যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এক নজিরবিহীন সংলাপের সাক্ষী হলো বিশ্ব। যুদ্ধ বন্ধ করে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির দরজা খুলতে শনিবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে রুদ্ধশ্বাস বৈঠক করেছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের প্রতিনিধিরা। তবে শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে টানা ২১ ঘণ্টার ওই আলোচনা। এক্ষেত্রে দুই পক্ষই একে অপরকে দায়ী করেছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ইরান তাদের শর্ত মেনে নেয়নি। অন্যদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পরও কোনো সমঝোতা না হওয়ায় হরমুজ প্রণালি অবরোধের হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল তিনি তার সামাজিকমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করে বলেছেন, পারমাণবিক ইস্যুতে কোনো চুক্তি চূড়ান্ত না হওয়ায় এই কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন তিনি। দ্রুতই হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করা সকল জাহাজে অবরোধ কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প।
কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, আনুষ্ঠানিক আলোচনা ভেঙে গেলেও পর্দার আড়ালে যোগাযোগ চালিয়ে যেতে পারে দুই দেশ। ট্রাম্পের হুমকিতেও এমন ইঙ্গিত রয়েছে। তিনি আলোচনার প্রশংসা করে বলেন, পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত বৈঠক বেশির ভাগ বিষয় নিয়ে অগ্রগতি হয়েছে। এ ছাড়া জেডি ভ্যান্সও বলেছেন, আমরা ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ এবং চূড়ান্ত প্রস্তাব পেশ করেছি। বিবিসি’র দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক প্রতিবেদক আজাদেহ মোশিরি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের চূড়ান্ত প্রস্তাব ইরানের সামনে তুলে ধরেছে। এরপরও পাকিস্তানের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক বা পরোক্ষ আলোচনা কিছুটা চলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও এটি কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। অন্যদিকে ইরান আগেই জানিয়েছিল, এক বৈঠকেই কোনো চুক্তি হবে- এমন আশা তারা করেনি। ফলে আলোচনার ব্যর্থতা মানেই পুরো প্রক্রিয়ার শেষ নয় বলেই মনে করা হচ্ছে।
এই আলোচনায় সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দু’টি বিষয়- ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। যুক্তরাষ্ট্র চায়, ইরান স্পষ্টভাবে প্রতিশ্রুতি দিক যে, তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। অন্যদিকে ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যেতে অনড় অবস্থানে রয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি নিয়েও বিরোধ তীব্র। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি পরিবাহিত হয়। ইরান এই প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায় এবং এমনকি টোল আরোপের কথাও বলেছে।
ইসলামাবাদের বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। আর ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দেশটির স্পিকার বাঘের গালিবাফ। দুই পক্ষের প্রতিনিধিদলই ইসলামাবাদ ছেড়ে নিজ নিজ দেশে ফিরে গেছেন। আন্তর্জাতিক মহল, বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, ওমানসহ বিভিন্ন দেশ এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং নতুন করে উত্তেজনা এড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। ট্রাম্পের হুমকি, পাকিস্তানের মাধ্যমে দুই দেশের পরোক্ষ কূটনৈতিক তৎপরতা মধ্যপ্রাচ্য সংকট এক অচলাবস্থার মধ্যে ফেলেছে বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক।
হরমুজ প্রণালিতে ট্রাম্পের অবরোধ: ইরানের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধ আরোপের ঘোষণা দিয়ে ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প বলেন, পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বেশির ভাগ বিষয় নিয়ে অগ্রগতি হলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পারমাণবিক ইস্যুতে কোনো সমঝোতা হয়নি। এর জেরে যুক্তরাষ্ট্র এখন কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। তিনি বলেন, অবিলম্বে মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ বা বের হওয়ার চেষ্টা করা সব জাহাজের ওপর অবরোধ কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু করবে। ট্রাম্প আরও বলেন, ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে মাইন পেতে রেখে বিশ্বকে ভয় দেখাচ্ছে এবং এটিকে তিনি ‘বিশ্বব্যাপী চাঁদাবাজি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, কোনো জাহাজ ইরানকে টোল দিলে সেটিকে আন্তর্জাতিক জলসীমায় আটকে দেয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি জানান, প্রণালিতে পেতে রাখা মাইন ধ্বংসের কাজও শুরু করা হবে। যদি কোনো ইরানি বাহিনী মার্কিন বা বেসামরিক জাহাজের ওপর হামলা চালায়, তাহলে কঠোর সামরিক জবাব দেয়া হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি। ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ইতিমধ্যেই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এই পরিস্থিতির অবসান কীভাবে করতে হবে, তা ইরান ভালোভাবেই জানে। তিনি আরও বলেন, এই অবরোধে অন্যান্য দেশও যুক্ত হতে পারে এবং ইরানকে এই পরিস্থিতি থেকে কোনো ধরনের অর্থনৈতিক লাভ করতে দেয়া হবে না।
হরমুজ অবরোধের পাশাপাশি ট্রাম্প ইরানকে শেষ করে দেয়ারও হুমকি দেন। তিনি বলেন, ‘উপযুক্ত সময়ে’ ইরানকে ‘শেষ করে দেয়া হবে। ট্রাম্প আরও বলেন, ওয়াশিংটন যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। উপযুক্ত সময়ে ইরানকে শেষ করে দেবে মার্কিন বাহিনী।
ট্রাম্পের হরমুজ অবরোধের সিদ্ধান্ত সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত: হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ ঘোষণার মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট পরিস্থিতিকে সরাসরি সামরিক পথে নিয়ে যাচ্ছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আল জাজিরার প্রতিবেদক জেমস বায়েস তার এক বিশ্লেষণে বলেছেন, হরমুজে অবরোধ তাৎক্ষণিকভাবে তেহরানে হামলার ঘোষণা নয়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রণালি খুলে দেয়ার কথা বললেও বাস্তবে সেটিকে বন্ধ করার কৌশল গ্রহণ করছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই অবরোধে অন্য দেশগুলোকেও যুক্ত করা হবে। ফলে এটি একটি বহুজাতিক সামরিক উদ্যোগে রূপ নিতে পারে। যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তিনি আরও বলেছেন, উপযুক্ত সময়ে হামলা করতে আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত, যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে, অবরোধের পর দ্বিতীয় ধাপে আরও বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ হতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত ইরানের: গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ বেশ কয়েকটি পোস্ট করেন। গালিবাফ বলেন, আলোচনার এই পর্বে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি প্রতিনিধিদলের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু এখন এটি সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এসেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র আমাদের আস্থা অর্জন করতে পারবে কিনা। তার এই মন্তব্যকে কূটনৈতিক আলোচনা খোলা রাখার কৌশল বলে মনে করছেন কোনো কোনো বিশ্লেষক। আন্তর্জাতিক মিডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, পাকিস্তানে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর গালিবাফ ওই মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, আমরা সব সময় ইরানের জনগণের অধিকার রক্ষায় সামরিক অ্যাকশনের সমান্তরালে শক্তিশালী কূটনীতির ওপর জোর দিই। আমরা জাতীয় প্রতিরক্ষায় ৪০ দিনের অর্জনগুলো সুরক্ষিত করতে কাজ চালিয়ে যাওয়া এক মুহূর্তের জন্যও থামাবো না।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলি হামলায় ইরানে ২ হাজারের বেশি শিশু আহত: ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় অন্তত ২ হাজার ১১৫ শিশু ও কিশোর আহত হয়েছে। ইরানের জরুরি সেবা বিভাগের প্রধান জাফর মিয়াদফার এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ইরানের সংবাদ সংস্থা মেহের নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে জাফর মিয়াদফার বলেন, হামলায় আহত ১৮ বছরের কম বয়সী এসব ভুক্তভোগীর মধ্যে ১২৪ জনের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। এমনকি আহতদের মধ্যে ২৪ জনের বয়স দুই বছরেরও কম। জাফর মিয়াদফার আরও বলেন, হামলায় আহতদের মধ্যে প্রায় ৫ হাজার নারী রয়েছেন। এই হামলাগুলোর বেশির ভাগই চালানো হয়েছে তেহরান, খুজেস্তান, লারেস্তান, ইসফাহান, কেরমানশাহ এবং ইলাম প্রদেশে।
