রিসেট

নতুন নির্বাচনের আহ্বান ছয় সংগঠনের, বাংলাদেশের প্রত্যাখ্যান

প্রকাশিত: ১৪ জানুয়ারি (রবিবার), ২০২৪ Archive 2022Source: কূটনৈতিক রিপোর্টার

সদ্যসমাপ্ত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হয়নি দাবি করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন দেয়া ও রাজবন্দিদের মুক্তির আহ্বান জানিয়ে যৌথ বিবৃতি দিয়েছে ছয়টি আন্তর্জাতিক সংস্থা। তবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এমন বিবৃতি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাল্টা বিবৃতিতে বলেছে, ছয় সংগঠনের যৌথ বিবৃতি অযৌক্তিক, অগ্রহণযোগ্য এবং পক্ষপাতদুষ্ট। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে। এর আগে গত শুক্রবার নির্বাচন নিয়ে এক যৌথ বিবৃতি দেয়- এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশন্স (এএনএফআরইএল), ওয়ার্ল্ড অ্যালায়েন্স ফর সিটিজেন পার্টিসিপেশন (সিআইভিআইসিইউএস), ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস (এফআইডিএইচ), এশিয়ান ডেমোক্রেসি নেটওয়ার্ক (এডিএন), ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট জাস্টিস প্রোজেক্ট (অস্ট্রেলিয়া) ও অ্যান্টি-ডেথ পেনাল্টি এশিয়া নেটওয়ার্ক (এডিপিএএন)। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এমন বহু খবর ও তথ্য-প্রমাণ আছে, যেগুলো নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনের দিন ব্যাপক অনিয়মের চিত্র দেয়। এর মধ্যে ভোটারদের চাপ প্রয়োগ এবং ভোটের ফলাফলে কারচুপির মতো বিষয়ও রয়েছে। এগুলো গুরুতরভাবে গণতন্ত্রের মূল নীতিসমূহ ক্ষুণœ করে। নির্বাচন সামনে রেখে বেপরোয়াভাবে বিরোধীদের কণ্ঠরোধ এবং রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনের ঘটনা ছিল উদ্বেগজনক। ভয় দেখানো, পরোয়ানা ছাড়া হয়রানি, মিথ্যা অভিযোগে বহু মানুষকে আটক এবং বিরোধী রাজনীতিক ও দলগুলোর সমর্থকদের ওপর পরিচালিত সহিংসতা একটি বিশৃঙ্খল নির্বাচনী পরিবেশের চিত্র দেয়। এটি কর্তৃপক্ষের নিপীড়নের কারণেই সম্ভব হয়ে থাকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো দেশ জুড়ে বিরোধী নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ধরপাকড় করে। সভা-সমাবেশের স্বাধীনতার অধিকার, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা শুধু সরকারপন্থি দল, সংগঠন ও ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে রক্ষিত হয়েছে। পক্ষান্তরে বিরোধী নেতাকর্মী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ক্ষেত্রে এসব মৌলিক অধিকার প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে ধারাবাহিকভাবে সীমিত রাখা হয়েছিল। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাম গণতান্ত্রিক জোট, গণতন্ত্র মঞ্চসহ প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল ও জোটগুলো নির্বাচন বর্জন করেছে। নির্বাচন কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে পক্ষপাতমূলক অবস্থান, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সুস্পষ্ট পক্ষপাত এবং বিরোধী নেতাকর্মীদের দমনপীড়নের কারণে তারা নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। একই ধরনের উদ্বেগ ও বিষয়াবলীর কারণে প্রার্থী একটি বড় অংশ প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচন কমিশন ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে যে তথ্য দিয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সারা দেশের ভোটকেন্দ্রগুলোতে থেকে যেসব খবর পাওয়া গেছে এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা যেসব তথ্য দিয়েছেন, তাতে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের মানুষ এমন একটি নির্বাচন প্রক্রিয়া পাওয়ার অধিকারী, যেটা স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক হবে এবং যে নির্বাচনের মাধ্যমে সম্মিলিতের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটবে, যে নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি সবাই শ্রদ্ধা ও আস্থা রাখবে। একটি অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমরা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করছি। আমরা বাংলাদেশের সরকারের প্রতি একটি অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য পদক্ষেপ নিতে জোরালো আহ্বান জানাচ্ছি। আর এই নির্বাচন হতে হবে সব রাজনৈতিক দলের মতৈক্যের ভিত্তিতে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থাপনা সংস্থা ও একটি নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে। ছয় সংস্থার এমন বিবৃতির পাল্টায় গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বিবৃতিতে উত্থাপিত অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। অবাধ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন পরিচালনার জন্য ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বিভিন্ন দেশ ভূয়সী প্রশংসা করেছে এবং নতুন সরকারকে স্বাগত জানিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, নতুন করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আহ্বান অযৌক্তিক এবং অগ্রহণযোগ্য। এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত অবাধ, সুষ্ঠু, স্বচ্ছ, উৎসবমুখর পরিবেশে এবং জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২৮টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মোট ১ হাজার ৫৩৪ জন প্রার্থী এবং ৪৩৬ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। এ নির্বাচনে কোনো কোনো জায়গায় বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় ভোট প্রদানের হার ৭০ শতাংশ বা তার চেয়েও বেশি ছিল। তবে, শহর এলাকায় তুলনামূলকভাবে কম ভোটার উপস্থিতির কারণে সারা দেশে গড় ভোটের হার ছিল ৪১ দশমিক ৮ অর্থাৎ প্রায় ৪২ শতাংশ। স্বাধীন নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনা করেছে। নির্বাচনের আগে বিএনপি’র সহিংসতা এবং নির্বাচন বানচাল করার হুমকি সত্ত্বেও হাতেগোনা কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া ভোটের দিনটি ছিল শান্তিপূর্ণ এবং উৎসবমুখর। আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক এবং সাংবাদিক, যারা সক্রিয়ভাবে মাঠ থেকে নির্বাচনের প্রতিবেদন করেছেন, তারা তাদের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ার এর সত্যতা প্রকাশ করেছেন। বিবৃতি মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নির্বাচনকে সামনে রেখে সংযম এবং আইনি সীমানা মেনে সহিংসতার ঘটনাগুলোর মোকাবিলা করেছেন। রাজনৈতিক কারণে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। নির্বাচন বানচালের জন্য যারা মানুষ ও যানবাহনে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করেছে, আগুন দিয়েছে, মানুষকে হত্যা ও আহত করেছে এবং জনজীবন ব্যাহত করেছে তাদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে এবং সকল নাগরিকের অধিকার রক্ষার জন্য এই পদক্ষেপগুলো প্রয়োজনীয় ছিল। তাই ছয় সংস্থার যৌথ বিবৃতি বিভ্রান্তিকর, একতরফা এবং অগ্রহণযোগ্য। গণতন্ত্রবিরোধী ও নির্বাচনবিরোধী শক্তি যারা নির্বাচনকে বানচাল করার অপচেষ্টা করেছিল তাদেরকে উৎসাহিত করার জন্য একটি বিবৃতি উদ্দেশ্যমূলকভাবে জারি করা হয়েছে বলে সরকারের কাছে প্রতীয়মান।