‘যুদ্ধের ছায়ায়’ পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন

‘যুদ্ধের ছায়ায়’ পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন

ফন্ট সাইজ:

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট হতে যাচ্ছে বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল)। গণমাধ্যমের ভাষ্যে রাজ্যে রীতিমতো ‘যুদ্ধের মতো’ পরিস্থিতি। ভোট ঘিরে রাজ্যে কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনীর হাজার হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গ ভোটযুদ্ধের পটভূমিতে ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক অগ্নিগর্ভ অধ্যায়ের কেন্দ্রবিন্দু। বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটের প্রাক্কালে রাজ্যজুড়ে যে নিরাপত্তা বলয় তৈরি হয়েছে, তাকে অনেকেই “যুদ্ধকালীন” পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করছেন। হাজার হাজার কেন্দ্রীয় আধা-সামরিক বাহিনী মোতায়েন, প্রতিদিন নতুন নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক উত্তেজনা—সব মিলিয়ে একটি প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছে: এই নির্বাচন কি ভারতের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে, নাকি তার ভেতরের সংকটগুলোকে আরও উন্মোচিত করবে?
ভারত দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে পরিচিত। সেই পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নির্বাচন প্রক্রিয়া—যা পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন। পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনে কমিশনের সক্রিয়তা নিঃসন্দেহে দৃশ্যমান। কঠোর বিধিনিষেধ, পর্যায়ক্রমিক ভোট, বিপুল নিরাপত্তা—সবই একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা। কিন্তু এখানেই একটি দ্বিধাবিভক্ত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।

একদিকে, এই নিরাপত্তা বলয় ভোটারদের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে পারে। বহু বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি অনেকের কাছে “নিরাপত্তার গ্যারান্টি”। অন্যদিকে, একই দৃশ্য আবার ভোটকে একটি স্বাভাবিক নাগরিক অধিকার নয়, বরং “নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া” হিসেবে তুলে ধরে। যখন ভোট দিতে যাওয়ার পথে একজন সাধারণ মানুষকে সশস্ত্র বাহিনীর নজরদারি পেরোতে হয়, তখন গণতন্ত্রের স্বতঃস্ফূর্ততা কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ণ হয়।

তবে নির্বাচনকে ঘিরে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক মেরুকরণ। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ঐতিহাসিকভাবে আদর্শগত লড়াইয়ের জন্য পরিচিত ছিল। বিভাজন ছিল বাম বনাম ডান, গ্রাম বনাম শহর, শ্রম বনাম পুঁজি‘র মধ্যে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই মেরুকরণ আরও গভীর ও জটিল হয়েছে। ধর্ম, পরিচয়, সাংস্কৃতিক প্রতীক—সবকিছুই এখন ভোটের সমীকরণের অংশ। “আমরা” এবং “তারা”—এই বিভাজন রাজনৈতিক ভাষ্যকে প্রভাবিত করছে উগ্র ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা।

এই প্রবণতা ভারতের বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। গণতন্ত্রে প্রতিযোগিতা স্বাভাবিক, এমনকি প্রয়োজনীয়ও। কিন্তু যখন সেই প্রতিযোগিতা সামাজিক বিভাজনকে তীব্র করে তোলে, তখন তা গণতন্ত্রের জন্য দ্বিমুখী ফল বয়ে আনে। এতে ভোটের হার বাড়তে পারে, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়তে পারে—কিন্তু একই সঙ্গে কমে যেতে পারে সামাজিক আস্থা ও সহনশীলতা।

এখানেই এসে দাঁড়ায় ভারতের অসাম্প্রদায়িকতার প্রশ্ন। সংবিধানিকভাবে ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। কিন্তু নির্বাচনী বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, ধর্মীয় পরিচয় ক্রমেই রাজনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে চলে আসছে। রাজনৈতিক দলগুলো সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করছে ভোটব্যাংক সুসংহত করার জন্য। এর ফলে অসাম্প্রদায়িকতা কোনো স্থির ধারণা হিসেবে থাকছে না; বরং তা একটি পরিবর্তনশীল, বিতর্কিত ও কখনো কখনো সংকুচিত ধারণায় রূপ নিচ্ছে। ফলে ভারত বর্তমানে একটি রূপান্তরের দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে রয়েছে সংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতার ঐতিহ্য, অন্যদিকে উত্থান ঘটছে ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের। এই দুই প্রবাহের সংঘাতই পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতিকে জটিল করে তুলেছে।

পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচন তাই কেবল ক্ষমতার পালাবদলের প্রশ্ন নয়। এটি একটি বৃহত্তর পরীক্ষাও বটে। ভারতের গণতন্ত্র কতটা চাপ সহ্য করতে পারে, তার একটি বাস্তব পরীক্ষা হচ্ছে ভোটের মাধ্যমে। যদি নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়, ভোটাররা নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন এবং ফলাফল সর্বজনগ্রাহ্য হয়—তাহলে এটি ভারতের গণতন্ত্রের স্থিতিস্থাপকতার প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবে। কিন্তু যদি সহিংসতা, ভীতি ও অবিশ্বাস প্রাধান্য পায়, তাহলে তা গণতন্ত্রের কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখেও তার আত্মাকে দুর্বল করে দেবে।

শেষ পর্যন্ত, গণতন্ত্র কেবল প্রতিষ্ঠান দিয়ে টিকে থাকে না এটি টিকে থাকে মানুষের আস্থা, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর। পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচন সেই আস্থারই পরীক্ষা। যুদ্ধের ছায়ায় অনুষ্ঠিত এই ভোট কি শান্তির বার্তা বয়ে আনবে, নাকি বিভাজনের রেখাকে আরও গভীর করবে—তার উত্তরই নির্ধারণ করবে ভারতের গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার আগামী পথরেখা।

লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।

Sanjiv kumar Malik

২ মাস আগে

BANGLADESHI MUSLIM SHOYTAN DER KHARAP NAJOR JATE NA PORE , TAR JANNOI ETO AYOJAN .

মন্তব্য করুন