বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে, তখন দেশের বিমান খাতকেও সেই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা একটি জাতীয় অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি জার্মানির বিখ্যাত কোম্পানি অ্যারোডাটা বাংলাদেশে এয়ারপোর্ট ক্যালিব্রেশন সেবা প্রদানে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ। কিন্তু শুধু একটি বিদেশি কোম্পানির সেবা গ্রহণই যথেষ্ট নয়, বরং বিমান খাতের সামগ্রিক রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন একটি সুচিন্তিত, দীর্ঘমেয়াদি এবং বহুমাত্রিক কর্মপরিকল্পনা।
বিমান খাতের উন্নয়নের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো শক্তিশালী অবকাঠামো। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ একটি সাহসী পদক্ষেপ, তবে এটি কেবল শুরু। দেশের অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যেমন চট্টগ্রামের শাহ আমানত এবং সিলেটের ওসমানী বিমানবন্দরকেও আধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত করতে হবে। রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে, নেভিগেশন সিস্টেম এবং এয়ার ট্র্যাফিক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থার আমূল সংস্কার ছাড়া বিশ্বমানের সেবা প্রদান সম্ভব নয়। এয়ারপোর্ট ক্যালিব্রেশন ঠিক এখানেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, কারণ নেভিগেশন এইডগুলোর নিখুঁত ক্যালিব্রেশন নিরাপদ বিমান পরিচালনার পূর্বশর্ত। অ্যারোডাটার মতো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করলে আইসিএও-র নির্ধারিত মান অনুযায়ী এই সেবা নিশ্চিত করা সহজতর হবে।
যেকোনো খাতের টেকসই উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলো দক্ষ জনবল। বাংলাদেশের বিমান খাতে পাইলট, এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোলার, এভিয়েশন ইঞ্জিনিয়ার এবং কারিগরি বিশেষজ্ঞের ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ তথা বেবিচক এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে। জার্মানি, সিঙ্গাপুর বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশের শীর্ষস্থানীয় এভিয়েশন একাডেমিগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে বৃত্তি ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। পাশাপাশি দেশেই একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক মানের এভিয়েশন ট্রেনিং ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর বিমান খাতের সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো শক্তিশালী ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থার অস্তিত্ব। বাংলাদেশের বেবিচককে আরও স্বায়ত্তশাসিত, দক্ষ এবং প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তুলতে হবে। আইসিএও এবং আইএটিএ-র নির্দেশিকা অনুসরণ করে নিরাপত্তা বিধিমালা হালনাগাদ করতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞামুক্ত থাকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের এফএএ ক্যাটাগরি-১ মর্যাদা অর্জন বাংলাদেশের বিমান চলাচলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যমাত্রা। এই মর্যাদা অর্জিত হলে আন্তর্জাতিক রুটে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং বিদেশি বিমান সংস্থাগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগে আরও আগ্রহী হবে।
জাতীয় বিমান সংস্থা হিসেবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা দেশের সামগ্রিক এভিয়েশন উন্নয়নের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। দীর্ঘদিন ধরে লোকসান, অব্যবস্থাপনা এবং পুরনো বহরের কারণে বিমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পিছিয়ে পড়েছে। আধুনিক ও জ্বালানিসাশ্রয়ী উড়োজাহাজ সংযোজন, যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন, ডিজিটাল বুকিং ও চেক-ইন সিস্টেম আধুনিকায়ন এবং কর্পোরেট গভর্ন্যান্স সংস্কারের মাধ্যমে বিমানকে একটি লাভজনক ও প্রতিযোগিতামূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা সম্ভব। এমিরেটস বা সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স রাষ্ট্রীয় মালিকানায় থেকেও বিশ্বসেরা হয়েছে, বাংলাদেশের সেই স্বপ্ন দেখার অধিকার রয়েছে।
