ঢাকা একটি দ্রুত বর্ধনশীল মেগাসিটি। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এই শহরে যুক্ত হচ্ছে জীবিকা, শিক্ষা ও উন্নত জীবনের আশায়। কিন্তু এই উন্নয়নের আড়ালে ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে এক নীরব বিপর্যয় প্লাস্টিক দূষণ। বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সচেতনতার দিন ঊধৎঃয উধু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্য দুই-ই নিরাপদ থাকে।
ঢাকা শহরের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ২ কোটির কাছাকাছি। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবনে প্লাস্টিক এখন অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাজারের ব্যাগ, পানির বোতল, খাবারের প্যাকেট, অনলাইন ডেলিভারির প্যাকেজিং সবকিছুতেই একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সমস্যাটি শুধু ব্যবহারে নয়, বরং এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনায়। প্রতিদিন উৎপন্ন বিপুল বর্জ্যের একটি বড় অংশই প্লাস্টিকজাত, যা নালা-নর্দমা, খাল ও নদীতে গিয়ে জমা হয় এবং বর্ষাকালে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে।
ঢাকার নদীগুলো বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু আজ শুধু পানির প্রবাহ নয়, বরং পরিণত হয়েছে নগর বর্জ্যের চূড়ান্ত গন্তব্যে। বছরের পর বছর জমে থাকা প্লাস্টিক, পলিথিন ও শিল্পবর্জ্য নদীর তলদেশে একটি কঠিন স্তর তৈরি করেছে, যা পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করছে এবং নদীর জীববৈচিত্র্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একইভাবে শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থাও প্লাস্টিকে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে, ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো এই প্লাস্টিক দূষণের সরাসরি প্রভাব এখন মানবস্বাস্থ্যে পড়ছে। খাবার, পানি ও বাতাসের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট, কিডনি ও লিভারের সমস্যা এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এছাড়া প্লাস্টিক পোড়ানো থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাস শহরের বায়ুদূষণ বাড়িয়ে শ্বাসতন্ত্রের রোগ, অ্যাজমা ও ব্রংকাইটিসের মতো সমস্যা সৃষ্টি করছে। শিশু ও বয়স্করা এই ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।
ঢাকা শহরের যেকোনো উন্মুক্ত স্থান ফাঁকা জমি, রাস্তার ধারের মাটি, নির্মাণ এলাকা বা খোলা ড্রেন সব জায়গাতেই প্লাস্টিকের উপস্থিতি দেখা যায়। মাটির স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং ধীরে ধীরে তা মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হচ্ছে, যা খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানুষের শরীরেও প্রবেশ করতে পারে। এই অবস্থায় নগর পরিবেশ এক ভয়াবহ চক্রে আটকে গেছে, যেখানে নদী, মাটি, পানি এবং মানুষের জীবন একসাথে দূষণের শিকার।
এই সংকট মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জনসচেতনতা এবং আচরণগত পরিবর্তন। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পরিহার করা, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ ব্যবহার, বর্জ্য আলাদা করে ফেলা এবং রিসাইক্লিং ব্যবস্থা কার্যকর করা এখন জরুরি হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং গণমাধ্যমে পরিবেশ শিক্ষা ও সচেতনতা কার্যক্রম বাড়াতে হবে।
প্লাস্টিক দূষণ এখন আর শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয় এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য ও নগর টেকসইতার সংকট। আর্থ ডে ২০২৬ আমাদের স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতি ও স্বাস্থ্য রক্ষা ছাড়া উন্নয়ন কখনোই পূর্ণতা পেতে পারে না।
লেখক: অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
আর্থ ডে ২০২৬: প্লাস্টিক দূষণ রোধে জনসচেতনতার বিকল্প নেই
অধ্যাপক মোহাম্মদ সফি উল্যাহ
মত-মতান্তর
৩ মাস আগে
২১ এপ্রিল (মঙ্গলবার), ২০২৬, ১০ঃ১২ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
