রিসেট

সরকার বদলায় শুধু ভাগ্য বদলায় না উত্তরের মানুষের

প্রকাশিত: ২০ মে (শুক্রবার), ২০২২ Archive 2022Source: প্রতীক ওমর, উত্তরাঞ্চল ঘুরে

বাংলাদেশ জন্মের পর থেকেই ‘অবহেলিত’ ‘মঙ্গা’ এসব বিশেষণমূলক শব্দ নামের আগে লাগিয়ে দেয়া হয়েছে উত্তর জনপদের বেশ কিছু জেলার সঙ্গে। গাইবান্ধা, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় বরাবরই অবহেলিত। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট খুব বেশি পাল্টায়নি স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও। রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার ছিটেফোঁটা মাত্র জোটে এই অঞ্চলের মানুষদের। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান কোনো কিছুতেই তেমন আগ্রহ নেই সরকারের। সম্প্রতি অবকাঠোগত কিছু উন্নয়ন দেখা গেলেও সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদল শূণ্যের কোঠায়। ভাগ্য বদলে বংশ পরম্পরায় তাই নিজের শরীরই ভরসা তাদের। কৃষিকাজই প্রধান আয়ের উৎস। রাষ্ট্রীয়ভাবে এই অঞ্চলে কর্মমুখী প্রশিক্ষণ অথবা শিল্পকারখানা স্থাপনের মাধ্যমে উন্নত জীবন-যাপনের পথ বাতলে দেয়ার উদাহরণ সীমিত। কখনো ধানের ক্ষেত, কখনো তামাকের মাঠে শ্রম বিক্রি করেন বেশির ভাগ মানুষ। পঞ্চগড় জেলাতে দেখা মেলে পাথর কুড়ানো মানুষের। দেশের সর্ব উত্তরের উপজেলা তেঁতুলিয়ার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মহানন্দা নদীতে প্রচুর পরিমাণ নুড়ি পাথর পাওয়া যায়। স্থানীয় প্রায় ৩০ হাজার মানুষ সেই পাথর কুড়িয়ে সংসার চালান এখন। সরজমিন ঘুরে জানা গেছে, মহানন্দা পাড়ের বাংলাবান্ধা, পাগলিডাঙ্গী, সন্যাসীপাড়া, উকিলজোত, খয়খাটপাড়া, ইসলামপুরসহ আশপাশের প্রায় ৪০টি গ্রামের মানুষের জীবন-জীবিকা এই পাথরের ওপর নির্ভরশীল। শুধু মহানন্দাই নয়, করতোয়া এবং ডাহুক নদী থেকেও পাথর উত্তোলন করছেন এই অঞ্চলের মানুষ। পানিতে নেমে দলবদ্ধভাবে পাথর উত্তোলনের দৃশ্য দেখার জন্য তেঁতুলিয়া পয়েন্টে বছরজুড়ে পর্যটকদের দেখা মেলে। নদীটি পুরো অংশ ভারতের মধ্যে হওয়ায় পর্যটকদের নামতে দেয়া হয় না। শ্রমিকদের সঙ্গে মৌখিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে ওপারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বাংলাদেশি পাথর শ্রমিকদের নামতে দেয়। তবে নদীর বাংলাদেশি কিনারা অংশের মধ্যেই তাদের পদচারণা সীমাবদ্ধ রাখতে হয়। মাঝ নদীতে গেলেও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী এসব পাথুরে মানুষদের ধাওয়া করে। বন্দুকের নল সবসময় তাক করে বসে থাকে বিএসএফ। জীবননাশের শঙ্কাকে উপেক্ষা করেই এখানকার মানুষ প্রতিদিন মহানন্দার বুকে জীবিকা খোঁজেন। বাংলাদেশি সীমানাতেও বিজিবির টহল চলে সার্বক্ষণিক। পর্যটকদের সাবধান করেন তারা। সীমানা পার হতে দেয় না। স্থানীয় বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম মানবজমিনকে জানান, সকাল থেকে শুরু করে বিকাল পর্যন্ত মহানন্দায় পাথর উত্তোলন করেন। সারাদিনে যে পাথর জমা হয় তা স্থানীয় মহাজনদের কাছে বিক্রি করে ৫০০-৭০০ টাকা পান। এলাকায় অন্য কোনো কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়েই পাথর উত্তোলনের কাজ বেছে নিয়েছেন তারা।
