ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শুধু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি জয়ী হয়নি—জয়ী হয়েছে বাংলাদেশ। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তে অর্জিত এই রাষ্ট্র কোনো দল, কোনো গোষ্ঠী কিংবা কোনো মতাদর্শের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। সেই সত্যটাই এবারের নির্বাচন আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।
ফল ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে হিসাব–নিকাশ। কে কোথায় জিতল, কে কেন হারল, কোন সমীকরণ কাজ করল—এসব বিশ্লেষণেই ভরপুর সংবাদমাধ্যম, টকশো ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ২৯৭টি আসনের মধ্যে বিএনপি পেয়েছে ২১২টি আসন—একটি নিরঙ্কুশ ও ভূমিধস বিজয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৭টি এবং ইসলামী আন্দোলন পেয়েছে একটি আসন।
ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে ১৩টিতে বিএনপি এবং ৭টিতে জামায়াত জোটের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। তবে ফলাফল যতটা একপেশে মনে হয়, বাস্তবতা ততটা নয়। রাজধানীর অধিকাংশ আসনেই লড়াই ছিল হাড্ডাহাড্ডি। অল্প ভোটের ব্যবধানে কয়েকজন প্রার্থী হেরে গেছেন। এমনকি দু’জন প্রার্থী আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন কমিশনে কারচুপির অভিযোগও করেছেন।
জামায়াতের অতীত নির্বাচনী ইতিহাসের দিকে তাকালে এবারের ফলাফল নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। ১৯৯১ সালে তারা ১৮টি আসন পেলেও ১৯৯৬ সালে নেমে আসে মাত্র তিনে। ২০০১ সালে বিএনপি জোটের অংশ হিসেবে ১৭টি আসন, আর ২০০৮ সালে মাত্র দুটি আসন নিয়ে সংসদে যায় দলটি। এরপর আদালতের রায়, দমন-পীড়ন এবং সাংগঠনিক সংকটে তারা দীর্ঘদিন রাজনীতির প্রান্তে ছিল।
সেই প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচন তাদের জন্য এক ধরনের ‘রাজনৈতিক পুনরাগমন’। আসনের সংখ্যা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। এটাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই অর্জন কি তারা টেকসই করতে পেরেছে? নাকি বড় সুযোগ এসেও রাজনৈতিক ভুলে তা আংশিকভাবে হাতছাড়া হয়েছে?
ভূমিধস জয়ের মাঝেও বিএনপির জন্য সতর্কবার্তা রয়েছে। সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গা, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী—এই জেলাযগুলোতে বিএনপি একটি আসনও পায়নি। অর্থাৎ গ্রাম ও মফস্বলের কিছু অঞ্চলে দলটির সাংগঠনিক দুর্বলতা স্পষ্ট। জনগণ ‘আস্থা’ দিয়েছে, ‘চেক’ দিয়েছে—খোলা লাইসেন্স নয়।
চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের পর বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকায় প্রতিযোগিতা গিয়ে ঠেকেছে মূলত বিএনপি বনাম জামায়াত–এনসিপি এই দুই মেরুতে। এমন পরিস্থিতিতে জামায়াতের সামনে ছিল দুটি ঐতিহাসিক সুযোগ—এক, সংখ্যার দিক থেকে সর্বোচ্চ অর্জন;
দুই, রাজনৈতিকভাবে মধ্যম ও অনিশ্চিত ভোটারকে আশ্বস্ত করা। প্রথম সুযোগটি তারা কাজে লাগিয়েছে। দ্বিতীয়টিতে হোঁচট খেয়েছে।
৫ আগস্টের পর জামায়াত-সমর্থিত কিছু বুদ্ধিজীবী, বক্তা ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্টদের বক্তব্যে একটি স্পষ্ট প্রবণতা দেখা গেছে—বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার ইতিহাসকে নতুন করে ফ্রেম করার চেষ্টা। মুক্তিযুদ্ধের সময় দলটির ভূমিকা নিয়ে অনুশোচনা তো দূরের কথা, উল্টো স্বাধীনতার ঘোষণার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে ‘নয়া বয়ান’ হাজির করা হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তথাকথিত ‘কালচারাল ওয়ার’। প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, ছায়ানট ও উদীচী–এর ওপর আক্রমণের ঘটনাগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এগুলো মনস্তাত্ত্বিকভাবে বড় প্রভাব ফেলেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি ছাত্র সংসদে জামায়াত–শিবির সমর্থিত নেতাদের বক্তব্যে এই হামলার পক্ষে উসকানিমূলক ভাষা দেখা গেছে—অন্তত প্রকাশিত ভিডিওগুলো সেই ধারণাই তৈরি করেছে। একই সময়ে টক শো ও সোশ্যাল মিডিয়ায় অভিযোগ উঠেছে, “মিডিয়া আমাদের বিরুদ্ধে।” সমালোচনা আর আক্রমণকে বৈধতা দেওয়া এক জিনিস নয়। এই পার্থক্যটি জামায়াতের অনলাইন কর্মীরা ধরতে পারেনি। ফলে সাংবাদিক সমাজে এক ধরনের ক্ষত তৈরি হয়েছে—যা নির্বাচনের আগ পর্যন্ত শুকায়নি।
দলটি অতিমাত্রায় সোশ্যাল মিডিয়া ও কয়েকজন ইউটিউবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু ভোটের বাস্তব হিসাব ভিন্ন কথা বলে। যদি ফলোয়ারই ভোট হতো, তাহলে ৭ মিলিয়নের বেশি ফলোয়ার থাকা স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা হেরে যেতেন না। রাজনীতি কেবল অনলাইন ট্রেন্ডে চলে না—এটা মাঠ, মন ও মধ্যমপন্থীদের আস্থার খেলা।
কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার মতো ভয়াবহ ঘটনার পর জামায়াতের নীতি নির্ধারকদের নীরবতা জনগণের মনে গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে। বাংলাদেশ ধর্মভীরু দেশ—কিন্তু উগ্রবাদী নয়। পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের মতো রাষ্ট্র–চিন্তা বাংলাদেশের মানুষের মানসিকতার সঙ্গে যায় না।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়—দেশের মানুষ বিএনপিকে আরেকবার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগ শর্তসাপেক্ষ। শহুরে মধ্যবিত্ত, তরুণ ভোটার ও নারীদের ভোটে এই জয় এসেছে—তাদের প্রত্যাশা ব্যর্থ হলে পরিণতি ভিন্ন হতে পারে।
বিদেশি পর্যবেক্ষকদের প্রসঙ্গে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন,পর্যবেক্ষকরা যা দেখেছে তা তারা তুলে ধরবেন, আমরাও তুলে ধরবো। “আমরা কালো অধ্যায়ের রাজনীতি চাই না।” তিনি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের কথা বলেছেন, সংবিধানের আলোকে সবার সমতার কথা বলেছেন। ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ চান জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের ভদ্রতা ও ইতিবাচক আচরণকে দুর্বলতা মনে করলে ভুল করবেন। কারণ ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি জানানোর পরেও বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় কর্মী সমর্থকদের ওপর হামলা হচ্ছে।
এই বক্তব্য আশাব্যঞ্জক—কিন্তু প্রশ্ন হলো, মাঠের কর্মী, অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ও সাংস্কৃতিক অবস্থান কি সেই বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ড. মাহদী আমিন বলেছেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয়তাবাদের ধারক বিএনপি’র প্রতি জনগণের যে অসাধারণ ভালোবাসা রয়েছে, তারই বহিঃপ্রকাশ এই নির্বাচন। যেখানে আমরা দেখেছি অপ্রতিরোধ্য নিরঙ্কুশ বিজয়। আজকের এই বিজয় শুধু বিএনপি’র না, এই বিজয় গণতন্ত্রের, এই বিজয় বাংলাদেশের।
এই নির্বাচনে কোনো দল এককভাবে বিজয়ী নয়। বিজয়ী হয়েছে বাংলাদেশের জনগণ—যারা উগ্রতা প্রত্যাখ্যান করেছে, কিন্তু পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ছাড়েনি। যারা এই বার্তা বুঝবে, তারাই টিকে থাকবে।
ব্যালট বাক্সে রায় হয়ে গেছে। এবার রাজনীতিবিদদের পালা—এই রায় বোঝার।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]
জিতেছে বাংলাদেশ, হেরেছে মব সন্ত্রাস
নিয়াজ মাহমুদ
মত-মতান্তর
৪ মাস আগে
১৪ ফেব্রুয়ারি (শনিবার), ২০২৬, ৯ঃ৫৬ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%

Muhammad
৪ মাস আগেআপনার দুটি লিখা পড়লাম। ২৪ এর কোনঐ উল্লেখ নেই আপনার দুই লেখায়। আপনার দায়বদ্ধতা দেখার অপেক্ষায় থাকলাম।