গুমের মামলায় সাক্ষীর জবানবন্দি

ছদ্ননাম ধারণ করেও শেষ রক্ষা হয়নি নজরুলের

ফন্ট সাইজ:

আমার বড় ভাইয়ের ছেলে নজরুল ইসলাম বিডিআর হাসপাতালের মেডিকেল এ্যাসিসটেন্ট। ২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহ হলে নজরুল সেখান থেকে বের হয়ে কেরানীগঞ্জে এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। পরবর্তীতে ২০১০ সালের জানুয়ারী মাসে নজরুল ইসলাম গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় নুরুল ইসলাম মুন্সী ছদ্ননাম ধারণ করে মধুমতি ক্লিনিকে চাকুরী নেয়। নজরুলের আশঙ্কা ছিলো বিডিআর বিদ্রোহ নিজ চোখে দেখায় তাকে হত্যা করা হতে পারে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি নজরুলের। সে বছরের ১৫ই মার্চ ক্লিনিকের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে যাওয়ার পর রাতে আর বাসায় ফিরে নাই। পরবর্তীতে বলেশ্বর নদীতে তার লাশ পাওয়া যায়।

নজরুলের লাশের দুই হাত পিছমোড়া করে বাঁধা এবং পেট ফাড়া অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। আমরা বিভিন্ন লোক মারফত জানতে পারি যে র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগ নজরুলকে হত্যা করেছে। গুমের মামলায় এভাবেই ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যর জবানবন্দি দেন নিহতের চাচা হাবিবুর রহমান মল্লিক। বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাঃধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ তিনি সাক্ষ্য দেন। তবে এদিন সাক্ষ্য শেষে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের জেরা করা শেষ হয়নি। সাক্ষী হাবিবুর রহমানকে জেরার জন্য আগামীকাল ২৩শে এপ্রিল দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। আওয়ামী লীগ শাসনামলে সংঘটিত শতাধিক গুম-খুনের অভিযোগে দায়েরকৃত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে চতুর্থ সাক্ষী হিসেবে তিনি জবানবন্দি দিয়েছেন।

জবানবন্দিতে হাবিবুর রহমান মল্লিক বলেন, আমার বড় ভাইয়ের ছেলে নজরুল ইসলাম বিডিআর হাসপাতালের মেডিকেল এ্যাসিসটেন্ট হিসেবে চাকুরী করতো। তার কর্মস্থল ছিলো পিলখানা হাসপাতাল। ২০০৯ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারী বিডিআর বিদ্রোহ হলে বিকেল ৩/৪টার দিকে নজরুল আমাদেরকে ফোন দিয়ে জানায় যে, সে আর বিডিআর হাসপাতালে থাকবে না। সে সেখান থেকে বের হয়ে যাবে। সে অনুযায়ী নজরুল সেখান থেকে বের হয়ে কেরানীগঞ্জে এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। নজরুল তার স্ত্রীকে নিয়ে পিলখানা বিডিআর সদর দপ্তরের নিকটে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতো। নজরুলের স্ত্রী পোস্তগোলা কাকির বাসায় চলে যায়। ৪/৫ দিন পর নজরুল তার স্ত্রীকে কেরানীগঞ্জে নিয়ে যায়। নজরুলের বাবা ফোনে নজরুল বিডিআরে যোগদানের বিষয়ে বললে নজরুল বলেন আমি বিডিআরে যোগদান করবো না কারণ সাক্ষীদেরকে মেরে ফেলছে মর্মে শুনেছি। এরপর ৫/৬ মাস পর নজরুল তার স্ত্রী ও বাচ্চাকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়।

পরে, ২০১০ সালের জানুয়ারী মাসে নজরুল ইসলাম গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় মধুমতি ক্লিনিকে চাকুরী নেয়। এর কিছুদিন পর সে তার পরিবারকে সেখানে নিয়ে যায়। সেখানে মেডিকেল কোয়ার্টারে একটি ছোট রুম ভাড়া নেয়। ক্লিনিকে চাকুরী নেওয়ার সময় নজরুল ইসলাম তার নাম পরিবর্তন করে নুরুল ইসলাম মুন্সী নামে চাকুরী নেয় এবং বাসা ভাড়া নেওয়ার সময়ও ঐ নাম ব্যবহার করে। একই বছর ১৫ই মার্চ নজরুল ক্লিনিকের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে যাওয়ার পর রাতে আর বাসায় ফিরে নাই। নজরুলের স্ত্রী আমাদের সবাইকে ফোন করে জানায় যে নজরুল ইসলাম আজকে রাতে বাসায় ফিরেনি। পরদিন সকালে নজরুল ইসলামের স্ত্রী মুন্নী আক্তার তার মেয়েকে নিয়ে ক্লিনিকে গিয়ে নজরুল ইসলাম ওরফে নুরুল ইসলাম মুন্সীর বিষয়ে সন্ধান করলে তাকে জানায় যে, সে তার বন্ধু রুহুল আমীনের সাথে একটি লাল মোটরসাইকেলে করে চলে গেছে। সেখান থেকে আরো জানতে পারে যে, রুহুল আমীন নাকি গোপালগঞ্জ হাসপাতালে ভর্তি আছে। নজরুল ইসলামের স্ত্রী গোপালগঞ্জ হাসপাতালে গিয়ে রুহুল আমীনের কাছে তার স্বামী সম্পর্কে জানতে চাইলে রুহুল আমীন বলেন প্রতিদিনের মতন মাগরীবের পূর্বক্ষণে ক্লিনিক হতে মোটরসাইকেল যোগে আসতে থাকলে বামতা এর মোড়ে পৌঁছালে সাদা পোশাকধারী ৬/৭ জন লোক তাদের গতিরোধ করে এবং নুরুল ইসলাম মুন্সীকে একটি মাইক্রোবাসে তোলে এবং রুহুল আমীনকে মারপিট করে একটি চোখ নষ্ট করে দেয়।

