সীমান্তবর্তী উখিয়া উপজেলার শরণার্থী শিবিরের চৌহদ্দীতে দাঁড়িয়ে যে অব্যক্ত মানবিক বেদনার মুখোমুখি হওয়া যায়, সেটি কেবল সংঘাতের প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক ট্র্যাজেডির প্রতিচ্ছবি নয়, গভীর নিরাপত্তা সংকটের প্রারম্ভিক রেখাচিত্র।
সীমান্তরেখার জনপদে ত্রিপলে ছাওয়া ঘরের সারি, অনিশ্চয়তায় ভরা মানুষের চোখ এবং “ফিরে যাওয়া” শব্দটির প্রতি আস্থাহীনতা-এসবই ইঙ্গিত দেয় যে, সংকটটি কেবল বাস্তুহীন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বা আশেপাশে সীমাবদ্ধ সংকট নয়, বাংলাদেশে নিরাপত্তার নতুন ঝুঁকিপূর্ণ সমীকরণ।
মানবিকতা সমস্যা নামে পরিচিত রোহিঙ্গা ইস্যুটি আসলে ধীরে ধীরে আঞ্চলিক পরিসর ছাড়িয়ে এক সুগভীর জাতীয়-পর্যায়ের নিরাপত্তা সংকটে রূপান্তরিত। ফলে ‘তারা ফিরবে কিনা’ প্রশ্নের মতো ‘তারা না ফিরলে, বাংলাদেশ কীভাবে এই দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতা সামাল দেবে’-এই কঠিন প্রশ্নটিও সামনে চলে এসেছে।
পাশের দেশের সংখ্যালঘু জাতিগত-ধর্মীয় জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গারা নিজ দেশে এক পরিকল্পিত উচ্ছেদের শিকার হয়ে বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসছে। তবে, ২০১৭ সালের গণহত্যার পর থেকে রোহিঙ্গা ইস্যুটি চরম মানবিক সংকট হিসেবে বিবেচিত হয়। পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে সমস্যাটি বাংলাদেশের জন্য এক জটিল নিরাপত্তা ইস্যুতে রূপ নিয়েছে। চলমান জাতিগত সশস্ত্র সংঘাতের পাশাপাশি ২০২১ সালের মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থান এবং পরবর্তীতে সামরিক জান্তার ক্ষমতা সুসংহত হওয়া-এই সংকটকে আরও দীর্ঘস্থায়ী ও অনিশ্চিত করেছে। একইভাবে সেখানে গণতান্ত্রিক প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাকে ক্ষীণ করেছে বহুজাতিক সশস্ত্র সংঘাতের স্থায়িত্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে।
সামগ্রিক পরিস্থিতিতে উখিয়া ও অন্যান্য স্থানের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে যে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে, তা একদিকে যেমন প্রত্যাবাসনের ব্যর্থতার কারণে, অন্যদিকে, সীমান্তের অপর অংশের স্থায়ী অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার কারণে। যা শরণার্থী সমস্যা মোকাবিলার মানবিক দায়িত্বের পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য এক গভীর নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আবর্তিত সমস্যাটি বর্তমানে নতুন নিরাপত্তা ফ্রন্টলাইন উন্মুক্ত করেছে দেশের অন্যান্য স্থানেও।
ক্যাম্পের দায়িত্বশীল কয়েকজনকে প্রশ্ন করেছিলাম, রোহিঙ্গা সমস্যা উখিয়া-কক্সবাজার ছাড়িয়ে কীভাবে সাতক্ষীরা, যশোর, খুলনা বা সুন্দরবন ঘেঁষা অঞ্চল তথা দেশের অন্যান্য স্থানেও প্রভাব ফেলছে? ক্যাম্প থেকে ফিরে একই প্রশ্ন নিয়ে কক্সবাজার শহরে বসেছিলাম কয়েকজন তরুণ শিক্ষক, উন্নয়নকর্মী ও সাংবাদিককে নিয়ে। মুখোমুখি আলোচনার পরিসরে প্রাপ্ত খোলামেলা ভাষ্য থেকে তিনটি প্রধান চিত্র সামনে আসে:
১. ট্রান্সন্যাশনাল অপরাধ নেটওয়ার্কের বিস্তার
দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের সীমান্ত-বিশেষত সাতক্ষীরা, যশোর, খুলনা ও সুন্দরবন ঘেঁষা নদীপথ-ঐতিহাসিকভাবে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য, চোরাচালান ও সীমান্ত-অর্থনীতির একটি জটিল জোন। রোহিঙ্গা সংকটের পর এই অঞ্চলটি ক্রমশ একটি ট্রান্সন্যাশনাল অপরাধ করিডোরে রূপ নিচ্ছে, যেখানে রোহিঙ্গা শরণার্থী-মানবসম্পদকে সহজেই অপরাধে ঠেলে দেয়া সম্ভব হচ্ছে।
