বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশি পাসপোর্ট: আস্থার সংকট নাকি আত্মঘাতী আচরণ

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশি পাসপোর্ট: আস্থার সংকট নাকি আত্মঘাতী আচরণ

ফন্ট সাইজ:

পাসপোর্টের মান কি শুধু একটি সংখ্যার পতন, নাকি এটি আমাদের সম্মিলিত পরিচয়ের অবক্ষয়ের ইঙ্গিত? প্রশ্নটি আজ আর তাত্ত্বিক নয়; এটি বাস্তব, অস্বস্তিকর এবং জরুরি।

বাংলাদেশ এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি, রেমিট্যান্স—অর্থনীতির চাকা ঘুরছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উন্নয়নের গল্প শোনা যাচ্ছে। অন্যদিকে একই সময়ে আমাদের নাগরিকদের একটি অংশের আচরণ বিশ্বদরবারে সেই অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। এই সংকট পরিসংখ্যানের নয়; এটি বিশ্বাসের সংকট, আস্থার সংকট, পরিচয়ের সংকট।

সম্প্রতি যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানি, ফ্রান্সসহ পশ্চিমা বিশ্বের ১৩টি দেশ বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য একটি যৌথ সতর্কবার্তা দিয়েছে। তারা স্পষ্ট ভাষায় বলেছে—ভিসা আবেদন করতে হলে অবশ্যই নির্ধারিত সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে, জাল কাগজপত্র ব্যবহার করা যাবে না, লাইসেন্সবিহীন এজেন্টের ওপর নির্ভর করা যাবে না, এবং কোনো ধরনের শর্টকাটের আশ্রয় নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

একটি প্রশ্ন এখানে স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে—কেন এমন একটি যৌথ বিবৃতি দেওয়ার প্রয়োজন হলো? কারণ সমস্যাটি আর বিচ্ছিন্ন নয়; এটি একটি প্রবণতা হয়ে উঠেছে।

বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন বাংলাদেশের লাখো মানুষের। সেই স্বপ্ন স্বাভাবিক, বৈধ এবং প্রয়োজনীয়ও বটে। কিন্তু এই স্বপ্ন পূরণের পথে আমরা একটি বিপজ্জনক শর্টকাটকে স্বাভাবিক করে ফেলছি। ভিসা পাওয়ার জন্য ভুয়া চাকরির কাগজ, বানানো ব্যাংক স্টেটমেন্ট, মিথ্যা তথ্য, এমনকি রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য সাজানো গল্প—এসব এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে ‘চালাকি’ হিসেবে প্রশংসিত হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই চালাকি আসলে আত্মঘাতী।

১৩টি দেশের যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, এই ধরনের অনিয়মের কারণে ভিসা প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, আর্থিক ক্ষতি, সীমান্তে প্রবেশে বাধা এবং গুরুতর আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় তারা পরিষ্কার করেছে—কোনো দূতাবাস বা হাইকমিশন কোনো এজেন্টের সঙ্গে যুক্ত নয়। অর্থাৎ, ‘ভিতরের লোক’ বা ‘বিশেষ ব্যবস্থা’—এই ধারণাগুলো সম্পূর্ণ ভ্রান্ত, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের সমাজে এগুলো গভীরভাবে প্রোথিত। এই সতর্কবার্তা কেবল প্রশাসনিক নয়; এটি একটি আস্থাহীনতার প্রকাশ।

আমরা যদি আরও গভীরে তাকাই, তাহলে দেখব এই সংকটের শিকড় আরও বিস্তৃত। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ১০ জন বাংলাদেশির পরিচয় প্রকাশ করেছে। অভিযোগের তালিকায় ছিল শিশু নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, মাদক ব্যবসা, প্রতারণা, অস্ত্র, জালিয়াতি, চুরি ও হামলার মতো গুরুতর অপরাধ। তাদের রাখা হয়েছে ‘worst of the worst’ বা ‘খারাপের চেয়েও খারাপ’ ক্যাটাগরিতে। এই একটি বাক্যই আমাদের জন্য যথেষ্ট অস্বস্তিকর হওয়ার কথা।

কারণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি দেশের পরিচয় গড়ে ওঠে তার নাগরিকদের আচরণের ওপর। একজন যখন বিদেশে গিয়ে আইন ভাঙে, প্রতারণা করে বা অপরাধে জড়ায়, তখন সে একা দায় বহন করে না। তার সঙ্গে যুক্ত হয় একটি জাতির পরিচয়, একটি পাসপোর্টের বিশ্বাসযোগ্যতা।

একজনের অপরাধ আদালতে ব্যক্তিগত শাস্তি পায়, কিন্তু তার সামাজিক অভিঘাত পড়ে লাখো মানুষের ওপর। একজনের জালিয়াতি হাজারো সৎ আবেদনকারীর কাগজপত্রকেও সন্দেহের চোখে ফেলে। একজনের মিথ্যা পুরো জাতির সত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

এই বাস্তবতার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাচ্ছি আমাদের পাসপোর্টের অবস্থানেও। হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৩তম থেকে নেমে ৯৫তম হয়েছে। এখন বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা আগাম ভিসা ছাড়া মাত্র ৩৬টি দেশে ভ্রমণ করতে পারেন। এই সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি আস্থার সূচক।

