বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল কেবল একটি ক্ষমতার পালাবদলের সংবাদ নয়; এটি দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির দীর্ঘদিনের স্থবিরতায় এক সম্ভাব্য ভাঙনরেখা। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে, আর প্রধান বিরোধী দল হিসেবে উঠে এসেছে জামায়াতে ইসলামী। এই বাস্তবতা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ভারসাম্য যেমন বদলাবে, তেমনি আঞ্চলিক কূটনীতির হিসাব-নিকাশও নতুন করে লিখতে বাধ্য করবে।
নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সহ সার্কভুক্ত দেশগুলোর সরকারপ্রধানদের আমন্ত্রণ জানানোর সম্ভাব্য খবরে কূটনৈতিক অঙ্গনে ইতোমধ্যে নড়াচড়া শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর হয়ে থাকা সার্ক কি তবে ঢাকার শপথের মঞ্চেই নতুন প্রাণ পাবে? প্রশ্নটি যতটা কৌতূহলোদ্দীপক, ততটাই রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
দক্ষিণ এশিয়ায় গত এক দশকে দ্বিপাক্ষিকতা বহুপাক্ষিকতার জায়গা দখল করেছে। ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা সার্ককে কার্যত অচল করে রেখেছে। এই প্রেক্ষাপটে ঢাকায় একই মঞ্চে নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদের নেতৃত্বের উপস্থিতি যদি তা ঘটে হবে প্রতীকী হলেও শক্ত বার্তা বহনকারী। বার্তাটি হলো: আঞ্চলিক সহযোগিতা আবার আলোচনার টেবিলে ফিরতে পারে, যদি মধ্যস্থতার জন্য বিশ্বাসযোগ্য একটি কেন্দ্র থাকে। বাংলাদেশ সেই কেন্দ্র হতে চায় এমন ইঙ্গিতই মিলছে।
এই রাজনৈতিক অধ্যায়ের কেন্দ্রীয় চরিত্র বাংলাদেশের ভাবী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দীর্ঘদিন প্রবাসে থেকে রাজনীতি পরিচালনার অভিজ্ঞতা তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিসরে ভাবনার সুযোগ দিয়েছে বলেই অনেকের ধারণা। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি যে শুধু ক্ষমতায় ফিরছে, তা নয়; তারা ফিরছে এক ভিন্ন কৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে। দক্ষিণ এশিয়ায় ‘ব্যালান্সিং অ্যাক্টর’ হওয়ার চেষ্টা বাংলাদেশ আগে কখনো করেনি এবার সেই সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
অবশ্য চ্যালেঞ্জ কম নয়। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক মানেই কেবল বাণিজ্য বা সীমান্ত নয়; এখানে জড়িয়ে আছে নিরাপত্তা, পানি বণ্টন, আঞ্চলিক প্রভাবের প্রশ্ন। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক আবার অতীতের স্মৃতি ও বর্তমান বাস্তবতার মিশেলে সংবেদনশীল। আর চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিকে আরও জটিল করেছে। এই জটিল সমীকরণে বাংলাদেশকে হাঁটতে হবে সূক্ষ্ণ কূটনৈতিক ভারসাম্যের ওপর।
দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নতুন বাস্তবতা তৈরি হবে। শক্তিশালী সরকার ও সংগঠিত বিরোধী দল এই দ্বৈত উপস্থিতি সংসদকে কার্যকর করার সুযোগ এনে দিতে পারে, যদি রাজনৈতিক সহনশীলতা বজায় থাকে। গণতন্ত্রের এই অভ্যন্তরীণ শক্তি আঞ্চলিক পরিসরেও বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াবে। কারণ, স্থিতিশীলতা ছাড়া নেতৃত্ব আসে না।
শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান তাই নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি হতে পারে এক কূটনৈতিক মঞ্চ। সেখানে উপস্থিতি, অনুপস্থিতি সবকিছুই বার্তা দেবে। যদি ঢাকায় দক্ষিণ এশিয়ার নেতারা একত্র হন, তবে সেটি হবে স্থবির অঞ্চলে নতুন সংলাপের সূচনা। আর যদি সেই সংলাপ থেকে সার্কের পুনর্জাগরণের ইঙ্গিত মেলে, তবে বাংলাদেশের নতুন সরকার ইতিহাসের পাতায় আলাদা জায়গা করে নেবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই: বাংলাদেশ কি কেবল পরিবর্তনের সাক্ষী হবে, নাকি পরিবর্তনের চালিকাশক্তি? শপথের মঞ্চই হয়তো সেই প্রশ্নের প্রথম উত্তর দেবে।
⸻
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ইমেইল: [email protected]
শপথের মঞ্চে সার্কের পুনর্জাগরণ, ঢাকায় দক্ষিণ এশিয়ার নতুন মানচিত্র
সহিদুল আলম স্বপন
মত-মতান্তর
৪ মাস আগে
১৫ ফেব্রুয়ারি (রবিবার), ২০২৬, ১১ঃ৩১ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%

mamun
৪ মাস আগেNew SAARC should include Afghanistan and exclude India. And only then all the SAARC countries will be benefited.