আগে থেকেই উখিয়ার শিবিরগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং আইনি সীমাবদ্ধতা বিরাজমান। এই তিনটি উপাদান মিলিয়ে একটি শরণার্থী শিবিরগুলোতে একটি ‘পুশ ফ্যাক্টর’ তৈরি করেছে। ফলে কিছু রোহিঙ্গা যুবক ও কিশোরকে অপরাধচক্রগুলো সহজেই নিয়োগ করতে পারে। যারা কুরিয়ার হিসেবে, সীমান্ত পারাপারে গাইড বা দালাল পরিচয়ে কাজ করছে। এমনকি, স্থানীয় নেতৃত্ব ও সরকারি লোকজনের সহযোগিতায় জাল পরিচয়পত্র ব্যবহার করে তারা সর্বত্র নেটওয়ার্ক বিস্তারে সক্ষম হয়েছে। এমন পরিস্থিতি কেবল অপরাধচক্রের সক্ষমতা বাড়ায় না; বরং একটি ‘অবৈধ ছায়া শ্রমবাজার’ তৈরি করে, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে।
ট্রান্সন্যাশনাল অপরাধ নেটওয়ার্ক একটি বৈচিত্র্য রুটের মাধ্যমে বৃহত্তর কক্সবাজার থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত ‘সাপ্লাই চেইন’ তৈরি করে নিয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের আগে মাদক (বিশেষত ইয়াবা) প্রধানত কক্সবাজার-টেকনাফ রুটে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন দেখা যাচ্ছে, কক্সবাজার থেকে নদীপথ ও উপকূলীয় ট্রানজিট হয়ে পণ্য দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যাচ্ছে। সেখান থেকে ভারতীয় সীমান্তে প্রবেশ করে বৃহত্তর বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে। সুন্দরবনের জটিল খাল-নদী নেটওয়ার্ক নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই রুটগুলো বহুস্তরীয় সাপ্লাই চেইন তৈরি করেছে, যেখানে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্র একে অপরের সঙ্গে যুক্ত।
নারী ও শিশু পাচারের বিষয়টি ট্রান্সন্যাশনাল অপরাধ নেটওয়ার্কের সরচেয়ে সুসংহত ও নীরব অপকর্ম, যা গভীরতর সংকট ও উদ্বেগজনক বিষয়। শরণার্থী শিবিরের ভেতরে বিয়ের প্রলোভন, চাকরির আশ্বাস বা বিদেশে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে নারী ও কিশোরীদের টার্গেট করা হচ্ছে। তাদেরকে প্রথমে অভ্যন্তরীণ শহরে এবং পরে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে বা মধ্যপ্রাচ্যে পাচার করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে তারা জোরপূর্বক শ্রমে এবং যৌনব্যবসায় বাধ্য হওয়ার শিকারবস্তুতে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়াটি এতটাই নীরব ও সংগঠিত যে, অধিকাংশ ঘটনাই আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয় না-ফলে নীতিনির্ধারণে এ সংক্রান্ত ডাটা বা তথ্য স্পষ্ট আকারে পাওয়া যায় না।
ট্রান্সন্যাশনাল অপরাধ নেটওয়ার্কের কারণে অপরাধের সঙ্গে সন্ত্রাসমূলক অপরাধের সংযোগ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও সব অপরাধচক্র সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত নয়, তবুও অনেকগুলো ঘটনার বিবরণ দেখায়, যেখানে অবৈধ অর্থনীতি শক্তিশালী হয়, সেখানে চরমপন্থি গোষ্ঠীগুলোর প্রবেশের ঝুঁকি বাড়ে। আফগানিস্তান বা মিয়ানমারে অপরাধের গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলে এমনটি হয়েছে। এতে মাদক ও মানব পাচার থেকে অর্জিত অর্থ অস্ত্র ক্রয় বা নেটওয়ার্ক বিস্তারে ব্যবহৃত হতে পারে।
ট্রান্সন্যাশনাল অপরাধ নেটওয়ার্কের কুপ্রভাব স্থানীয় অর্থনীতি ও সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়ারও সৃষ্টি করেছে। অপরাধ নেটওয়ার্কের বিস্তার শুধু নিরাপত্তা নয়, সামাজিক কাঠামোকেও প্রভাবিত করছে। বৈধ অর্থনীতির সঙ্গে অবৈধ অর্থের প্রতিযোগিতায় ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হচ্ছে সমাজ ও মানুষের মধ্যে। তরুণদের মধ্যে দ্রুত অর্থ পাওয়ার লিপ্সা বেড়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় জনগণের বিশ্বাসের সংকট তৈরি হচ্ছে। এর ফলে একটি ‘অপরাধমুখী স্থানীয় অর্থনীতি’ গড়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করবে।
