়তো অন্য কোনো শব্দকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। এই বাস্তবতা স্বীকার না করলে সমস্যার গভীরে যাওয়া যাবে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালগুলো এই বাস্তবতার স্পষ্ট প্রতিফলন। রাজশাহী থেকে ঢাকা, দেয়ালে দেয়ালে “গুপ্ত” লেখা, তার সামনে ছবি তোলা, আবার সেই লেখাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়ানো, এসব ঘটনা দেখায় শব্দটি কত দ্রুত মাঠের রাজনীতিতে নেমে এসেছে। চট্টগ্রামে ছাত্রসংগঠনের ওপর হামলার অভিযোগ এই উত্তেজনাকে আরও স্পষ্ট করে। একটি শব্দ লেখা বা উচ্চারণকে কেন্দ্র করে যদি সংঘর্ষের পরিবেশ তৈরি হয়, তাহলে সেটি কেবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং সহনশীলতার সংকটের ইঙ্গিত। যেখানে মতের বিরুদ্ধে পাল্টা মত আসার কথা, সেখানে দেখা যাচ্ছে প্রতিক্রিয়া আসছে শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। গণতন্ত্র শুধু ভোটের বিষয় নয়; এটি মত প্রকাশের পরিবেশ, সহনশীলতা এবং রাজনৈতিক পরিপক্বতার বিষয়। যখন একটি শব্দই এত অস্থিরতা তৈরি করে, তখন বোঝা যায় সমাজে আস্থার সংকট কত গভীর। রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরকে প্রতিপক্ষ নয়, প্রায় শত্রু হিসেবে দেখতে শুরু করলে ভাষাও সংঘাতমুখী হয়ে ওঠে। আর ভাষা যখন উত্তেজিত হয়, তখন রাজনীতিও ক্রমে উত্তপ্ত হয়।

এখানে স্পিকারের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা জরুরি। তিনি বলেছেন, অসংসদীয় কিছু থাকলে তা পরীক্ষা করে দেখা হবে। এটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সঠিক বক্তব্য। কিন্তু বৃহত্তর প্রশ্ন হলো, সংসদে ভাষার মান রক্ষা কি কেবল স্পিকারের দায়িত্ব? না, এটি প্রতিটি সদস্যের নৈতিক দায়। সংসদ সদস্যরা যদি বুঝতে না পারেন যে তাদের প্রতিটি শব্দ সংসদের বাইরে জনপরিসরে প্রতিফলিত হয়, তাহলে রাজনৈতিক ভাষা আরও নিচে নামবে। কারণ সংসদের ভাষা শেষ পর্যন্ত মাঠের ভাষাকে প্রভাবিত করে।

‘গুপ্ত’ শব্দ নিয়ে এই বিতর্কের মধ্যে একটি বড় শিক্ষা আছে। সেটি হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন শব্দও আর নিরীহ নেই। শব্দও এখন অবস্থান জানায়, বিভাজন তৈরি করে, উত্তেজনা ছড়ায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি রাষ্ট্র কতদিন শব্দের রাজনীতিতে আটকে থাকতে পারে? জনগণ কি সত্যিই জানতে চায় কে কাকে কী নামে ডাকলো, নাকি তারা জানতে চায় তাদের জীবনযাত্রা কতটা বদলাবে? রাজনীতির ভাষা যদি মানুষের জীবনের প্রশ্ন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তবে সেটি কেবল দলীয় সমর্থকদের উচ্ছ্বসিত করতে পারে, দেশের রাজনৈতিক মান উন্নত করতে পারে না।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন প্রয়োজন শব্দের দখল নয়, ভাষার সংযম। প্রতীকী আক্রমণ নয়, বাস্তব প্রশ্নে প্রতিযোগিতা। সংসদে হট্টগোল নয়, নীতির বিতর্ক। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি দেশের রাজনৈতিক পরিপক্বতা বোঝা যায় তার নেতারা কী বলেন, তার চেয়েও বেশি বোঝা যায় তারা কীভাবে বলেন।

‘গুপ্ত’ নিয়ে চলমান বিতর্ক হয়তো কিছুদিন পর অন্য কোনো ইস্যুর নিচে চাপা পড়বে। কিন্তু এটি যে সংকেত দিয়ে গেল, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সেই সংকেত হলো, বাংলাদেশের রাজনীতি ক্রমেই শব্দের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে। এখন সিদ্ধান্ত রাজনীতিবিদদের, তারা কি শব্দকে আগুন বানাবেন, নাকি সংলাপের সেতু বানাবেন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]

MD.Hafiz Uddin

২ মাস আগে

Can Bangladesh come out from chadabagi, muscle politics,tag culture & Fascism? We are hopeless.

