রিসেট

পাকিস্তানে কোয়ালিশনের তোড়জোড়

প্রকাশিত: ১১ ফেব্রুয়ারি (রবিবার), ২০২৪ Archive 2022Source: মানবজমিন ডেস্ক

সরকার গঠন করতে পারেন বা না পারেন- ম্যাজিক দেখিয়েছেন কারারুদ্ধ সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তিনি আরও একবার প্রমাণ দিয়েছেন নিজের জনপ্রিয়তা। তাই তো তার দল পাকিস্তান
তেহরিকে ইনসাফ (পিটিআই) সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সব রাজনৈতিক দলকে পেছনে ফেলে শীর্ষ জনপ্রিয়তা প্রদর্শন করেছেন। বৃহস্পতিবার নির্বাচন হয়ে গেলেও শনিবার পর্যন্ত যেসব ফল পাওয়া গেছে তাতে পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জাতীয় পরিষদে ৯৫ আসনে বিজয়ী হয়েছেন। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএলএন)। তারা পেয়েছে ৭৪ আসন। অন্যদিকে ঐতিহ্যবাহী পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) পেয়েছে ৫৪টি আসন। অন্যান্য দল অল্প আসনে বিজয়ী হয়েছে। নির্বাচনে কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। পিটিআই অভিযোগ করেছে, ভোটে জালিয়াতি হয়েছে। তাদের আসন কেড়ে নেয়া হয়েছে। তা নাহলে তারা ১৭০ আসনে বিজয়ী হয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতো। কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় এখন জোট সরকার গঠনের তোড়জোড় চলছে। পিটিআই যেমন সরকার গঠনের জন্য বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করছে, তেমনি পিএমএলএন এবং পিপিপি মিলে জোট গঠনের চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে যেহেতু পিটিআইয়ের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সবচেয়ে বেশি আসনে বিজয়ী হয়েছেন, সেহেতু সরকার গঠনের জন্য তাদের অগ্রাধিকার থাকার কথা। 

এ প্রেক্ষাপটে ইমরান খানের অন্যতম এক সহযোগী বলেছেন, তারা সরকার গঠন করতে চান। তবে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ না করলে সমর্থকদের তারা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করার আহ্বান জানিয়েছেন। জোট সরকার গঠন নিয়ে পিএমএলএন এবং পিপিপি’র নেতাদের মধ্যে শনিবার বিভিন্ন সময়ে শীর্ষ পর্যায়ে বৈঠক হয়েছে। খবরে বলা হয়েছে, তারা জোট সরকার গঠনে একমত হয়েছেন। কিন্তু পিপিপি’র অন্যতম নেতা খুরশিদ শাহ জানিয়েছেন নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হতে চান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি। যদি নওয়াজ শরীফ প্রধানমন্ত্রী হতে চান, তাহলে এই জোটে যোগ দেবে না পিপিপি। অন্যদিকে নির্বাচনের আগে থেকেই প্রধানমন্ত্রী পদের দিকে দৃষ্টি নওয়াজ শরীফের। তিনি লন্ডনে নির্বাসনে থাকার সময় থেকেই তার দল পিএমএলএন এবং এর তখনকার প্রেসিডেন্ট শেহবাজ শরীফ জানিয়েছেন, নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হবেন নওয়াজ শরীফ। ফলে গতকাল এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দল দুটির মধ্যে এই প্রধানমন্ত্রী পদ নিয়ে সংকট আটকে ছিল। 

দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী এই দেশটিতে বৃহস্পতিবার নির্বাচন হয়। যখন দেশ অর্থনৈতিক সংকট এবং উগ্রপন্থিদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে মারাত্মক রাজনৈতিক মেরূকরণ করা এক পরিবেশে, তখন এই নির্বাচন হলো। শুক্রবার পূর্ণাঙ্গ ফল ঘোষণা না হলেও নিজেদেরকে বিজয়ী ঘোষণা করেন ইমরান খান ও নওয়াজ শরীফ। পিটিআইয়ের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গওহর খান। তিনি একই সঙ্গে ইমরান খানের আইনজীবীও। তার দলের প্রতি পাকিস্তানের জনগণ যে ম্যান্ডেট দিয়েছে তার প্রতি সম্মান দেখাতে পাকিস্তানের সব প্রতিষ্ঠানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন- যদি শনিবার রাতের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ফল প্রকাশ করা না হয়, তাহলে রোববার দেশ জুড়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের অফিসের বাইরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বিক্ষোভ করবে তার দল। এরই মধ্যে নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য শনিবার দেশবাসীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন সেনাপ্রধান জেনারেল অসিম মুনির। 