জবানবন্দিতে হাবিবুর রহমান মল্লিক আরও উল্লেখ করেন, মুন্নী আক্তার তার ভাসুরকে ফোন দিয়ে বিষয়টি জানায়। তার ভাসুর কোটালীপাড়ায় যায়। এরপর মুন্নী আক্তার তার ভাসুরকে নিয়ে ১৭ই এপ্রিল কোটালীপাড়া থানায় গিয়ে একটি অপহরণের মামলা করে। তারপর মুন্নী আক্তার তার বাচ্চাকে নিয়ে তার শ্বশুড়বাড়ি চলে আসে। ২০/২২ মে ঝালকাঠি থেকে ডিএসবির লোক আমাদের বাড়িতে গিয়ে জানায় যে নজরুলের লাশ বলেশ্বর নদীতে পাওয়া গেছে। সেখান থেকে তার লাশ পুলিশ শরণখোলা থানায় নিয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, নজরুলের ছোট ভাই জাহিদুল ইসলাম বিডিআরে ক্লার্ক পদে চাকুরী করে। তার কর্মস্থল ছিলো চট্টগ্রামের রামগর। তাকেও আমরা ফোনে জানাই ডিএসবির লোক আমাদের বাড়িতে এসে এরকম একটি কথা বলে গেছে, তুমি খোঁজখবর নাও। তখন জাহিদুল ইসলাম পত্রিকায় একটি লাশের ছবি দেখে তার ভাইয়ের লাশ হিসেবে শনাক্ত করে। জাহিদ ঐ পত্রিকা আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসে। তাতে আমি দেখি নজরুলের লাশের দুই হাত পিছমোড়া করে বাঁধা এবং পেট ফাড়া। উক্ত সংবাদ পাবার ২/৩ দিন পর নজরুলের তিন ভাই, আমি ও নজরুলের স্ত্রী শরণখোলা থানায় যাই। থানা থেকে জানানো হয় যে, কোন ওয়ারিশ না পাওয়ায় নজরুলের লাশ আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে বাগেরহাট গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে। আমি নিজেই লাশ ফেরত পাবার জন্য বাগেরহাট জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করি। তিনি আমাদেরকে জানান বিষয়টি তিনি আমাদেরকে পরবর্তীকালে নিষ্পত্তি করে জানাবেন। এই উত্তর শুনে আমরা বাড়িতে চলে আসি। ২০১০ সালের জুন মাসের ২০/২২ তারিখে বাগেরহাট জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে নজরুলের বাবা ও মাকে নিয়ে আমাদের সেখানে যেতে বলে। জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে আমাদের জানানো হয় যে ডিএনএ পরীক্ষা করতে হবে।

নজরুলের বাবা মার কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা নিয়ে বলে এই নমুনা ঢাকায় পাঠানো হবে, সেখান থেকে রিপোর্ট আসার পর আমাদের পুনরায় সংবাদ দেওয়া হবে। এরপর আমরা বাড়ি চলে আসি।
তিনি বলেন, একই বছরের আগস্ট মাসের শেষ দিকে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মহোদয় আমাদেরকে পুনরায় বাগেরহাট যেতে বলেন। ঐ সংবাদ পেয়ে নজরুলের তিন ভাই, তার স্ত্রী ও ভগ্নিপতি বাগেরহাট যায়। জেলা প্রশাসক তাদেরকে জানায় ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী নজরুলের ডিএনএ এবং তার পিতা-মাতার ডিএনএ মিলে গেছে। সুতরাং নজরুল তাদের। জেলা প্রশাসকের অনুমোদনক্রমে বাগেরহাটের কবরস্থান থেকে নজরুলের লাশের অবশিস্টাংশ উত্তোলনপূর্বক নিয়ে এসে আমাদের পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করি। এরপর মাঝে মাঝেই গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন আমাদের বাড়িতে আসতো এবং নজরুল সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন করতো। এরপর আমরা বিভিন্ন লোক মারফত জানতে পারি যে র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগ নজরুলকে হত্যা করেছে।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন