ক্ষমতা হস্তান্তরের ঠিক আগমুহূর্তে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতর থেকে যারা নিঃশব্দে বেরিয়ে যেতে চান, ইতিহাসে তারা কখনোই নির্দোষ হিসেবে স্মরণীয় হন না। অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়লগ্নে সেই পুরোনো, অস্বস্তিকর এবং বিপজ্জনক সংস্কৃতিই যেন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে—নাম তার ‘সেফ এক্সিট’। ক্ষমতার শেষ রাতে জবাবদিহির পলায়ন।
এই বাস্তবতা নগ্নভাবে সামনে এসেছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার আইসিটি ও টেলিযোগাযোগ বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে। ক্ষমতা ছাড়ার আগেই, অভিযোগের মেঘ মাথায় নিয়ে, প্রশাসনিক দায়িত্বের শেষ সীমায় দাঁড়িয়ে তার বিদেশযাত্রা নিছক ব্যক্তিগত ভ্রমণ নয়—এটি রাষ্ট্রের জবাবদিহির কাঠামোর ওপর এক সরাসরি প্রশ্নচিহ্ন।
শনিবার রাত। ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। একটি এমিরেটস ফ্লাইটে দুবাইয়ের উদ্দেশে যাত্রা। কাগজে-কলমে সবই বৈধ। কিন্তু রাজনীতি ও রাষ্ট্র কখনো শুধু কাগজে চলে না—চলে জনআস্থা, নৈতিকতা ও সময়ের ভাষায়।
যখন একটি অন্তর্বর্তী সরকার মাত্র ২৪–৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তুতিতে, তখন সেই সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী মর্যাদাপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারীর হঠাৎ ‘স্বাভাবিক জীবনে ফেরা’ কাকতালীয় হতে পারে না। বিশেষ করে যখন তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান চলমান থাকার অভিযোগ জনপরিসরে প্রতিষ্ঠিত।
প্রশ্ন একটাই—এই বিদায় কি সত্যিই স্বাভাবিক, নাকি এটি আগাম সতর্ক পলায়ন?
বিমানবন্দর সূত্রে জানা যায়, ব্যক্তিগত নেদারল্যান্ডস পাসপোর্ট ব্যবহার করে দেশত্যাগের সময় প্রাথমিকভাবে তার কাছে সরকারি আদেশ (জিও) ছিল না। পরে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে সফট কপি জিও দেখিয়ে ইমিগ্রেশন পার হন।
আইন হয়তো লঙ্ঘিত হয়নি। কিন্তু রাষ্ট্র কি শুধু আইনের ন্যূনতম সীমা মেনে চলে? নাকি রাষ্ট্র পরিচালিত হয় নৈতিক মানদণ্ডে? ক্ষমতার শেষ রাতে সফট কপি জিও দেখিয়ে দেশ ছাড়ার দৃশ্য কোনো উন্নত রাষ্ট্রে হলে সেটি তদন্তের কারণ হতো। আমাদের এখানে সেটিই হয়ে যাচ্ছে ‘স্বাভাবিক প্রক্রিয়া’।
টেকনোক্র্যাট নামের অলিখিত দায়মুক্তি: বাংলাদেশে ‘টেকনোক্র্যাট’ শব্দটি দীর্ঘদিন ধরে একধরনের অলিখিত দায়মুক্তির লাইসেন্স। রাজনৈতিক পরিচয় নেই, বিদেশি পাসপোর্ট আছে, আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক আছে—এই তিনটি থাকলেই যেন প্রশ্ন করা যায় না। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—ক্ষমতার চরিত্র বদলালেই কি দায়িত্ব বদলে যায়? রাষ্ট্রের টাকা কি টেকনোক্র্যাটদের হাতে পড়লে জনগণের সম্পদ থাকে না?
