আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নজরদারির অভাবে তৈরি পোশাকের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না বাংলাদেশ। এমন সংকটের তথ্য দিয়ে সম্মিলিত পাঁচ ব্যাংকে উদ্যোক্তাদের আটকে থাকা অর্থ দ্রুত ছাড় চান রপ্তানিকারকরা।
শনিবার ঢাকায় ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) কর্তৃক আয়োজিত ‘অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আর্থিক সক্ষমতা ও সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা’ শর্ষিক সেমিনারে এই দাবি জানান বিকেএমইএ সভাপতি মো. হাতেম এবং বিজিএমইএয়ের সভাপতি মাহমুদ হাসান খান।
ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অথিতি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল তিতুমীর।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এবং বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। সেমিনারে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ইআরএফের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাসেম।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আগ্রাসী শুল্ক নীতি আর যুদ্ধাবস্থা ঘিরে বিশ্ববাজারে কমতে থাকা চাহিদা আর তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে দাম কমছে তৈরি পোশাকের। সবশেষ জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রায় আড়াই আর ইউরোপে বছর ব্যবধানে পোশাকের দাম কমেছে প্রায় সাড়ে তিন শতাংশ। উদ্যোক্তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নজরদারির অভাবে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
বিকেএমইএয়ের সভাপতি মো. হাতেম বলেন, আন্তর্জাতিক তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলোর নজরদারির অভাবে ক্রেতাদের কাছ থেকে তৈরি পোশাকের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না বাংলাদেশ। কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে। আইএমএফকে ইংগিত করে তিনি বলেন, তারা আমাদের বিভিন্ন শর্ত দেয়। কিন্তু আমরা তৈরি পেশাকের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছি না, সেটা নিয়ে তারা কথা বলেন না।
সেমিনারে বিজিএমইএয়ের সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, রপ্তানি বাজারে সংকটময় অবস্থাতেই মার্জ করা সম্মিলিত ৫ ব্যাংকে টাকা আটকে আছে উদ্যোক্তাদের, যা থমকে দিচ্ছে বিনিয়োগ। ডিজেল ও গ্যাসের বিপরীতে শতভাগ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে শিল্প চালানো সম্ভব নয়; এ নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বিনিয়োগ বাড়বে না বলেও জানান বিজিএমইএ সভাপতি।
অনুষ্ঠানে ঋণ নির্ভরতা কমানোর তাগিদ দিয়ে সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজ বলেন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন জরুরি। তা না হলে বিনিয়োগ বাড়বে না। এ ছাড়া অর্থনীতি ভালো থাকলে রাজনীতি ভালো থাকে। তাই অর্থনীতিকে ভালো রাখার পথ মসৃন রাখার জন্য সরকারকে আহ্বান জানান তিনি।
জ্বালানি ঘাটতি কাটাতে মজুত বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, জ্বালানিখাতে পর্যাপ্ত মজুত পায়নি বিএনপি সরকার। এখাতে পর্যাপ্ত মজুত থাকার দরকার ছিল, কিন্তু এ সরকার এসে সেটা পায়নি তাই সংকট উত্তরণে স্বল্পমেয়াদী ও দীঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এজন্য কৌশলগত মজুদ গড়ে তোলা, নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ফিসকাল সাপোর্ট, রেগুলেটরি তদারকি ও প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ অতীতে বহু সংকট মোকাবিলা করে অগ্রগতি অর্জন করেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থা, দুর্ভিক্ষ কিংবা বৈশ্বিক তেলের মূল্যবৃদ্ধির মতো চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও দেশ নিজস্ব বাস্তবতার ভিত্তিতে পথ খুঁজে নিয়েছে। এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের সংস্কার ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা বলেন, অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই বাংলাদেশকে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য বাণিজ্য চুক্তিগুলোর পুনরায় যাচাই-বাছাই করা হবে বলেও জানান উপদেষ্টা।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বিএনপি’র নির্বাচনী ইশতেহারে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে: ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গঠন, বিনিয়োগ-উৎপাদন-কর্মসংস্থানভিত্তিক নতুন অর্থনৈতিক মডেল প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ সামাজিক খাতে সরকারি ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা। পাশাপাশি ‘সবার জন্য অর্থনীতি’ নিশ্চিত করে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নের কথাও বলা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নে মানুষের সৃজনশীলতা ও স্থিতিস্থাপকতাই সবচেয়ে বড় সম্পদ। কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও ক্ষুদ্র উদ্যোগে এর প্রতিফলন ইতিমধ্যে দেখা গেছে। একইভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে ব্যক্তিখাতের উদ্যোগ ও প্রণোদনা কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।
তিনি বলেন, দেশের টেকসই অগ্রগতির জন্য কেবল সরকারের প্রণোদনার দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না, ব্যক্তিখাতকেও বড় ভূমিকা রাখতে হবে।
উপদেষ্টা বলেন, দেশীয় বিনিয়োগ ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ সম্ভব নয়। তাই অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং অঞ্চলভিত্তিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। এছাড়া রপ্তানি বহুমুখীকরণে ওষুধ, চামড়া ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের সক্ষমতা বাড়াতে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার দক্ষতা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, টেকসই সংস্কারের জন্য শুধু আইন নয়, সামাজিক সম্প্রীতি, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিভাজনের পরিবর্তে অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নই দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে। বাস্তবভিত্তিক নীতি গ্রহণ করা গেলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই অর্থনীতিতে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, আমরা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ। তাই সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে হবে। সে কারণে আমরা কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদ মওকুফ করেছি, দারিদ্র্য নিরসনে ফ্যামিলি কার্ড চালু করেছি, কৃষক কার্ড চালু করেছি এবং এটা প্রধানমন্ত্রী প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে করার অনুমতি দিয়েছেন।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর আরও বলেন, বর্তমান সময়ে প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতা, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের সংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তার মতে, এ পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হয়ে প্রস্তুতি গ্রহণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পাঁচ ব্যাংকে উদ্যোক্তাদের আটকে থাকা অর্থ দ্রুত ছাড় চান রপ্তানিকারকরা
অর্থনৈতিক রিপোর্টার
অর্থ বাণিজ্য
৩ মাস আগে
১৯ এপ্রিল (রবিবার), ২০২৬, ৬ঃ১১ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
