রিসেট

নাভালনি এবং রাশিয়ার হারিয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ

প্রকাশিত: ১৯ ফেব্রুয়ারি (সোমবার), ২০২৪ Archive 2022Source: মানবজমিন ডিজিটাল

গত ডিসেম্বরে, যখন আর্কটিক সার্কেলের একটি কারাগারে রুদ্ধদ্বার কক্ষে তিনি শুনানির জন্য দাঁড়িয়েছিলেন তখন মস্কোর একটি আদালত আলেক্সি নাভালনিকে "চরমপন্থার" জন্য অতিরিক্ত ১৯ বছরের কারাদণ্ডের সাজা শোনায়। দুর্বল নাভালনি তখনি বুঝেছিলেন এই সাজা হয়তো তার মৃত্যুর মধ্যে দিয়েই শেষ হবে। নাভালনি গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বন্দীদশাতেই মারা যান যখন দেশের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একটি নতুন উদ্দীপনা নিয়ে প্রেস কনফারেন্স এবং সাক্ষাৎকারে অংশ নিচ্ছিলেন। রাশিয়ান সেনাবাহিনী আরও একবার ইউক্রেনের বিরুদ্ধে জয়লাভ করছিলো এবং ক্রেমলিনের মধ্যে দুর্বলতার কোনো লক্ষণ ছিল না।

নাভালনির উপর রাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান নিপীড়ন ২০১২ সালে পুতিনের প্রেসিডেন্ট পদে ফিরে আসার পর থেকে একটি পূর্ণ প্রসারিত কর্তৃত্ববাদী শাসনের উত্থানকে ত্বরান্বিত করেছে। নাভালনি প্রাথমিকভাবে রাশিয়ান ফেডারেশনের আনুষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে কাজ করার চেষ্টা করেছিলেন। তার লক্ষ্য ছিলো দুর্নীতি বিরোধী, গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা এবং ভবিষ্যতের জন্য সুন্দর রাশিয়া গড়ে তোলার পরিকল্পনা। সরকার প্রাথমিকভাবে নাভালনিকে মস্কোর মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অনুমতি দেয়, এই বিশ্বাস করে যে নির্বাচনে তার অংশগ্রহণ ক্রেমলিনের নিজস্ব প্রার্থী সের্গেই সোবিয়ানিনকে বৈধতা প্রদান করবে। কিন্তু নির্বাচনে নাভালনির আপেক্ষিক সাফল্য (অফিশিয়াল মিডিয়াতে কোনো প্রবেশাধিকার ছাড়াই তিনি ২৭ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন) শাসনকে চিন্তায় ফেলেছিলো এবং পরবর্তী পদক্ষেপটি ছিল নাভালনিকে আত্মসাতের অভিযোগে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করা যাতে তাকে আর নির্বাচনে দাঁড়াতে বাধা দেওয়া হয়। তাকে ২০১৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা থেকে দৃঢ়ভাবে বাধা দেওয়া হয়েছিল।