অতএব, রোহিঙ্গা ইস্যুকে বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে নয়, বরং আইন-শৃঙ্খলার ঝুঁকি, মানবিক সংকট, সীমান্ত রাজনীতি এবং অপরাধ অর্থনীতির সংযোগস্থল হিসেবে বিশ্লেষণ করা জরুরি-নয়তো ‘নীরব বিস্তার’ একসময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
২. সীমান্ত নিরাপত্তার চাপ বৃদ্ধি
রোহিঙ্গা সমস্যা সীমান্ত নিরাপত্তায় চাপ বৃদ্ধি করছে। যদিও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিগত এক দশকে নজরদারি ও অবকাঠামো (ফেন্সিং, বিওপি, যৌথ টহল) উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার হয়েছে, তবুও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাস্তবতা ভিন্ন-এখানে সীমান্তের বড় অংশই নদীমাতৃক ও ম্যানগ্রোভ-আচ্ছাদিত, বিশেষত সুন্দরবন। এই ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যই নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ‘স্মল-কেন্দ্রিক’ মডেল থেকে বিচ্যুত করে একটি জটিল নদীকেন্দ্রিক সীমান্ত-নিরাপত্তা সমস্যা তৈরি করেছে। কারণ, অসংখ্য খাল-নদী ও চরের পরিবর্তনশীলতা নিরাপত্তার স্থায়ী অবকাঠামোকে অকার্যকর করে। জোয়ার-ভাটার সময় সীমারেখা বাস্তবে সরে যাওয়ার ফলে নজরদারি ধারণা দুর্বল হয়, যেখানে অনুপ্রবেশ ও অপরাধ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা নিজেই একটি চ্যালেঞ্জ।
তাছাড়া টহলের ক্ষেত্রে স্মল থেকে নদীতে কৌশলগত ফাঁক থাকে। স্মলভিত্তিক টহল কাঠামোকে নদীপথে রূপান্তর করা সহজ নয়। বোট-ভিত্তিক টহল উচ্চ খরচসাপেক্ষ এবং আবহাওয়ানির্ভর। রাতের অন্ধকারে ও কুয়াশায় নজরদারির সুযোগ কমে যায়। ফলে ছোট, দ্রুতগামী নৌযান ব্যবহার করে চোরাকারবারিরা ফাঁকি দেয়ার কৌশল সফলভাবে কাজে লাগাতে পারে।
অবৈধ অনুপ্রবেশ সাধারণত বড় দলে হয় না। ছোট ছোট গ্রুপে, স্থানীয় গাইডের সহায়তায় জোয়ারের সময় নদীপথ ব্যবহার করে স্থানীয় জেলে বা বনজীবী সেজে অনুপ্রবেশ ও অপরাধ করা হয়।
কক্সবাজার সীমান্তের অপরাধী চক্র জানে, ভারতের সঙ্গে পশ্চিম দিকের সীমান্তটি একটি রেখা নয়-এটি একটি জীবন্ত, পরিবর্তনশীল ইকোসিস্টেম। এই বাস্তবতা বুঝে নিরাপত্তাকে এড়িয়ে অপকর্ম চালায় তারা। এভাবেই দেশের এক প্রান্তের সমস্যাকে কাজে লাগিয়ে দেশব্যাপী অপরাধ ও অপকর্ম করতে পারছে দুষ্টচক্র। এক্ষেত্রে রোহিঙ্গা সমস্যাকে তাদের শক্তি ও কার্যক্রম বৃদ্ধিতে কাজে লাগাচ্ছে অপরাধী গোষ্ঠীগুলো।
৩. জলবায়ু ও নিরাপত্তার আন্তঃসম্পর্ক
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল বাংলাদেশের সবচেয়ে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি। ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা, নদীভাঙন-এসব কারণে স্থানীয় জনগণ নিজেরাই অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত। এই প্রেক্ষাপটে নতুন কোনো অনুপ্রবেশ বা সামাজিক চাপ সহজেই সংঘাতের রূপ নিতে পারে। অথচ বাস্তবতা হলো দেশে ফিরে যেতে না-পারা রোহিঙ্গারা যেখানেই সুযোগ পাচ্ছে, সেখানে বসতি গড়ছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বনাঞ্চল ও নদীগুলো তাদেরকে আইন ও প্রশাসনের চোখ থেকে লুকিয়ে থাকার প্রাকৃতিক সুযোগ দিচ্ছে। প্রথাগত পেশার বাইরে অবৈধ ও অপরাধমূলক পেশার মাধ্যমে জীবিকার সুযোগ পাচ্ছে তারা এসব জায়গায় থাকার মাধ্যমে। এভাবে কক্সবাজার অঞ্চলের রোহিঙ্গা সমস্যা দেশের নানা স্থানে, বিশেষত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বাড়তি চাপ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে।
স্থানীয় সমস্যা থেকে জাতীয় নিরাপত্তা সংকট
