গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, দেশে আয় বেড়েছে দ্বিগুণ। একইসঙ্গে বেড়েছে বৈষম্যও দেখার বিষয় হলো- আয় বৈষম্যের চেয়ে সম্পদ বৈষম্য বেড়েছে দ্বিগুণ হারে। আয় বৈষম্য ১.৪ শতাংশ হলেও সম্পদ বৈষম্য বেড়েছে ৩ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ সম্পদের বৈষম্য ক্রমান্বয়ে ঘনীভূত হচ্ছে। এ বৈষম্য কয়েকগুণ হারে বাড়ছে। বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে সিপিডি আয়োজিত ‘স্টেট অ্যান্ড স্কোপ অব প্রপার্টি ট্যাক্সেশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সংলাপে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরে ড. দেবপ্রিয় এই তথ্য জানান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। সংলাপে অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর, সংসদ সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী, সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ, সিপিডি’র বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, দেশের জিডিপি যদি ১ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তাহলে সম্পদ কর ০.৪ শতাংশ বাড়ার কথা। আর যদি জিডিপি ৬ শতাংশ ও মুদ্রাস্ফীতি ৬ শতাংশ হিসাবে যোগ করে ১২ শতাংশ বৃদ্ধি বিবেচনা করি, তাহলে সম্পদ কর ৬ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। সেটা আমরা পাইনি। উন্নয়নশীল দেশ বিবেচনায় আফ্রিকার সম্পদ কর ০.৩ শতাংশ, আমরা সেখান থেকেও পিছিয়ে আছি। অথচ আমাদের দেশের আয় আফ্রিকার দেশগুলোর চেয়ে বেশি। ফলস্বরূপ, সামাজিক বৈষম্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
আলোচনায় বক্তারা জমি পতিত না রেখে উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। যদি তা না হয়, তবে তারা এই ধরনের জমিতে প্রযোজ্য করের হার বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। বক্তারা বলেন, গত এক দশক ধরে কর-জিডিপি’র অনুপাত ৭-৮ শতাংশের মধ্যেই রয়েছে। বাজেট ঘাটতি কমাতে এই অনুপাত আরও বাড়ানো প্রয়োজন। কর ফাঁকি, করের আওতা বৃদ্ধি করতে না পারা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতার কারণে রাজস্ব আদায় বাড়ছে না।
সিপিডি’র গবেষণা বলছে, দেশের রাজস্ব আয়ের ৫৫ শতাংশ আসে পরোক্ষ কর থেকে। গত ৫ বছর প্রত্যক্ষ কর ৩৩ শতাংশের ঘরে আটকে আছে। সম্পদ থেকে রাজস্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এটাকে কাজে লাগানো প্রয়োজন। তাই প্রত্যক্ষ কর আদায়ের জন্য নতুন নতুন খাত সন্ধান করতে হবে।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, আইএমএফের শর্ত পূরণ করতেও রাজস্ব খাতে সংস্কার প্রয়োজন। এলডিসি গ্রাজুয়েশন এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, দেশে প্রকৃতপক্ষে প্রত্যক্ষ কর মাত্র সাড়ে ৪ শতাংশ। এর বড় অংশ ভূমি উন্নয়ন কর। প্রত্যক্ষ কর না বাড়ার কারণে আয় বৈষম্য বাড়ছে। বাংলাদেশে আয় বৈষম্যের চেয়ে সম্পদের বৈষম্য দ্বিগুণ হারে বেড়েছে। একটি প্রজন্ম সম্পদ আয় করে ও পরবর্তী প্রজন্ম তা ভোগ করে। তাই সেখানে সম্পদের বৈষম্য হ্রাস করে ন্যায্যতা নিয়ে আসতে হবে। ওই বৈষম্য হ্রাস ও রাজস্ব আদায়ে বাংলাদেশে উত্তরাধিকার কর প্রচলন অত্যন্ত প্রয়োজন।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, সম্পদ করের ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে। জমি ও বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্টের ক্ষেত্রে যথাযথভাবে কর আরোপ হচ্ছে না। এখানে বৈষম্য রয়েছে। জমির ওপর বিনিয়োগ বাড়ছে, কারণ জমির দাম অস্বাভাবিকহারে দাম বাড়ছে। এটার বড় কারণ এই বিনিয়োগে বড় ধরনের কর দিতে হয় না। ড. মনসুর জানান, তিনি দুবাই, সৌদি আরবে দেখেছেন সেখানে জমি কিনে কেউ ফেলে রাখে না, বা রাখার সুযোগ নেই। কারণ অনুৎপাদনশীল জমির উপর সেখানে উচ্চহারে ট্যাক্স আরোপ করা আছে। অথচ আমরা যদি পূর্বাচলের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই শত শত প্লট ফাঁকা পড়ে আছে। এতে অর্থ অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হচ্ছে, দেশের অর্থনীতি উপকৃত হচ্ছে না। জমি কিনে ফেলে রাখলে বাড়তি ট্যাক্স আরোপ করার সুপারিশ করেছেন তিনি। তাহলে জমির দামও অস্বাভাবিক হারে বাড়বে না। কারণ ট্যাক্সের চাপে আর কেউ জমি ফেলে রাখতে চাইবে না।
জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, কর্মসংস্থান ও করবিহীন উন্নত দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ, যেটা আসলে বেশি দিন সাসটেইন করবে না। আসলে দেশ ঋণ নির্ভরশীল অনুন্নত অর্থনীতি হচ্ছে। তিনি বলেন, যে দেশে গণতন্ত্র নেই, সুশাসন ও ভালো সেবা নেই, যে দেশের আমলা ও রাজনীতিবিদরা টাকা পাচার করে বিদেশে বাড়ি গাড়ি বানিয়েছে, যে দেশে ব্যাংক লুট হয় সেখানে কর আহরণ কম হবে, এটাই স্বাভাবিক।
ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী বলেছেন, গত এপ্রিলের ১৪ তারিখ থেকে ভূমিকর সম্পূর্ণভাবে অনলাইন মাধ্যমে আদায় শুরু হয়েছে। এরপর মাত্র এক মাসে কর আদায় হয়েছে ৩২৬ কোটি টাকা। অথচ আগে পুরো অর্থবছরে ৮০০ কোটি টাকার কাছাকাছি ভূমিকর আদায় হতো। অনলাইনে ভূমিকর আদায়ের ব্যবস্থা চালু করার কারণেই এমনটা সম্ভব হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