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রমাণিত হোক বা না হোক—ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত থেকে অভিযোগের নিষ্পত্তির আগেই দেশত্যাগ জনগণের আস্থার সঙ্গে প্রতারণা।
‘সেফ এক্সিট’ বনাম জনগণের হিসাব—এই বাস্তবতাতেই জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্য রাজনৈতিক বক্তব্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন—অনেক উপদেষ্টা সেফ এক্সিট নেওয়ার চিন্তা করছেন, কিন্তু তার আগে জনগণের সামনে সম্পদের হিসাব দিন, কাজের সালতামামি দিন। এটা কোনো প্রতিহিংসা নয়। এটা রাষ্ট্রের ন্যূনতম দাবি।
কারণ যারা সংস্কারের কথা বলেন, তাদেরই আগে জবাবদিহির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্যে ড. মুহাম্মদ ইউনূস–এর প্রতিও কঠোর সমালোচনা উঠে আসে। প্রশ্নটা স্পষ্ট—এই অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে কি একটি অলিখিত ‘সুরক্ষা বলয়’ তৈরি হয়েছিল, যেখানে কিছু উপদেষ্টা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে?
অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ ছিল একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ তৈরি করা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে যদি সেই সরকারই প্রশ্নবিদ্ধ বিদায়ের নীরব দর্শক হয়, তাহলে তার নিরপেক্ষতার দাবি দুর্বল হয়ে পড়ে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো—ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত থেকে কেউ যদি মনে করেন, সময় শেষ হলেই সব শেষ। তদন্ত, অডিট, হিসাব—সবই যেন ক্ষমতার মেয়াদেই সীমাবদ্ধ। এটা হলে রাষ্ট্র নয়, ব্যক্তিই বড় হয়ে যায়।
অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকার নাইন সায়ের এর আহ্বান তাই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। ক্ষমতা হস্তান্তরের এই সংবেদনশীল সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তিই যেন যথাযথ অডিট ছাড়পত্র ছাড়া দেশত্যাগ করতে না পারে—এটা কোনো রাজনৈতিক দাবি নয়, এটি রাষ্ট্রের আত্মরক্ষামূলক প্রয়োজন।ইমিগ্রেশন কাউন্টার কেবল পাসপোর্ট দেখার জায়গা নয়; এটি রাষ্ট্রের শেষ প্রহরা। সেই প্রহরা যদি শুধু কাগজ দেখে চোখ বুজে দেয়, তবে ভবিষ্যতে দুর্নীতির সবচেয়ে নিরাপদ পথ হয়ে উঠবে এই ‘শেষ দরজা’।
নতুন সংসদ শপথ নিতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে—এ এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—সরকার বদলালেই কি ‘সেফ এক্সিট’ সংস্কৃতি বদলাবে? যদি অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায় এই বার্তা দিয়ে যায় যে, ক্ষমতার শেষ রাতে হিসাব ছাড়াই দেশ ছাড়া যায়, তবে আগামী দিনে সেই পথ আরও প্রশস্ত হবে।
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের দেশত্যাগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি লক্ষণ। একটি প্রবণতা। ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত থেকে শেষ মুহূর্তে নিজেকে নিরাপদ করার প্রবণতা। বাংলাদেশ এখন শুধু নতুন সরকার নয়, নতুন নৈতিক মানদণ্ড চায়। সেই মানদণ্ডের প্রথম শর্ত—ক্ষমতায় আসার যেমন নিয়ম থাকবে, ক্ষমতা ছাড়ারও তেমনি কঠোর নিয়ম থাকবে।
বিদায় মানে পলায়ন নয়। বিদায় মানে হিসাব দেওয়া। এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েই অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যায় শেষ হওয়া উচিত—নইলে ইতিহাস তাদের মনে রাখবে ‘সেতু সরকার’ হিসেবে নয়, বরং ‘সেফ এক্সিটের নীরব সহযাত্রী’ হিসেবে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]
টেকনোক্র্যাটদের ‘সেফ এক্সিট’: ক্ষমতার শেষ রাতে জবাবদিহির পলায়ন
নিয়াজ মাহমুদ
মত-মতান্তর
৪ মাস আগে
১৫ ফেব্রুয়ারি (রবিবার), ২০২৬, ১১ঃ৫৮ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%

জনতা
৪ মাস আগেঅনেক উপদেষ্টা, সাবেক উপদেষ্টাও দেশত্যাগ করতে পারে, বিমান বন্দরে পাহারা বসাতে হবে।