রোহিঙ্গা সমস্যা এখন আর কক্সবাজার বা মিয়ানমার সীমান্তের আশপাশে সীমাবদ্ধ থাকছে না। কেবলমাত্র মানবিকতা সমস্যার গণ্ডির মধ্যেও নেই ইস্যুটি। বাস্তবে রোহিঙ্গা ইস্যুটি ধীরে ধীরে স্থানীয় বা আঞ্চলিক পরিসর ছাড়িয়ে এক সুগভীর জাতীয়-পর্যায়ের নিরাপত্তাগত ক্ষতে পরিণত হচ্ছে।
উখিয়ার শরণার্থী শিবিরগুলো যেমন প্রত্যাবর্তনের এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রতীক, তেমনি দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাস্তবতাও এক অদৃশ্য উত্তেজনায় ভরপুর। প্রশ্নটি এখন আর কেবল ‘রোহিঙ্গারা ফিরবে কিনা’-তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কীভাবে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটকে সামাল দিয়ে নিজের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখবে।
রাষ্ট্র যদি এখনই সমন্বিত ও দূরদর্শী পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই নীরব সংকট একদিন উচ্চকণ্ঠ হয়ে উঠতে পারে-যার প্রতিধ্বনি শুধু সীমান্তে নয়, রাষ্ট্রের নানা স্থানে ও নানা পর্যায়ে এবং ভেতরে ও বাইরে শোনা যাবে।
তাছাড়া, ‘রোহিঙ্গারা ফিরবে কিনা’-এই প্রশ্নের উত্তর আজ অনেকটাই মিয়ানমারের রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বাস্তবতা যদি হয় এমন যে, তারা ফিরছে না বা ফিরতে পারছে না, বরং ধীরে ধীরে সংখ্যায় বাড়ছে-তাহলে বাংলাদেশের সামনে একটি দীর্ঘস্থায়ী, বহুমাত্রিক চাপ ও সংকট তৈরি হবে।
প্রথমত, কক্সবাজার অঞ্চলে জনসংখ্যার ঘনত্ব অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে স্থানীয় সমাজ-অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করবে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমতে থাকলে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর ব্যয়ভার ক্রমেই বাংলাদেশের ওপর এসে পড়বে। তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান শিবিরভিত্তিক অপরাধ, সীমান্ত পাচার ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াতে পারে, যার প্রভাব দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ পুরো দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়বে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, স্থানীয় জনগণ ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে নীরব অসন্তোষ ও প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে-যা দৃশ্যমান সংঘাতে রূপ না নিলেও একটি অস্থির সামাজিক বাস্তবতা তৈরি করবে। একই সঙ্গে কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও এটি বাংলাদেশের জন্য একটি স্থায়ী চাপ হয়ে থাকবে, যেখানে আন্তর্জাতিক সমর্থন ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হবে।
অতএব, প্রশ্নটি এখন দুই ভাগে প্রসার লাভ করেছে। একদিকে, ‘তারা ফিরবে কিনা’ এবং অন্যদিকে, ‘তারা না ফিরলে, বাংলাদেশ কীভাবে এই দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতা সামাল দেবে‘-এই উভয় চিত্রই উদ্বেগজনক। উভয় চিন্তাই নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে আসা উচিত। উভয় প্রশ্নকে সামনে রেখেই দেশের রাজনীতি, কূটনীতি ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো দূরদৃষ্টির আলোকে বিবেচনা করা দরকার।
লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।
[email protected]

মোঃ আব্দুর সবুর
৩ মাস আগেলেখাটি পড়ে অত্যন্ত উদ্বেগ জনক মনে হয়েছে। গণতান্ত্রিক সরকারকে অনুরোধ করব এই ব্যাপারে দ্রুতই ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। তা না হলে ভবিষ্যতে সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হানবে এবং দেশে অপরাধচক্র নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে। এই ব্যাপারে সরকারকে relevant all stakeholders উচিত সহযোগিতা করা এবং দ্রুতই ব্যবস্থা নেওয়া। ধন্যবাদ।