যথাযথ নীতি সহায়তার অভাবে অংকুরেই মুখ থুবড়ে পড়তে যাচ্ছে উদীয়মান ইলেকট্রনিক্স ও প্রযুক্তি শিল্পখাত। উৎপাদনকারী, সংযোজনকারী এবং আমদানিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যৌক্তিক শুল্ক পার্থক্য না থাকা, কম্প্রেসরের মতো অত্যন্ত হাই-টেক পণ্যে শুরুতেই অযৌক্তিক ভ্যাট আরোপ, কাঁচামাল আমদানির চেয়ে তৈরিকৃত পণ্য ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে বেশি শুল্ক সুবিধা, সরকারি ক্রয়নীতিতে দেশীয় পণ্য প্রাধান্য না পাওয়া সহ নানাবিধ প্রতিকূলতায় জর্জরিত ইলেক্ট্রনিক্স শিল্পখাত। এর ফলে দেশীয় হাই-টেক শিল্প বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। স্থানীয় উৎপাদনমুখীতা থেকে দেশ আবার আমদানি-নির্ভরতার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
স্থানীয় শিল্প পরিপন্থী এমন নীতি ও সিদ্ধান্তে অন্ধকার দেখছেন এ খাতের উদ্যোক্তাগণ। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, ইলেকট্রনিক্স ও প্রযুক্তিপণ্য খাতকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে স্থানীয় শিল্প ও বিনিয়োগ-বান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন ও সংস্কার প্রয়োজন। এজন্য আমদানিকারী, সংযোজনকারী ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যৌক্তিক শ্রেণীবিন্যাস ও শুল্ক পার্থক্য নির্ধারণ করা জরুরি। তারা বলছেন, স্থানীয় শিল্পের জন্য সহায়ক নীতিমালা প্রণয়ন হলে যেমন দেশীয় শিল্পের বিকাশ ও কর্মসংস্থান বাড়বে, তেমনেই তৈরি পোশাকশিল্পের মতো বিশ্ববাজারে ইলেকট্রনিক্স ও প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশ অন্যতম রপ্তানিকারক দেশ হয়ে উঠবে।
খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত অর্থবছরে এলডিসি থেকে উত্তরণের দোহাই দিয়ে আইএমএফের শর্ত পূরণের জন্য তাড়াহুড়ো করে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে ইলেকট্রনিক্স ও হাই-টেক পণ্যে অযৌক্তিক ভ্যাট আরোপ করা হয়। একইসঙ্গে ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানিতে অতিরিক্ত শুল্ক ধার্য করা হয়। পক্ষান্তরে তৈরিকৃত পণ্য ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক হ্রাস করা হয়।
জানা গেছে, গত অর্থবছরে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কম্প্রেসরের মতো হাই-টেক পণ্যে একলাফে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ধার্য করা হয়েছে। একইভাবে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত রেফ্রিজারেটর পণ্যের উপরেও মূল্য সংযোজন কর ৭.৫% থেকে ১৫% বৃদ্ধি করা হয়েছে। এরসঙ্গে দেশে উৎপাদিত হয় রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজার ও এয়ার কন্ডিশনারের কিছু যন্ত্রাংশের আমদানিতে শুল্ক হ্রাস এবং একই যন্ত্রাংশ তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চশুল্ক আরোপ করা হয়েছে (এস.আর.ও. নং-১৭৬-আইন/২০২৫/৩০৪-মূসক)। যেমন রেফ্রিজারেটর ও ফ্রিজারের তৈরিকৃত যন্ত্রাংশে (সেমি ফিনিশড গুডস বা এসকেডি) সম্পূরক শুল্ক বা এসডি মওকুফ করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে পিপি বটম প্লেট, ড্রেইনেজ পাইপ কভার, রেফ্রিজারেটর/ফ্রিজার সেলফ, এয়ার কন্ডিশনারের ইনডোর কেসিং, ডিস্ট্রিবিউশন পাইপ ইত্যাদি। তৈরিকৃত অবস্থায় এসব যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক হ্রাস করা হলেও কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক দিতে হচ্ছে। যেমন তৈরিকৃত রেফ্রিজারেটর ও ফ্রিজার সেলফ আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক শূন্য (০%)। অন্যদিকে একই যন্ত্রাংশ তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে ৪৫% সম্পূরক শুল্কসহ গড়ে ৫০% শুল্ক প্রদান করতে হচ্ছে।