নাভালনিও অনলাইনে তার প্রচারণা চালিয়েছিলেন এবং লক্ষ লক্ষ অনুসারী সংগ্রহ করেছিলেন। কারণ তিনি ক্রেমলিনের অভিজাতদের মধ্যে জঘন্য দুর্নীতি প্রকাশ্যে এনে দিয়েছিলেন। ২০২০ সালে নাভালনির শরীরে বিষ প্রয়োগ করা হয়। এটি ছিলো পুতিনের অন্যতম সমালোচক রাজনীতিবিদকে হত্যা করার একটি প্রচেষ্টা, যা মস্কের স্থানীয় ডাক্তাররা ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন যারা নাভালনির বিমানটি জরুরি অবতরণ করার পরে জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা প্রদান করেছিলেন। পরবর্তীকালে নাভালনি কোমায় চলে যাবার পর আরও চিকিৎসার জন্য তাকে জার্মানিতে নিয়ে যাবার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তিনি সেখান থেকে রাশিয়ায় ফিরে যাওয়ার অত্যাশ্চর্য সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তার সাহস দেখে অনেকেই তখন অভিভূত হয়েছিলেন। অনেকে তাকে 'বেপরোয়া' হিসেবে চিহ্নিত করেন। সেই থেকে নাভালনি সরকারের কুনজরে পড়েন। বার্লিন থেকে তার ফ্লাইট অবতরণ করার পরে মস্কো বিমানবন্দরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। জার্মান ক্লিনিকে চিকিৎসার সময় তার স্থগিত সাজার শর্তাবলী লঙ্ঘনের জন্য তাকে বন্দি করা হয়। পরবর্তীতে তার কারাদণ্ডের মেয়াদ বাড়ানো হয়, চরমপন্থার অভিযোগে ১৯বছরের জন্য রাশিয়ার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর জেলগুলির মধ্যে একটিতে নিক্ষেপ করা হয় তাকে। সেই কারাগার আর্কটিক সার্কেলের খার্পিনে অবস্থিত 'আইকে-থ্রি' বা "পোলার উলফ" নামে পরিচিত। শেষ রাউন্ডের সাজা হওয়ার পর, নাভালনির ২০৫০সালে ৭৪ বছর বয়সে কারাগার ছেড়ে যাওয়ার আশা করা হয়েছিল। বিচ্ছিন্ন সেলে নাভালনির স্বাস্থ্যের যেটুকু অবশিষ্ট ছিল তারও অবনতি হতে শুরু করে। তার আইনজীবীরা অভিযোগ করেন কারাগারে পর্যাপ্ত চিকিৎসা পরিষেবা দেয়া হচ্ছে না নাভালনিকে।  

ইউক্রেনের পূর্ণ-মাত্রায় আক্রমণের দ্বিতীয় বার্ষিকী যতই এগিয়ে আসছে, বন্দী অবস্থায় নাভালনির মৃত্যুর বার্তা হল যে রাশিয়ায় কেউ নিরাপদ নয়; আইনটি ন্যায়বিচারের নয় বরং নিপীড়নের একটি হাতিয়ার। দেশে বা বিদেশে কোন জনসমর্থনই পুতিন এবং তার কর্মীদের হুমকির হাত থেকে সুরক্ষা প্রদান করবে না। নাভালনি এখন বরিস নেমতসভের পথের পথিক, যিনি একজন সত্যিকারের জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ ছিলেন। যাঁকে ২০১৫ সালে ক্রেমলিন গুলিবিদ্ধ করে হত্যা করে। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে যখন তিনি রাশিয়ায় ফিরে আসেন, তখন নাভালনি জানতেন যে কারাগার থেকে তিনি কখনোই  মুক্ত হতে পারবেন না। রাশিয়ায় ফিরে যাওয়া এবং নিজেকে শাসনের হাতে তুলে দেওয়ার নাভালনির সিদ্ধান্ত সেইসময় কৌশলগত পদক্ষেপ বলে মনে হলেও এটি এখন 'ভয়ানক ত্রুটির' মতো প্রতিভাত হচ্ছে। নাভালনি বিশ্বাস করতেন যে রাশিয়ায় নিপীড়নের বিকল্প হল প্রাসঙ্গিকতাহীন রাজনৈতিক নির্বাসনের জীবন। আজ ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা রাশিয়ান বিরোধী দলগুলির কোলাহল মস্কো থেকে রাজনৈতিক নির্বাসনের প্রমাণ। কারাগারে, কার্যত বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন নাভালনি। তার আইনী দল দ্বারা প্রকাশিত টুইটার থ্রেডগুলি ক্রেমলিন গ্রাফটের এর চাঞ্চল্যকর ভিডিও প্রকাশের একটি দুর্বল বিকল্প ছিল। তবুও নাভালনি বুঝতে পেরেছিলেন যে দেশের কঠোর শাস্তি ব্যবস্থায় তার বেঁচে থাকা রাশিয়ানদের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেবে যে "ভবিষ্যতের সুন্দর রাশিয়া" এখনও সম্ভব।