বিমান ভ্রমণে যাত্রীর সামগ্রিক অভিজ্ঞতায় ক্যাটারিং সেবা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আন্তর্জাতিক মানের বিমান সংস্থাগুলো এটি ভালোভাবেই বোঝে, তাই তারা খাবারের মান, উপস্থাপনা এবং বৈচিত্র্যের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ক্যাটারিং সেবা দীর্ঘদিন ধরে যাত্রীদের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে। খাবারের গুণমান, পরিবেশন পদ্ধতি এবং মেনুর বৈচিত্র্যের অভাব প্রায়ই যাত্রীদের হতাশ করে, যা বিমানের সামগ্রিক ভাবমূর্তিকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিমান সংস্থাগুলো যেমন সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স বা কাতার এয়ারওয়েজ তাদের ক্যাটারিং সেবাকে একটি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হিসেবে ব্যবহার করে। বাংলাদেশেরও সেই সুযোগ রয়েছে, কারণ বাংলাদেশি রন্ধনশৈলী বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। দেশীয় ঐতিহ্যবাহী খাবারকে আন্তর্জাতিক উপস্থাপনার সঙ্গে মিলিয়ে একটি স্বতন্ত্র ও আকর্ষণীয় ইন-ফ্লাইট মেনু তৈরি করা সম্ভব, যা একই সঙ্গে দেশের সংস্কৃতিকেও বিশ্বের দরবারে তুলে ধরবে। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মানের ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্ব স্থাপন করা যেতে পারে। পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে আইএসও-সার্টিফাইড রান্নাঘর ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। ইকোনমি, বিজনেস ও ফার্স্ট ক্লাসের যাত্রীদের জন্য আলাদা ও মানসম্পন্ন মেনু পরিকল্পনা, ধর্মীয় ও স্বাস্থ্যগত বিবেচনায় হালাল, ভেজিটেরিয়ান এবং ডায়াবেটিক মিলের সুব্যবস্থা রাখা এবং তাজা ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত উপকরণ ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। বিমানবন্দরের লাউঞ্জ ও ট্রানজিট এলাকার খাদ্যসেবার মানও একই সঙ্গে উন্নত করতে হবে, কারণ একজন যাত্রীর অভিজ্ঞতা বিমানে ওঠার আগেই শুরু হয়। ক্যাটারিং সেবার উন্নয়ন শুধু যাত্রীসন্তুষ্টির বিষয় নয়, এটি একটি বাণিজ্যিক কৌশলও বটে। উন্নত ক্যাটারিং সেবা যাত্রীদের বারবার বিমান বাংলাদেশ বেছে নিতে অনুপ্রাণিত করবে এবং মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া ইতিবাচক প্রচারণা কোনো বিজ্ঞাপনের চেয়ে কম কার্যকর নয়।
বিমান খাতের দ্রুত উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব অপরিহার্য। জার্মানির অ্যারোডাটার সঙ্গে ক্যালিব্রেশন সেবার আলোচনা এই পথেই একটি সুচিন্তিত পদক্ষেপ। তবে এই ধরনের সহযোগিতাকে শুধু সেবা গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ হিসেবেও কাজে লাগাতে হবে। বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হবে, পাশাপাশি বেসরকারি দেশীয় বিমান সংস্থাগুলোর জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কার্গো এভিয়েশন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে দেশের রপ্তানি শিল্পও সরাসরি উপকৃত হবে।
একবিংশ শতাব্দীর বিমান চলাচল শুধু গতি ও সংযোগের বিষয় নয়, এটি এখন প্রযুক্তি ও পরিবেশের মেলবন্ধনের বিষয়ও। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা এবং অটোমেশনের মাধ্যমে বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা, যাত্রী নিরাপত্তা এবং ফ্লাইট পরিচালনাকে আরও দক্ষ করে তোলা যায়। একই সঙ্গে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করার আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা মেনে চলার জন্য বাংলাদেশকেও সবুজ এভিয়েশন নীতিমালা প্রণয়নে সক্রিয় হতে হবে। সোলার এনার্জিচালিত বিমানবন্দর অবকাঠামো এবং টেকসই বিমান জ্বালানি ব্যবহারে গবেষণা ও বিনিয়োগ শুরু করার এখনই উপযুক্ত সময়।
বাংলাদেশের বিমান খাতের বিকাশ কেবল ঢাকাকেন্দ্রিক হলে চলবে না। দেশের অভ্যন্তরীণ রুটগুলো সম্প্রসারিত করে কক্সবাজার, সুন্দরবন, সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো পর্যটন গন্তব্যগুলোর সঙ্গে উন্নত বিমান সংযোগ স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক হাব হিসেবে ঢাকার অবস্থান সুদৃঢ় করার সুযোগ রয়েছে। ভারত, মিয়ানমার, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে আঞ্চলিক বিমান চুক্তি জোরদার করা হলে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে, যা দেশের অর্থনীতিতে বিশাল ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশের বিমান খাতের সামনে সম্ভাবনার দরজা উন্মুক্ত। অ্যারোডাটার মতো বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতার আগ্রহ প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সরকার, বেসরকারি খাত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া কোনো পরিকল্পনাই ফলপ্রসূ হবে না। স্বপ্নটা বড়, পথটা কঠিন, কিন্তু একটি উদীয়মান বাংলাদেশের জন্য এই যাত্রা অনিবার্য এবং অপরিহার্য।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ই-মেইল: [email protected]

Andalib
৩ মাস আগেএসব পরামর্শ অর্থহীন। আমাদের চরিত্র পচে গেছে। আমরা যদি আজকেও শুরু করি, কয়েক যুগ লাগবে আমাদের সঠিক পথে আসতে। এদেশের মানুষ ঘুষ নেয়া
ও দেয়াকে কোন অপরাধই মনে করে না। সাদা দাড়ি, মাথায় টুপি, হিজাবওয়ালি, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজীরা দেদারসে ঘুষ খাচ্ছে, সম্পদের পাহাড় গড়ছে। অনর্গল মিথ্যা বলে যাচ্ছে, একজন আরেকজনকে ঠেকাচ্ছে। কারো মধ্যে সামান্যতম মূল্যবোধ নেই।
এই দেশ ঠিক করা অনেক কঠিন। স্বপ্ন দেখা যায় কিন্তু সেটা বাস্তবতার সাথে যায় না।