এরফলে কাঁমামাল আমদানি করে বাংলাদেশে নিজস্ব কারখানায় উক্ত যন্ত্রাংশগুলো তৈরি করতে অনেক বেশি খরচ পড়ছে। যারফলে উচ্চ শুল্ক দিয়ে কাঁচামাল আমদানি করে যন্ত্রাংশ তৈরির চেয়ে তৈরিকৃত যন্ত্রাংশ আমদানি লাভবান হওয়ায় সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এসকেডি আকারে শুল্কমুক্ত সুবিধায় যন্ত্রাংশগুলো নিয়ে আসছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রকৃত উৎপাদনকারীগণ এবং দেশীয় শিল্পখাত। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।
এদিকে, কমার্শিয়াল এয়ার কন্ডিশনার (ভিআরএফ ও চিলার) এর ক্ষেত্রেও আমদানিকারক ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিপুল অযৌক্তিক শুল্কপার্থক্য রয়েছে। এক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন এইচএস কোড না থাকায় মূলধনী যন্ত্রপাতির জন্য নির্ধারিত কোডে সম্পূর্ণ তৈরিকৃত ভিআরএফ ও চিলার মাত্র ১ শতাংশ শুল্কে আমদানি করে বিক্রি করছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। বিপরীতে ভিআরএফ ও চিলার তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে স্থানীয় উৎপাদনকারীদের ১৫% এরও অধিক শুল্ক এবং আরো ১৫% ভ্যাট প্রদান করতে হচ্ছে।
এতে স্থানীয়ভাবে কম্প্রেসর, রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার ইত্যাদি পণ্যের উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে দেশীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নের ফলে কাঁচামাল আমদানির ব্যয়ও আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে স্থানীয় উৎপাদন শিল্পের অবস্থান ও বাজার সম্প্রসারণে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দেশীয় শিল্প পরিপন্থী এমন নীতিতে এ খাত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে।
উৎপাদনকারীগণ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দেশীয় শিল্প পরিপন্থী নীতিতে লাভবান হচ্ছেন আমদানিকারক এবং সংযোজনকারীগণ। নীতিমালায় উৎপাদনকারী, সংযোজনকারী ও আমদানিকারীগণের মধ্যে সুনির্দিষ্ট পার্থক্য ও শ্রেণি বিন্যাস বা বিভাজন না থাকায় বিনিয়োগের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। কাঁচামাল, আংশিক তৈরিকৃত পণ্য ও সম্পূর্ণ তৈরিকৃত পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যাখ্যা ও শুল্কপার্থক্য না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকগণ এর সুবিধা নিচ্ছেন।
দেশে উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্বেও কম্প্রেসর, রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার ইত্যাদি পণ্য এবং এসবের যন্ত্রাংশের আমদানি লাভজনক হওয়ায় আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি এয়ার কন্ডিশনার, রেফ্রিজারেটর, কুকওয়্যার এবং হোম অ্যান্ড কিচেন অ্যাপ্ল্যায়েন্সের বেশ কিছু যন্ত্রাংশ আমদানিতে আন্তর্জাতিক বাজারদর থেকে শুল্কায়ন মূল্য কম হওয়ায় মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির সুযোগ তৈরি হয়েছে। কতিপয় আমদানিকারক এই সুযোগের অপব্যবহার করে পণ্য আমদানি করায় এখাতে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। অন্যদিকে উক্ত যন্ত্রাংশ তৈরির কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে কাঁচামাল শুল্কায়ন মূল্য যন্ত্রাংশের শুল্কায়ন মূল্য থেকে অনেক বেশি হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দেশীয় উদ্যোক্তাগণ। যারফলে এক্ষেত্রে আমদানিকারক ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তৈরি হচ্ছে অসম পার্থক্য।