টাঙ্গাইল শাড়িকে নিজেদের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিতে গিয়ে ভারত
অর্ধসত্য, বিভ্রান্তিকর ও তথ্যের অপব্যবহার এবং প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। বলেন, বাংলাদেশর উচিত দ্রুত এ বিষয়ে ভারতের আদালতে মামলা করা। ভারতের নিজস্ব জিআই আইনে সেই মামলা করার সুযোগ আছে। সেটা তিন মাসের মধ্যে করতে হবে। ভারত যেসব যুক্তিতে টাঙ্গাইল শাড়িকে জিআই করেছে, সেগুলো তথ্যনির্ভর নয়। যেগুলো ধোপে টিকবে না। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের পাল্লাই ভারী। কিন্তু সেটাকে কাজে লাগাতে হবে। তাই একজন ভালো আইনজীবী নিয়োগ করে আইনি পথে হাঁটতে হবে। কারণ এখন আর নেগোসিয়েশনের সুযোগ নেই। গতকাল রাজধানীর ধানমণ্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে ‘টাঙ্গাইল শাড়িকে পশ্চিমবঙ্গের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি: প্রক্রিয়া, পরিস্থিতি ও বাংলাদেশের করণীয়’- শীর্ষক সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সঞ্চালনায় উপস্থিত ছিলেন, সিপিডি’র সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান ও সিপিডি’র প্রোগ্রাম এসোসিয়েট নাইমা জাহান তৃশা। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এ-ও মনে করিয়ে দেন টাঙ্গাইল শাড়িকে ভারতের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির উদ্যোগ নেয়া হয় ২০২০ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর। প্রশ্ন রাখেন- দীর্ঘ এ সময়ে বাংলাদেশের হাইকমিশন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো কী করেছে? তিনি বলেন, শুধু সরকার নয়, উৎপাদক কিংবা ব্যবসায়িক গোষ্ঠীরও কেউ প্রশ্ন তোলেনি। এটা আমাদের অজ্ঞতা ও ব্যর্থতা। এ সময় ভারতে টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই আবেদনের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সেখানে বলা হয়েছে, দেশভাগের সময় টাঙ্গাইল থেকে হিন্দুদের তন্তুবায় সমপ্রদায় দেশত্যাগ করে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় যায়। তারাই এই শাড়ি বানানোর সঙ্গে জড়িত। বাস্তবে টাঙ্গাইল অঞ্চলে দীর্ঘসময় ধরে শুধু হিন্দু নয়, মুসলিম সমপ্রদায়ের অনেকে এই শাড়ি বানায়। হিন্দুদের চেয়ে এই শাড়ি উৎপাদনের সঙ্গে মুসলিমরাই বেশি জড়িত।
তিনি বলেন, কোনো পণ্যের জিআই স্বীকৃতির জন্য তার ভৌগোলিক উৎস, মান এবং সুরক্ষার বিষয় জড়িত। টাঙ্গাইল শাড়ি তৈরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অনেকেই দেশ বিভাগের সময় পশ্চিমবঙ্গ চলে গেছেন। কিন্তু এই শাড়ির ভৌগোলিক পরিচয় তো তাতে পাল্টে যেতে পারে না। ভারতে এই শাড়িকে জিআই করতে গিয়ে প্রতারণামূলক তথ্যের ওপর আশ্রয় নেয়া হয়েছে। এদিকে ভারত টাঙ্গাইল শাড়িকে জিআই স্বীকৃতি দেয়ার পর সাধারণ মানুষের তোপের মুখে গত ৬ই জানুয়ারি টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে টাঙ্গাইল শাড়ির জিআইয়ের আবেদন করা ও সেদিনই এটি গ্রহণ করে অনুমোদন গেজেটের জন্য বিজি প্রেসে পাঠানোয় প্যাটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের (ডিপিডিটি) সমালোচনা করেন অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