পঞ্চগড় শহরের পাশেই রাজনগর খালপাড়া এলাকার করতোয় নদীর একটি স্পটে গিয়ে কথা হয় জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে। বলেন, এটাই তার জীবন-জীবিকার একমাত্র মাধ্যম। দিন যাচ্ছে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের মতো গরিব মানুষ ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। পাঁচ বছর আগে মহাজনরা যে দামে পাথর কিনেছে, এখনো সেই দাম। অনেকটা বাধ্য হয়েই কমদামে মহাজনদের হাতে এসব পাথর তুলে দেই।
একই এলাকার একজন নারী শ্রমিক অলিমা বেগম। তিনি জানান, কোদাল দিয়ে পাথর তুলতে কোমরে ব্যথা হয়েছে। বয়সের ভারে এখন আর ঠিকমত কাজ করতে পারি না। কিন্তু কিছুই করার নেই। পেটের ক্ষুধা মেটাতেই এমন কষ্টের কাজ করতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বয়স্ক ভাতার একটা কার্ড পেয়েছেন একবছর আগে। সেই কার্ডের টাকা অন্য কেউ প্রতারণা করে নিয়মিত তুলে নিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে মৌখিক অভিযোগ দিয়েও কোনো সুরাহা হয়নি। কষ্টের কথা বলতে গিয়ে দু’চোখ বেয়ে অশ্রু নেমে আসে তার। এদিকে পঞ্চগড় থেকে তেঁতুলিয়া, বাংলাবান্ধা পর্যন্ত বহু পাথর প্রক্রিয়াজাত কারখানা গড়ে ওঠেছে। কারখানাগুলোতে এসব পাথর বিভিন্ন সাইজে আলাদা করা হচ্ছে। বড় পাথর ভেঙে ছোট করা হচ্ছে। সেখান থেকে চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। রাস্তা-ঘাট অবকাঠামো নির্মাণে এসব পাথরের বড় একটা বাজার রয়েছে। নদী থেকে পাথর উত্তোলনকারীদের থেকে কমদামে এসব পাথর কিনে মিলমালিকরা প্রক্রিয়াজাত করে বেশি দামে বিক্রি করছেন। শ্রমিকদের ভাগ্য নিম্নমুখী হলেও মহাজনদের ভাগ্যের চাকা এদের হাত দিয়েই সামনের দিকে যাচ্ছে। পঞ্চগড়ের কৃষিতে নতুন করে যোগ হয়েছে চা বাগান। বেশ কিছু নামিদামি কোম্পানি চা চাষ এবং প্রক্রিয়াজাত করছে পঞ্চগড়ে। এখানেও অবহেলিত চা শ্রমিক এবং সাধারণ চা চাষিরা। চায়ের বাগানে কাজ করেন বেশির ভাগ উপজাতি সম্প্রদায়ের লোকজন। বাইরের মানুষের সঙ্গে কথা বলা বারণ। শ্রমিকদের একজন সরদার রয়েছে। তাকে মুন্সি বলে। ওই মুন্সি কারও সঙ্গে কথা বলতে দেখলে তার ওপর চলে মানসিক নির্যাতন। তাই ভয়ে সহজে মুখ খুলে না শ্রমিকরা। একটি চা বাগানে কিছু নারী শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। দ্রুত তথ্য দিয়ে সরে যান তারা। বলেন, সারাদিন তাদের মজুরি ২০০ টাকা। ওই টাকা দিয়ে কোনো রকম সংসার খরচ চলে তাদের। অপরদিকে বড় কোম্পানিগুলোর দাবার চালে সাধারণ চা চাষিরা বরাবরই ক্ষতির সম্মুখীন। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে খুব কম দাম পান তারা। ওই অঞ্চলে প্রতিনিয়তই ক্ষুব্ধ সাধারণ কৃষকরা রাস্তায় চা পাতা ফেলে বিক্ষোভ করেন। সেই বিক্ষোভে আজ পর্যন্ত কারও কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। 
গোটা উত্তরাঞ্চল কৃষি নির্ভর। ধান, গম, ভুট্টা, সবজি সবকিছুর জোগান দেয় উত্তরের কৃষকরাই। মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপটে পিষ্ট কৃষক। জমিতে থেকে ফসল তুলে কৃষক দাম পাচ্ছে না। সেই পণ্য ঠিকই আড়তে গিয়ে দুইগুণ তিনগুণ বেশি দামে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। গাইবান্ধা এলাকার তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা জাহিদ খন্দকার বলেন, তিনি গেল তিন বছর ধরে কৃষি