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেফ্রিজারেটর অ্যান্ড কম্প্রেসর ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টারস এসোসিয়েশনের মহাসচিব জাহিদ আলম বলেন, বিভিন্ন দেশের উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পকে উৎসাহিত করতে এবং আন্তর্জাতিক রপ্তানি প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে স্ব স্ব সরকার বিশেষভাবে নীতিসহায়তা প্রদান করছে। অথচ আমাদের এখানে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত কম্প্রেসর সহ অন্যান্য ইলেকট্রনিক পণ্যের মূল্য সংযোজন কর ও কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক বৃদ্ধি এবং দেশে তৈরি হয় এমন যন্ত্রাংশের আমদানিতে শুল্ক হ্রাস স্থানীয় ইলেকট্রনিক্স শিল্পকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অত্যন্ত সম্ভবনাময় ইলেকট্রনিক্স ও হাই-টেক শিল্পের এমন দুরবস্থায় ভবিষ্যতে আর কোনো উচ্চ প্রযুক্তি-নির্ভর শিল্প দেশে স্থাপিত হওয়ার সম্ভাবনাকে পুরোপুরি অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তিনি বলেন, কেউ যেনো উৎপাদনমুখী দেশকে আমদানির দিকে ঠেলে দিতে না পারে, সেজন্য সরকারের সতর্ক থাকা উচিত। পলিসি অনুযায়ী যথাযভাবে উৎপাদন, সংযোজন ও আমদানি হচ্ছে কিনা তার মনিটরিং থাকা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইলেকট্রনিক্স ও হাই-টেক শিল্পের স্বার্থে স্থানীয় উৎপাদন উৎসাহিত করা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে দ্রুত সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষা ও বিকাশের জন্য উৎপাদন ও রপ্তানিকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য যৌক্তিক শুল্ক ও ট্যারিফ হার নির্ধারণ, অন্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, কর ছাড়, রপ্তানিমুখী শিল্পে প্রণোদনা ও বিনিয়োগ সহায়তা ছাড়া এই খাতে উন্নয়ন সম্ভব নয়। এজন্য আমদানিকারী, সংযোজনকারী ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যৌক্তিক শ্রেণীবিন্যাস ও শুল্ক পার্থক্য নির্ধারণ করা জরুরি। এই নীতিগত সহায়তা শিল্প উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে এবং প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদন শিল্পের বিকাশে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড হোম অ্যাপ্লায়েন্সেস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টারস এসোসিয়েশনের মহাসচিব এস এম জাহিদ হাসান বলেন, এ ধরনের হাই-টেক শিল্পখাতের বিকাশে স্থিতিশীল পলিসি সাপোর্ট প্রয়োজন। চীন, ভারত, ভিয়েতনাম থেকে শুরু করে এ খাতের শীর্ষ প্রতিটি দেশই ধারাবাহিকভাবে সরকারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছে। আমাদের দেশে স্থানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিপুল বিনিয়োগ করে পণ্য উৎপাদন কারখানাসহ অন্যান্য অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। তাদের বিনিয়োগের অন্যতম সেক্টর গবেষণা ও উন্নয়ণ খাত। কিন্তু বিগত সরকারের সময়ে যেসব নীতিগত সহায়তা পাওয়া গেছে, সেটা পর্যাপ্ত নয়। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে স্থানীয় শিল্পখাতের উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিনিয়োগ-বান্ধব নীতি প্রণয়ন, বাণিজ্য ঘাটতি নীতিমালা দূরীকরণ ইত্যাদি বিষয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আশা করছি নতুন সরকার এ বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি দেবেন। ধারাবাহিকভাবে প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা পেলে ইলেকট্রনিক্স ও প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিতে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশ হয়ে উঠবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ইলেকট্রনিক্স ও হাই-টেক শিল্পের গুরুত্ব আরও বাড়বে। উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়ন ও ইনোভেশনের সমন্বয়ে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে এই খাতে একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজনীয় সরকারি নীতি সহায়তা পেলে পরিকল্পিত শিল্পায়ন, গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে আগামী দশকে বাংলাদেশ বৈশ্বিক ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হতে পারে। এটি দেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধিসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসবে।
