ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেখানে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করছে সেখানে জেলার ৫টি সংসদীয় আসনে ধানের শীষের প্রার্থীরা বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। এসব আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীদের জয়জয়কার। ফলে জেলার ৫টি সংসদীয় আসনে নির্বাচনী ফলাফলে বিএনপি শিবিরে চরম হতাশা নেমে এসেছে। ফলে নির্বাচন পরবর্তী সময়ে চলছে ফল বিপর্যয়ের কারণ এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনকে সামনে রেখে উত্তরণের উপায় খোঁজার কাজ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপি’র অভ্যন্তরীণ কোন্দল, দলীয় মনোনয়নে তৃণমূলের মতামতকে উপেক্ষা, বার বার প্রার্থী পরিবর্তন, প্রতিপক্ষের কালোটাকা, স্থানীয় একাধিক বড় এনজিওকে সরাসরি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে অর্থ ও কর্মী লগ্নি, ধর্মীয় অপপ্রচার এবং এন্ট্রি বিএনপি ভোটারদের কেন্দ্রে উপস্থিতিসহ একাধিক কারণে যশোরে বিএনপি’র ভরাডুবি ঘটেছে বলে মনে করছেন মাঠের নেতারা। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে মানবজমিনের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এসব তথ্য। যশোরের বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়নের তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যশোরের যে ৫টি আসনে বিএনপি’র ভরাডুবি হয়েছে সেগুলোতে বিএনপি’র একক ভোটের সংখ্যা জামায়াতের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণের বেশি। তারপরও নির্বাচনী ফলাফলে এসব আসনে কেন ধানের শীষের পরাজয় ঘটলোÑ এমন প্রশ্নের উত্তরে চৌগাছা উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক হাসান মাসুদ বলেন, প্রার্থী মনোনয়নে দল বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে পারেনি। এসব আসনে শেষ পর্যন্ত যাদের হাতে ধানের শীষ প্রতীক তুলে দেয়া হয়েছিল তাদের সঙ্গে দলের তৃণমূলের সম্পর্ক তেমন ভালো ছিল না। এ ছাড়া মনোনয়ন বঞ্চিত নেতাদের ও দলের প্রবীণ এবং ত্যাগী নেতাদের ভোটের মাঠে সক্রিয় করতে না পারায় এই বিপর্যয়ের মূল কারণ বলছেন শার্শার উলসী বাজারের প্রবীণ ব্যবসায়ী ইদ্রিস আলী। নাভারণ বাজারের স্কুল শিক্ষক আতিয়ার রহমান মনে করেন, ৩৬ জুলাই পরবর্তী যশোরে বিএনপি নেতাদের অতিশয় আওয়ামী প্রীতি নতুন প্রজন্মের ভোটারদের হতাশ করেছে। এ ছাড়া নিকট অতীতে দলের কতিপয় নেতাকর্মীর কর্মকাণ্ডেও সাধারণ মানুষ বিএনপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এ ছাড়া ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও রিজার্ভ ভোটারদের ফ্যাসিলেটেড করে ভোটের মাঠে সক্রিয় করে তুলে তাদের বুকে ধানের শীষের লোগো লাগিয়ে দেয়াকে দলের দুর্দিনের নেতাকর্মীরা ভালোভাবে নিতে পারেননি। যে কারণে ভোটকেন্দ্রগুলোতে বুকে ধানের শীষের প্রতীক লাগানো নেতাকর্মী ও ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেলেও দিন শেষে সে সব ভোট গেছে দাঁড়িপাল্লায়। এর পেছনে জামায়াত নেতাদের বিনিয়োগকৃত অর্থ বড় ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে করছেন জেলা বিএনপি’র শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। এ বিষয়ে জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, যশোরের ৫টি আসনে ধানের শীষ প্রতীকের পরাজয়ের মূল কারণ হচ্ছে প্রতিপক্ষ প্রার্থীদের অঢেল কালোটাকার ছড়াছড়ি। এ ছাড়া আসনভিত্তিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা কাজ করেছে। সর্বোপরি স্থানীয় একাধিক এনজিও প্রতিষ্ঠান তাদের পছন্দের প্রার্থীকে জেতাতে প্রচুর টাকা ও কর্মীদের কাজে লাগিয়েছেন।
এ ছাড়া দলীয় মিথ্যা প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে বিশেষ করে নারী ভোটারদের মোটিভেটেড করতে সক্ষম হয়েছে জামায়াতের নারী কর্মীরা।
