বিশ্ব দরবারে উন্নত, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও শান্তিপ্রিয় দেশ হিসেবে পরিচিত জাপান সাম্প্রতিক সময়ে অভিবাসী ইস্যুকে কেন্দ্র করে নতুন এক সামাজিক টানাপোড়েনে পড়েছে। বিশেষ করে বিদেশি ও ধর্মীয় স্বাধীনতা ঘিরে বিভিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশটির জনমত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
বর্তমান ক্ষমতাসীন জোট সরকার, যার নেতৃত্বে রয়েছেন সানায়ে তাকাইচি, ক্ষমতায় আসার পর অভিবাসন নীতিতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যে ভিসা নবায়ন ফি বৃদ্ধিসহ কয়েকটি সিদ্ধান্তকে অভিবাসী-বান্ধব নয় বলে সমালোচনা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ধর্মীয় দিক থেকে জাপান ঐতিহ্যগতভাবে শিনতো ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেও বাস্তবে দেশটি ধর্মীয় সহনশীলতার জন্য পরিচিত। ফলে মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা দীর্ঘদিন ধরে নির্বিঘ্নে তাদের ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন।
জাপানে বসবাসরত অভিবাসীদের একটি বড় অংশ মুসলিম। স্বাভাবিকভাবেই তারা ধর্মচর্চার জন্য মসজিদ নির্মাণ করে থাকেন। বর্তমানে দেশজুড়ে প্রায় ৩০০টির মতো মসজিদ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে জুমার নামাজ ও ঈদের সময় অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে অনেক ক্ষেত্রে মসজিদের বাইরে, ভাড়া করা হল কিংবা খোলা স্থান—এমনকি পার্ক বা সড়ক ব্যবহার করে নামাজ আদায়ের আয়োজন করতে হচ্ছে। এই বিষয়টি স্থানীয় কিছু জাপানি নাগরিকের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ফুজিসাওয়া স্টেশন এলাকায় একটি মসজিদ নির্মাণের বিরোধিতা করে কট্টরপন্থী কিছু জাপানি গোষ্ঠী পুলিশের অনুমতি নিয়ে সপ্তাহব্যাপী বিক্ষোভ ও র্যালি করেছে। অন্যদিকে, বিদেশিদের প্রতি বিদ্বেষমূলক আচরণের প্রতিবাদে অনেক জাপানি নাগরিক পাল্টা অবস্থান নেন। তারা প্ল্যাকার্ড হাতে ‘বিদেশিদের সঙ্গে বৈষম্য নয়’, ‘মসজিদ নির্মাণ তাদের অধিকার’, ‘জাপানি হিসেবে আমরা লজ্জিত’—এমন স্লোগান তুলে প্রতিবাদ জানান।
এদিকে, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে এবেৎসু মসজিদ-এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যাতে প্রায় ১৩৮ বর্গমিটারের ভবনটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘটনার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুসলিম ও পাকিস্তানি বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে অবৈধ নির্মাণ সংক্রান্ত ভুয়া তথ্য ছড়ানো হচ্ছিল। তবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অধিকাংশ অবৈধ স্থাপনা জাপানি নাগরিকদের দ্বারাই নির্মিত, বিদেশিদের দ্বারা নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলা অনলাইন অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য এই ধরনের সহিংস ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। একই ধরনের ইসলামবিরোধী বিক্ষোভ দেশের বাণিজ্যিক কেন্দ্র ওসাকা শহরেও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সব মিলিয়ে, অভিবাসন ও ধর্মীয় সহাবস্থান নিয়ে জাপানে একটি স্পর্শকাতর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সহনশীলতা ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য পরিচিত দেশটিতে এ ধরনের বিভাজন ভবিষ্যতে কী প্রভাব ফেলবে, তা এখন দেখার বিষয়।
ই-মেইল:[email protected]