সিরু

২ মাস আগে

গুপ্ত বললে জ্বলে যার,
সেই হলো জঙ্গি সন্ত্রাসী রগকাটা রাজাকার।

Shahid

২ মাস আগে

ফ্যাসিস্ট আমলে সব রাজনৈতিক দলকেই গোপনীয় রক্ষায় রাজনীতি করতে হয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলেও ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগ গুপ্তভাবে তাদের রাজনৈতিক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এবং সরকারের বিপক্ষ শক্তিও তাদের বিভিন্ন মিটিং, সভা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক কার্যক্রমে গোপনীয়তা রক্ষা করে। হাসিনার বিরুদ্ধে অতি গোপনে রাজনৈতিক কার্যক্রমের ফলে হাসিনা দেশ থেকে বিতাড়িত। সুতরাং যারা হাসিনার পক্ষে ছিলো তাদের গোপন হওয়া লাগেনি। আর আজ তারা ক্ষমতায়।

রুহেল

২ মাস আগে

কী সুন্দর! ফুটফুটে সুন্দরদের ভাষা! আজ যারা ক্ষমতায়, তারা হাসিনার পক্ষে ছিলো? গুপ্তরা মিথ্যাচারের সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে। একটি ঘটনার উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে কারা হাসিনার পক্ষে ছিলো ২০২৩ সালে বিএনপির জনসভায় পুলিশের হামলা, গুলিবর্ষণ অথচ গুপ্তরা পুলিশকে ফুল দিয়ে, আনন্দ উচ্ছাস করে জনসভা করলো। ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালে তারা হাসিনার সাথে সমঝোতার রাজনীতি করে এখন মিথ্যাচার করছে। আল্লাহ ছাড় দিচ্ছেন, কিন্তু ছেড়ে দিবেন না। অতএব সাবধান!

Obak

২ মাস আগে

গুপ্ত থাকা সেই সব লোক কি হাসিনার অপকর্মের দায় নিয়েছে ? রাজনীতিতে গুপ্তরা ভন্ড সেটা সব আমলেই .

অনন্যা

২ মাস আগে

মিঃ গুপ্ত আপনার ভাষায় ”হাসিনার বিরুদ্ধে অতি গোপনে রাজনৈতিক কার্যক্রমের ফলে হাসিনা দেশ থেকে বিতাড়িত!” বাহঃ এত চমৎকার বয়ান আপনাদের। তাহলে গনহত্যার দায় কার? হাসিনার না আপনাদের? এতটা মেধাবী আপনারা যে বয়ান তৈরি করতে যেয়ে নিজেরাই ফেসে যান। আপনারা আসলে নির্লজ্জ্ব বেহায়া, পরগাছা, আপনারা নিজের উপর ভরসা করতে পারেন না। সেজন্য মার্কাও একটা নিয়েছেন দাঁড়িপাল্লা। ইয়াহিয়া, এরশাদ, হাসিনা বা খালেদা বর্তমানে এনসিপি কাউকে না কাউকে ধরতে/ভর করতে হয়!

হারুন আল রশিদ

২ মাস আগে

শব্দকে শব্দ দিয়ে জব্দ করা যায় কিন্তু এর দূর্গন্ধ থেকে যায়। প্রয়াত প্রধান বিচারপতি জনাব হাবিবুর রহমান বিরচিত বাংলাভাষার 'ভাব-অভিধান-- ''যথাশব্দ'' নামক একখানা হীরা জহরতের খনি আছে। তাতে এই 'গুপ্ত' শব্দটির নির্ঘন্ট নির্দেশিকায় উপধারাক্রমে ' গোপন প্রচ্ছন্ন সংরক্ষিত গুপ্তকথা গুপ্তঘাতক গুপ্তচর গুপ্তধন গুপ্তাবাস গুপ্তবিদ্যা গুপ্তভোট গুপ্তমন্ত্রণা গুপ্তলিখন গুপ্তসমিতি গুপ্তহত্যা লিপিবব্ধ করা আছে। এগুলোর অধীনে আরো হাজার খানিক শব্দ আছে যেগুলোর অধিকাংশই নেতিবাচক'। তবে আমাদের রাজনীতিতে এটি বোধ করি -' গোপনে চুপিসারে চুপেচাপে অগোচরে অপ্রকাশ্যে অসাক্ষাতে অসমক্ষে আড়ালে আবডালে অজান্তে নেপথ্যে তলেতলে ফাঁকে ফাঁকে' যা ঘটে বা ঘটার আয়োজন চলে তাই 'গুপ্ত'।

মন্তব্য করুন