ফার্ম করেছেন। তার ফার্মে বিভিন্ন ধরনের ফসলের চাষ করছেন। বলেন, কাউকে যদি অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস করার চিন্তা করা হয় তাকে কৌশলে আবাদমুখি করাতে হবে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, কৃষি উৎপাদনে যে পরিমাণ খরচ অনেক সময় তার ৮০ ভাগও ওঠে না। তিন বছরে তিনি কয়েক লাখ টাকা লোকসান গুনেছেন বলে  উল্লেখ করেন। এই অঞ্চলে নারীরাও অনেক পিছিয়ে। কোনো উন্নয়নের ছোঁয়াও লাগেনি তাদের। স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার ক্ষেত্রেও বৈষম্যের শিকার উত্তরাঞ্চলের মানুষ। নদী অধ্যুষিত প্রত্যন্ত চরের মানুষ এখনো ভালো চিকিৎসা পাচ্ছে না। হাসপাতাল নেই। ভালো ডাক্তার নেই। ঝাড় ফুঁক আর কবিরাজি চিকিৎসাই তাদের একমাত্র ভরসা। বাণিজ্যিক এলাকা তৈরির উদ্যোগও চোখে পড়ে না তেমন। ব্যক্তি উদ্যোগে যতটুকু সম্ভব হয়েছে ততোটুকুই কোনো রকম টিকে আছে। বগুড়ায় বিমানবন্দর প্রস্তুত আছে। শুধুমাত্র চালুর ঘোষণার অভাবে অকেজো। উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন নিয়ে ভাবেন, কথা বলেন, এমন একজন সচেতন নাগরিক ডাক্তার এ এইচ এম মশিহুর রহমান। তিনি মানবজমিনকে বলেন, কয়েক বছর আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বগুড়ার আলতাফুন্নেসা খেলার মাঠে জনসভায় কথা দিয়েছিলেন বগুড়াকে বিভাগ করার। তিনি সেই কথা রাখেননি। তিনি মূলত বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের মানুষদের সঙ্গে বিমাতা সুলভ আচরণ করছেন। ডাক্তার এ এইচ এম মশিহুর আরও বলেন, অখ্যাত জায়গাগুলোতে এই সরকার বিশ্ববিদ্যালয় করার উদ্যোগ নিয়েছে, কিছু জায়গায় করেছে অথচ বগুড়ার মতো একটা বড় জায়গায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় দিচ্ছে না। এছাড়াও এই অঞ্চলের শিক্ষিত বেকার যুবকদের সরকারি চাকরির সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। কেবলমাত্র রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতার কারণেই এই অঞ্চল পুরো অন্ধকারে। বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেললাইন স্থাপনও অনেকটা মূলা ঝুলোনোর মতোই মনে হচ্ছে। এসব বিষয় নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ বিভাগের অধ্যাপক ড. হাসানাত আলী মানবজমিনকে বলেন, উত্তরাঞ্চল উন্নয়ন বঞ্চিত হওয়ার অন্যতম কারণ নেতৃত্বের ব্যর্থতা। রাষ্ট্রের প্রধান চালিকা শক্তি সচিবালয়ে বগুড়া তথা উত্তরাঞ্চল বিদ্বেষী কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি। তারা কোনোভাবেই এই অঞ্চলের উন্নয়ন চায় না। 
গেলো কয়েক দিন উত্তরজনপদের বিভিন্ন এলাকা সরজমিন ঘুরে রাস্তা-ঘাটের দৃশ্যমান উন্নয়ন চোখে পড়েছে। সড়কে অসংখ্য বড় সেতু নির্মাণ হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ এই সব উন্নয়নে নিজেদের পরিবর্তন করার মতো কোনো উপকরণ পায়নি। কৃষকদের উন্নয়ন, শ্রমিকদের উন্নয়ন, শিক্ষিত বেকার তরুণদের কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেই বললেই চলে। আকাশ পথের যাতায়াতের অভাবে উত্তরের প্রাণকেন্দ্র বগুড়াতেও ভারী শিল্প কারখানা গড়ে উঠছে না। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সড়কপথের যানজট ঠেলে এই অঞ্চলে পরিদর্শনে আনারও কোনো সুযোগ নেই।