অন্যদিকে উন্নত দেশগুলোর পাসপোর্ট কেবল ভ্রমণের অনুমতি নয়, এটি একটি বিশ্বাসের প্রতীক। তাদের নাগরিকদের ক্ষেত্রে ধরে নেওয়া হয়—তারা নিয়ম মানবে, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে, এবং প্রতারণার আশ্রয় নেবে না। এই ধারণা রাতারাতি তৈরি হয়নি; এটি দীর্ঘদিনের আচরণ, নীতি এবং সামাজিক সংস্কৃতির ফল। আমাদের ক্ষেত্রে প্রশ্নটা এখানেই—আমরা কি সেই আস্থা তৈরি করতে পারছি?

প্রায়ই আমরা একটি সান্ত্বনার যুক্তি দিই—“সব দেশেই খারাপ মানুষ আছে।” কথাটি আংশিক সত্য। কিন্তু পুরো সত্য নয়। পার্থক্যটা এখানে—অন্যান্য দেশ কি তাদের খারাপকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে? তারা কি আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সামাজিক নিন্দার মাধ্যমে অনিয়মকে সীমিত রাখতে পারছে?

আমাদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি হলো—অনেক সময় অনিয়মকে আমরা অনিয়ম হিসেবে দেখি না। বরং সেটিকে বুদ্ধিমত্তা হিসেবে বিবেচনা করি। কেউ যদি ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে ভিসা পায়, তাকে অনেকেই ‘স্মার্ট’ বলে। কেউ যদি এজেন্টের মাধ্যমে শর্টকাটে বিদেশে যায়, তাকে ‘চালাক’ হিসেবে দেখা হয়। এই মানসিকতাই সবচেয়ে বড় বিপদ।

কারণ এটি শুধু আইন ভাঙার প্রবণতা তৈরি করে না; এটি নৈতিকতার ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়। যখন একটি সমাজে প্রতারণা গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, তখন সেখানে আস্থা টিকে থাকে না—না ব্যক্তির প্রতি, না প্রতিষ্ঠানের প্রতি, না দেশের প্রতি।

বাংলাদেশের প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি। তাদের শ্রম, ত্যাগ এবং অবদান আমাদের উন্নয়নের ভিত্তি মজবুত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই—একটি ছোট অংশের অনৈতিক কর্মকাণ্ড পুরো প্রবাসী সমাজের সুনামকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। বিদেশে যাওয়া মানে শুধু ব্যক্তিগত উন্নতি নয়; এটি একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করা। একজন বাংলাদেশি যখন বিদেশে পা রাখেন, তখন তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন—তিনি বাংলাদেশের একটি চলমান পরিচয়পত্র।

দ্বিতীয়ত, জালিয়াতি ও প্রতারণার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা গড়ে তুলতে হবে। শুধু আইনের প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; সামাজিকভাবে এসব কর্মকাণ্ডকে লজ্জাজনক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যম—সবখানেই এই বার্তা স্পষ্ট করতে হবে যে শর্টকাটের সাফল্য আসলে দীর্ঘমেয়াদে ব্যর্থতা।

তৃতীয়ত, বিদেশগামীদের জন্য কার্যকর প্রশিক্ষণ ও দিকনির্দেশনা জরুরি। তাদের জানাতে হবে—কীভাবে বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, কীভাবে প্রতারণার ফাঁদ থেকে বাঁচতে হয়, এবং কীভাবে নিজের ও দেশের সম্মান রক্ষা করতে হয়। ১৩টি দেশের যৌথ বিবৃতিও এই বিষয়টিই জোর দিয়ে বলেছে—যাচাইকৃত তথ্য ও সরকারি চ্যানেলের মাধ্যমে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

সবশেষে, আমাদের একটি কঠিন সত্য মেনে নিতে হবে—পাসপোর্টের শক্তি শুধু কূটনৈতিক আলোচনায় নির্ধারিত হয় না; এটি নির্ধারিত হয় নাগরিকদের আচরণ দিয়ে। আমরা যদি নিজেদের আচরণে আস্থা তৈরি করতে না পারি, তাহলে কোনো উন্নয়নই সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারবে না। প্রশ্নটা তাই খুব সরল, কিন্তু গভীর—আমরা কি আমাদের পরিচয়কে সম্মানজনক রাখতে পারছি? নাকি আমরা নিজেরাই আমাদের পাসপোর্টকে দুর্বল করে দিচ্ছি?

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]

ট্যাগসমূহ:

Roni Ahmed

৩ মাস আগে

Excellent and timely writing. Thank you. There should also urgent investigation of fake agents and culprits in the country. If the govt wants to protect the remittance, some drastic measures must be taken to build a zero tolerance model

Rezaul Karim

৩ মাস আগে

যারা আমাদের দেশকে হেয় করলো, বাংলাদেশ অপমানিত হল,যাদের জন্য জনশক্তি রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হল তাদের কঠিন বিচার হোক।

মন্তব্য করুন