অপরদিকে এই বিজয়কে কাঙ্ক্ষিত বলছেন জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক গোলাম কুদ্দুস। তিনি বলেন, যশোরে সকল নির্বাচনী আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীদের পক্ষে সাধারণ জনগণের বিপুল সমর্থন ছিল। ’২৪-এর জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন দুর্নীতি ও শোষণমুক্ত মানবিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার জামায়াতকে সাধারণ মানুষ ও জেন-জিকে বেশি আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে। এ ছাড়া প্রার্থীরা ব্যক্তিগত ক্লিন ইমেজ, দুর্নীতিমুক্ত, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণ সাধারণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এ ছাড়া দলের অভ্যন্তরে কোনো কোন্দল নেই। যার কারণে এবারের নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থীগণ যশোরে প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যশোর-১ (শার্শা) আসনে মনোনয়ন নাটকে দলের বিপর্যয় ঘটেছে। এই আসনে প্রথমে সাবেক এমপি মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে মনোনয়ন দেয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে তৃপ্তিকে বাদ দিয়ে নতুন মুখ নুরুজ্জামান লিটনকে প্রার্থী করায় তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মেনে নিতে পারেননি।
যশোর-২ আসনেও প্রার্থী সিলেকশন ঠিক ছিল না বলে মনে করছেন উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সামাদ নিপুণ। এই আসনে বিএনপি’র ৫ জন মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। দলীয় ভাবে আওয়ামী জামানায় সুবিধাভোগী সাবিরা সুলতানা মুন্নিকে মনোনয়ন দেয় দলের হাইকমান্ড। যা নিয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। আর এই সুযোগটি কাজে লাগিয়েছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তার কর্মী সমর্থকরা।
যশোর-৪ আসনেও মনোনয়ন নাটকের কারণে দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ শেষ পর্যন্ত চরমে পৌঁছায়। এই আসনে প্রথম পর্যায়ে মনোনয়ন দেয়া হয় তৃণমূল বিএনপি’র অন্তঃপ্রাণ প্রকৌশলী টিএস আইয়ুবকে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তাকে বাদ দিয়ে দলের হাইকমান্ড অনভিজ্ঞ ফারাজী মতিয়ার রহমানকে ধানের শীষের মনোনয়ন দেন। এতে করে মাঠের নেতাকর্মীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। যা নির্বাচনে ব্যাপক প্রভাব পড়ে।
একই অবস্থা যশোর-৫ মণিরামপুর আসনেও। এই আসনে ধানের শীষের পরাজয়ের জন্য দলের সিদ্ধান্তকে দুষছেন নেতাকর্মীরা। এই আসনে প্রথমে উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি প্রবীণ রাজনীতিক এড. শহীদ ইকবালকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। শহীদ ইকবালকে ঘিরে তৃণমূলে ব্যাপক গণজোয়ার সৃষ্টি হয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে জোটের স্বার্থে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সহকারী মহাসচিব মুফতি আব্দুর রশিদ বিন ওয়াক্কাসকে ধানের শীষের প্রার্থী করায় উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি শহীদ ইকবাল নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে দাঁড়িয়ে যান। এই দুই প্রার্থীর বিপরীতে ভোটের রশি টানাটানিতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী এড. গাজী এনামুল হক খুব সহজে জয়লাভ করেন।
যশোর-৬ আসনটিও বিএনপি’র হাতছাড়া হয়েছে দলের মনোনয়ন প্রদানে ভুল সিদ্ধান্তের কারণে। এখানে প্রথমে মনোনয়ন দেয়া হয় কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণকে। আওয়ামী পরিবারের ত্যাজ্য সন্তান শ্রাবণকে ঘিরে নির্বাচনী এলাকায় ভিন্ন মেরূকরণ তৈরি হয়েছিল। শুরু হয়েছিল নির্বাচনী উৎসব। কিন্তু শ্রাবণকে বাদ দেয়ায় সেই উৎসবে ভাটা পড়ে। পরে মনোনয়ন লাভকারী আবুল হোসেন আজাদের বিপক্ষ রাজনৈতিক গ্রুপটি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। যার কারণে এই আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের জয় লাভ করা খুব সহজ হয়ে যায়।
তবে বিএনপি’র মাঠের নেতারা মনে করেন, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীদের অঢেল টাকার কাছে ভোটাররা নতি স্বীকার করায় বিএনপি প্রার্থীদের ভরাডুবি হয়েছে। এদিকে জেলার অধিকাংশ আসনে ভোট পড়ার হার ৭০ শতাংশের বেশি হলেও সদর আসনে এই হার ৬৭.৭৬ শতাংশ। একে ‘পরিকল্পিত’ বলে দাবি করছেন নগর বিএনপি’র সভাপতি মুল্লুক চান ও সাধারণ সম্পাদক সেতু।