তিনি সবাইকে এক হয়ে দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। 
ওদিকে নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করার আহ্বান জানিয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও অস্ট্রেলিয়া। নির্বাচনের সুষ্ঠুতা এবং সবার অংশগ্রহণ হয়নি বলে মারাত্মক উদ্বেগ জানিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী  ডেভিড ক্যামেরন। শনিবার এর পাল্টা জবাব দিয়েছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারা বলেছে, পাকিস্তানে সফলভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে এ নিয়ে যে অবিশ্বাস্য কথা তারা বলেছে পাকিস্তান তা উপেক্ষা করে। নাইজেরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট গুডলাক জোনাথনের নেতৃত্বে কমনওয়েলথের একটি পর্যবেক্ষক দল পাকিস্তানের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছে। তিনি নির্বাচনের আগে বলেছেন, আমাদের আশা হলো একটি কার্যকর নির্বাচন হবে। তাতে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে। 

নওয়াজ শরীফের পিএমএলএন দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে নির্বাচনে। তিনি বলেছেন, অন্য দলগুলোর সঙ্গে তারা জোট সরকার গঠনের আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। পক্ষান্তরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে জেল থেকে একটি অডিও-ভিজ্যুয়াল বার্তা প্রচার করেছেন ইমরান খান। এক্সে দেয়া বার্তায় নওয়াজ শরীফ যে বিজয়ী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তা প্রত্যাখ্যান করেছেন ইমরান খান। তিনি সমর্থকদের বিজয় উদ্‌যাপনের আহ্বান জানিয়েছেন। দলের বিরুদ্ধে দমনপীড়ন চালানোর পরও তিনি দলের বিজয় দাবি করেছেন। ইমরান খানকে দুর্নীতির মামলা থেকে বেআইনি বিবাহের জন্য জেল দেয়া হয়েছে। কিন্তু জেল থেকেই তিনি যেন জাদুকরী শক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছেন। নির্বাচনে প্রায় ১০০ স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। এর মধ্যে অল্প কয়েকজন বাদে সবাই ইমরান খানের দলের। এ কথা বলেছে অলাভজনক নির্বাচনী পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশন নেটওয়ার্ক। ইমরান খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও মিডিয়া উপদেষ্টা জুলফি বুখারি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, তারা তাদের দলের ব্যানারে অন্য স্বতন্ত্র প্রার্থীদের যোগ দেয়ার আহ্বান জানাবেন। কিন্তু পাকিস্তানে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নিজেদের মতো সরকার গঠন করতে পারেন না। তাদেরকে সরকার গঠন করতে হলে কোনো একটি দলে যোগ দিতে হয়। বুখারি বলেছেন, ইমরান খানের পিটিআইয়ের ব্যানারে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিষয়ে ঘোষণা দেয়া হবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। 

তিনি বলেন, নিরপেক্ষ স্বতন্ত্ররা অন্য কোথাও যোগ দিচ্ছে এমন কোনো আতঙ্ক নেই আমাদের। তারা সেইসব মানুষ, যারা গত দেড় বছর লড়াই করেছেন। সব রকম নির্যাতন ও নিষ্পেষণ সহ্য করেছেন। ওদিকে নির্বাচনে পাঞ্জাব প্রাদেশিক পরিষদে পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন ১১৬ আসনে। পিএমএলএন পেয়েছে ১৩৮ আসন। পিপিপি পেয়েছে মাত্র ১০টি। সিন্ধু প্রদেশে পিটিআইয়ের প্রার্থীরা পেয়েছেন ১১ আসন। এ প্রদেশে পিএমএলএন কোনো আসনই পায়নি। পিপিপি পেয়েছে ৮৩ আসন। বেলুচিস্তান প্রদেশে পিটিআই প্রার্থীরা কোনো আসন পান নি। পিএমএলএন পেয়েছে ১০ আসন। পিপিপি পেয়েছে ১১ আসন। অন্যদিকে খাইবার পখতুনখাওয়া প্রদেশে পিটিআই পেয়েছে ৮০ আসন। পিএমএলএন পেয়েছে ৫ আসন। পিপিপি পেয়েছে ৪টি আসন। এখানে উল্লেখ্য, নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর রাজনৈতিক দলগুলো সরকার গঠনের জন্য তিন দিন বা ৭২ ঘণ্টা সময় পায়। সেই সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। এর মধ্যে অনেক নাটকীয় ঘটনার জন্ম দিতে পারে পাকিস্তান। নির্বাচনের দু’দিন পরে শনিবার ইমরান খানকে ১৩ মামলায় জামিন দিয়েছে আদালত। তবে তিনি কারাগার থেকে বের হতে পারবেন কিনা তা নিশ্চিত নয়।