পল্টন ময়দান। রাজনৈতিক স্মৃতিময় এক মুক্ত মাঠ। বহু মিছিল, মিটিং ও সংগ্রামের সাক্ষী এ ময়দান। এক সময় পল্টন ময়দান দেশে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রাণকেন্দ্র ছিল। তবে ঐতিহাসিক এ ময়দান এখন হারিয়ে গেছে। পল্টন ময়দান এখন খেলার মাঠ হয়ে গেছে। ৯০ দশকের বিশাল ময়দান দিন দিন ছোট হতে হতে মধ্যম সারির মাঠ হয়ে গেছে। নামে এখনো পল্টন ময়দান থাকলেও ধুলোবালি ও দখলে তা যৌবন হারিয়েছে। পল্টন ময়দান থেকে রাজনীতি বিদায় নিয়েছে। এখন আর কেউ সেখানে যান না। কারণ ময়দানের বুক চিরে গড়ে উঠেছে একের পর এক সুবিশাল স্থাপনা। নানা ফেডারেশনের ভবন নির্মাণের কাজ এখনো চলমান। বর্তমানে এখানে আর মিছিল মিটিং করার পরিবেশও নেই। প্রতিদিনই এ মাঠে ফুটবল, ক্রিকেট, রাগবি কত কী খেলা হয়। বলতে গেলে দিনভরই কোনো না কোনো খেলা চলে পল্টন ময়দানে। গত এক দশকে খেলাধুলার অবকাঠামোতে ফাঁকা ময়দানটি এখন চতুর্দিকে ঘেরা এক আবদ্ধ জায়গা। পুরো ময়দানের চারপাশে তৈরি স্থাপনা। মাঠের পূর্বপাশে নেটে ঘেরা ক্রিকেট অনুশীলন ইউনিট নির্মাণ করেছে। পুরো ময়দানটি নিজেদের অনুশীলনের কাজে ব্যবহার করছেন। শেখ রাসেল ক্রিকেট একাডেমির নামে সাইনবোর্ডও রয়েছে সেখানে।
সরজমিন দেখা যায়, মাঠের চারদিকে লোহার গ্রিলে ঘিরে ফেলা হয়েছে। মাঠে ক্রিকেটের অনুশীলন চলছে। ময়দানের পশ্চিমপাশে গড়ে উঠেছে সুবিশাল শেখ রাসেল রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্স। এর পাশে অল্প জায়গা নিয়ে নার্সারি করা হয়েছে। দক্ষিণে যেখানে জনসভার মঞ্চ বানানো হতো সেখানে কিছু অংশ নিয়ে দক্ষিণের সীমানা পর্যন্ত গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ অ্যামেচার বক্সিং ফেডারেশন। এর পাশেই নতুন করে গড়ে উঠেছে বিশাল আকৃতির বাংলাদেশ ব্যাডমিন্টন ফেডারেশন ও শহীদ তাজউদ্দিন আহম্মেদ ইনডোর স্টেডিয়াম। বছর দুয়েক আগে অল্প জায়গায় গড়ে ওঠা অলিম্পিক ফেডারেশনও নিজের আঙিনা বাড়িয়েছে। উত্তর-পূর্ব কোণে গড়ে উঠেছে হ্যান্ডবল ফেডারেশন ও নার্সারি। রাস্তার দক্ষিণ অংশ ব্যবহার হচ্ছে গাড়ি পার্কিংয়ে। পূর্বপাশজুড়েই কার্পেটিং করে ক্রিকেট অনুশীলনের মাঠ তৈরি করা হয়েছে।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর পল্টন ময়দানে বড় কোনো জনসভা হয়েছে কি-না, সে তথ্য জানাতে পারেননি ময়দানঘেঁষা দোকানদাররা। তারা বলেছেন, তার পর থেকে আওয়ামী লীগের বড় সমাবেশগুলো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই হচ্ছে। আর বিএনপি সোহরাওয়ার্দী ও নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় সভা-সমাবেশ করছে।
পুরানাপল্টন মোড় থেকে রিকশাচালক মোসলেম উদ্দিনকে পল্টন ময়দান কোন দিকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, পল্টন ময়দান চিনেন না, এটা নয়াপল্টন বিএনপি’র অফিসের কাছে। ওখানে সব সময় পুলিশ থাকে মামা, গেলে ৬০ টাকা ভাড়া দিতে হবে। না হলে যামু না। পল্টনের কাছে বায়তুল মোকাররম মসজিদের গেটে ফুটপাতের কাপড় বিক্রি করছিলেন রিপন শেখ, পল্টন ময়দানটি কোথায়, জানতে চাইলে তিনি মাথা নেড়ে জানালেন, চেনেন না।
বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের ৩ নাম্বার গেটের কাছে তালাচাবি সারেন আয়নাল মিয়া। প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি এই এলাকায় নানা কাজের সঙ্গে যুক্ত আছেন। এগিয়ে গিয়ে পল্টন ময়দানটা কোথায় জানতে চাওয়া হলে তিনি হাত উঁচু করে দেখালেন এই যে হ্যান্ডবল ফেডারেশনের ছাউনি দেখছেন, এটার দক্ষিণ পাশের ফাঁকা ছোট মাঠটাই পল্টন ময়দান।
পল্টন ময়দানের পশ্চিম কোণে মাঠের কিছু জায়গাজুড়ে নার্সারি করেছেন হানিফ হাওলাদার। তিনি বলেন, ২৫-৩০ বছর আগে এখানে অনেক মিছিল সমাবেশ হতো। তবে এখন আর কেউ এখানে আসে না। অনেকদিন ফাঁকা মাঠ পড়েছিল। এজন্য সরকার এখানে খেলাধুলার মাঠ করেছে। ফাঁকা পড়ে থেকে তো আর লাভ নেই।
জানা গেছে, পল্টন ময়দানটি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের অধীন। তবে পল্টন ময়দান মাঠের প্রশাসক বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষ। মূলত গত ওয়ান-ইলেভেন সরকারের পর পল্টন ময়দানের নিয়ন্ত্রণ পায় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ।