তিনি বলেন, ভারতে টাঙ্গাইল শাড়িকে জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধনের জন্য আবেদন হয়েছে ২০২০ সালে। এরপর চার বছর চলে গেছে। এসব তথ্য ওয়েবসাইটেই ছিল। কিন্তু এতদিন ধরে আমাদের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো কী করলো? এখন যেভাবে তাড়াহুড়া করে এর জিআই করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তা অমূলক। এত তাড়াহুড়ায় আমরা আবার ভুল করে বসতে পারি। তিনি বলেন, প্রতি সপ্তাহে বাংলাদেশ থেকে ৫০ হাজার পিস টাঙ্গাইল শাড়ি ভারতে যায়। আর টাঙ্গাইল শাড়ির স্বত্ব যদি তারাই দাবি করে তাহলে আমার ব্যবসাটা কই গেল। যেহেতু আমাদের এখানে সাংস্কৃতিক বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গে সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। ভারতের এমন স্বীকৃতির মাধ্যমে আমাদের তাঁতীরা অর্থনৈতিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। এর সঙ্গে বস্তুনিষ্ঠ ও অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত রয়েছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন- কেন বাংলাদেশের ২১টি জিআই পণ্যের তালিকায় এতোদিনেও টাঙ্গাইল শাড়িকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কেন আমরা কাজ করিনি। আমাদের এ ধরনের কাজ শুধু জিআই’র ক্ষেত্রে নয়, অন্য অনেক ক্ষেত্রেও হতে পারে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, শ্যাম্পেইন যে রকম একটি গ্রামের নামেই তৈরি হয়। যে নামে ফ্রান্সের ওই নির্দিষ্ট এলাকা ছাড়া অন্য কেউ তৈরি করতে পারে না টাঙ্গাইল শাড়িও তেমন। আপনি অন্য কোনো নামে এ শাড়ি তৈরি করে চালান কোনো আপত্তি থাকবে না। কিন্তু আপনি টাঙ্গাইল শাড়ি নাম ব্যবহার করতে পারবেন না। এ সময় তিনি উদ্ভূত পরিস্থিতিতে একটি টাস্কফোর্স গঠন করার পরামর্শ দেন। বলেন, যেহেতু চেতনা, উদ্যোগ ও সংগঠনের অভাব রয়েছে তাই আমি প্রস্তাব করেছি একটি টাস্কফোর্স গঠন করার। এটা একক কোনো শৃঙ্খলার অফিসার দিয়ে পারবেন না। এটার ঐতিহ্যজ্ঞান, নৃ-তত্ত্বজ্ঞান, ইতিহাস ও সংস্কৃতির জ্ঞান থাকা জরুরি। এখানে অর্থনীতিবিদ, বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ, উৎপাদক শ্রেণিকে যুক্ত করতে হবে। কারণ এলডিসি থেকে উত্তরণসহ সবকিছুর সঙ্গে জিআই স্বত্ব জড়িত।
এ অর্থনীতিবিদ বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের কিছু সমনামী এবং অভিন্ন পণ্য আছে। ঢাকাই মসলিনকে ভারত বাংলার মসলিন বলে জিআই স্বীকৃতি দিয়েছে। এছাড়াও আরও অনেক পণ্য রয়েছে। এসব পণ্যের জিআই নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে বাংলাদেশকে এগোতে হবে। এ সময় তিনি এসব পণ্যের ন্যায্য সুরক্ষার জন্য বেশকিছু আন্তর্জাতিক আইনের উল্লেখ করেন। এর মধ্যে আছে প্যারিস কনভেনশন ফর দ্য প্রোটেকশন অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোপার্টি (১৮৮৩), মাদ্রিদি এগ্রিমেন্ট অন ইনডিকেটর অব সোর্স (১৮৯১), লিসবনি এগ্রিমেন্ট ফর দ্য প্রোটেকশন অব অরিজিন অ্যান্ড দেয়ার ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন (১৯৫৮) এবং ডব্লিউটিও’র বাণিজ্য-বিষয়ক মেধাস্বত্ব আইন (ট্রিপস-১৯৯৪)। পরামর্শ দেন অতিদ্রুত লিসবন চুক্তিতে সই করার। সভায় প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শুধু প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণে মেধাস্বত্ব সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সালিশে হার-জিত নির্ধারিত হয়। তাই আমাদের সাবধানে এবং দক্ষতার সঙ্গে এগোতে হবে।