এমনকি তালাবদ্ধ হয়েও, নাভালনি রাশিয়ার বেশিরভাগ বৈচিত্র্যময় বিরোধী দলগুলির মনে আশা জাগিয়েছিলেন। ২০ বছরেরও বেশি সময়ব্যাপী রাজনৈতিক কর্মজীবনে তিনি বাস্তব দৃষ্টির রাজনীতিবিদ হিসাবে পরিপক্ব হয়েছিলেন। নাভালনি একটি 'রাজনৈতিক ব্র্যান্ড' হয়ে ওঠেন  যাঁর কর্মকাণ্ড মস্কোর বাইরেও অনুরণিত হয়েছিল এবং জনসমর্থন জোগাড়ে সক্ষম হয়েছিলো। প্রশাসনের স্থানীয় দুর্নীতি, দমন-পীড়ন এবং সহিংসতা, রাজনৈতিক স্পেকট্রাম জুড়ে নাভালনির সমর্থকদের জাগিয়ে তুলেছিল। তার মৃত্যু পুতিনের বিকল্প হিসেবে তার অপ্রতিরোধ্য আবেদন এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা উভয়েরই সাক্ষ্য বহন করে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের ফলে ঘরে বসেই সব ধরনের ভিন্নমতের বিরুদ্ধে নৃশংস দমন-পীড়ন সাধারণ বিষয় হয়ে ওঠে। যুদ্ধের বিপক্ষে যে কোনো সমালোচনাকারীকে অপরাধী আখ্যা দেয়া হয়, অসতর্ক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের ফলে চরমপন্থায় বিচার হয়;স্কুলছাত্রদের একে অপরকে এবং তাদের শিক্ষকদের নিন্দা করতে উৎসাহিত করা হয়; ইউক্রেনে রাশিয়ার নব্য-সাম্রাজ্য বিজয়ের যুদ্ধে আনুমানিক মৃতের সংখ্যার পরিসংখ্যান বহনকারী পোস্ট করার জন্য কিশোরদের আটকে রাখা হয়।

ন্যাটোর মনোভাব এখন রাশিয়ার প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ। ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ তার কৌশলগত ব্যর্থতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। রাশিয়ান সৈন্যদের দ্বারা বহন করা হতাহতের ভয়ঙ্কর পরিসংখ্যানগুলো ক্রেমলিন সর্বজনীনভাবে প্রচারের অনুমতি দেয় না। রাশিয়ানদের একাংশ ইউক্রেনকে পরাজিত করার জন্য ক্রেমলিনের "বিশেষ সামরিক অভিযান" নিয়ে উল্লাস করে, সেখানে অন্যরা শুধু যুদ্ধ শেষ করতে চায়। আফগানিস্তান এবং চেচনিয়ার সাম্প্রতিক উদাহরণগুলি আক্রমণ থেকে আসন্ন আঘাতের দিকে ইঙ্গিত করে। কারণ শত সহস্র  ক্ষতিগ্রস্ত যুবক পর্যাপ্ত সংস্থান ছাড়াই বেসামরিক জীবনে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছে। রাশিয়ান সৈন্যদের মায়েদের মনে ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। ক্রেমলিনের বিপর্যয়কর আক্রমণ ব্যাখ্যা করে কেন নাভালনি, এমনকি তার বিচ্ছিন্ন এবং অসুস্থ অবস্থায়ও শাসকের জন্য হুমকি হয়ে রইলেন। কারণ একজন ক্যারিশম্যাটিক রাজনীতিবিদ নাভালনি যুদ্ধের ভয়াবহতাকে নিন্দা করার এবং ভয়ঙ্কর মূল্য প্রকাশ করার ক্ষমতা রাখেন। যে মূল্য আগামী দিনে রাশিয়ানদের চোকাতে হবে।

কয়েক শতাব্দী ধরে, রাশিয়ান রাষ্ট্রের বিরোধীরা দেখিয়েছে যে শহীদদের মৃত্য, তাদের যন্ত্রণা একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিভাত হয়। ২০২২ সালে হত্যার ঝুঁকি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে, নাভালনি ভেবেছিলেন যে তার মৃত্যুকে একটি প্রতীক হিসাবে ধরা হবে যে 'ক্রেমলিন দুর্বল এবং এর বিরোধীরা শক্তিশালী'। কিন্তু হাল ছাড়লে চলবে না। নাভালনির জীবন ব্যক্তিগত সাহস এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি প্রমাণ। তবে এখন দেখার তার মৃত্যু রাশিয়ান বিরোধীদের বিক্ষিপ্ত শক্তিকে শক্তিশালী করবে, নাকি তাদের নিশ্চিত পরাজয়ের মুহূর্তটিকে আরো স্পষ্ট করবে।