রিসেট

৩১ দফা কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন

প্রকাশিত: ২১ জানুয়ারি (বুধবার), ২০২৬ Archive 2022Source: স্টাফ রিপোর্টার

রাজধানীতে আয়োজিত পলিসি সামিটে ৩১ দফা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেছে জামায়াতে ইসলামী। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আয়োজিত দিনব্যাপী এই সামিটে বিশিষ্ট ব্যক্তি, কূটনীতিক, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের সূচনা ও সমাপনী বক্তব্য রাখেন দলের আমীর ডা. শফিকুর রহমান। অনুষ্ঠান মঞ্চে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে দলটির নারী নেত্রীরা উপস্থিত ছিলেন। তারা বিভিন্ন প্রশ্নেরও জবাব দেন। 

অনুষ্ঠানে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী এমন একটি রাষ্ট্র গঠনে বিশ্বাস করে যেখানে আধুনিক বাজার অর্থনীতি কার্যকর থাকবে, প্রশাসনিক কাঠামো হবে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক এবং ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিক সমান সুযোগ পাবে। তার ভাষায়, উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন তা ন্যায়, স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়।

নারীর অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে জামায়াত আমীর বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নারীর অংশগ্রহণের হারের দিক থেকে জামায়াতে ইসলামী শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমানে দলের মোট সদস্যের প্রায় ৪৩ শতাংশই নারী যা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। 

তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশে নারীরা যেন সমান নাগরিক হিসেবে তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা বিকশিত করতে পারে, সেজন্য প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষায় সমান অধিকার নিশ্চিত করা হবে। নারীদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে কোনো ধরনের বৈষম্য বরদাশত করা হবে না বলেও তিনি স্পষ্ট করেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যারা সমান সুযোগ, ন্যায় ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিশ্বাস করে, জামায়াতে ইসলামী তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে প্রস্তুত।

তরুণদের দেশের প্রবৃদ্ধির প্রধান ‘ইঞ্জিন’ হিসেবে উল্লেখ করে জামায়াত আমীর বলেন, নতুন বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থায় যুব কর্মসংস্থান সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। তিনি বলেন, কর্মসংস্থানহীন তরুণ সমাজ কোনো দেশের জন্য বড় ঝুঁঁকি আর কর্মক্ষম তরুণ সমাজই পারে একটি রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে। তিনি একটি আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন, যেখানে স্বচ্ছ বাজার অর্থনীতির পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশে একটি উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ অর্থনৈতিক পরিবেশ, শিল্পায়নের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই)-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার কথাও জানান তিনি।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ভবিষ্যতে কোনো সরকার যেন রাষ্ট্রীয় সম্পদ বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে সে বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী আপসহীন থাকবে। দুর্নীতি, লুটপাট ও স্বজনপ্রীতির সংস্কৃতি রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বচ্ছতা বজায় না থাকলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষাকে জামায়াত আমীর কেবল রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং একটি ‘পবিত্র ধর্মীয় কর্তব্য’ হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন, বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর দলে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী প্রায় পাঁচ লাখ সদস্য রয়েছেন, যারা দেশ গঠনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন। 

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জাতি, ধর্ম বা লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার রক্ষায় তার দল অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করবে এবং এ বিষয়ে কোনো আপস করা হবে না।

বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলার বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্থানীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ঐক্যের মধ্যদিয়েই একটি সমৃদ্ধ, মানবিক ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। 

‘পলিসি সামিটে ঘোষিত দলের পরিকল্পনার মধ্যে আছে-
১. দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে। ২.ট্যাক্স ও ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) বর্তমান হার থেকে ক্রমান্বয়ে কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ট্যাক্স ১৯ শতাংশ ও ভ্যাট ১০ শতাংশে নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হবে। ৩. স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড চালু করা হবে (এনআইডি, টিআইএন, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা এক কার্ডে)। ৪.আগামী ৩ বছরে সব শিল্পে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির চার্জ বাড়ানো হবে না। ৫. বন্ধ কলকারখানা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে চালু এবং ১০% মালিকানা শ্রমিকদের প্রদান করা হবে। ৬. ব্যবসাবান্ধব পলিসি তৈরি করা হবে। সহজ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ৭. ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য সুদবিহীন ঋণ সুবিধা দেয়া হবে। ৮.  গ্রাজুয়েশন শেষে চাকরি পাওয়া পর্যন্ত সময়ে ৫ লাখ গ্রাজুয়েটকে সর্বোচ্চ ২ বছর মেয়াদি মাসিক সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত ঋণ (কর্জে হাসানা) প্রদান করা হবে। ৯.  মেধা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে ১ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ দেয়া হবে। ১০. প্রতিবছর বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য ১০০ শিক্ষার্থীকে সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ প্রদান করা হবে। গরিবের মেধাবী সন্তানও যেন হার্ভার্ড, এমআইটি, অক্সফোর্ড, ক্যাম্ব্রিজে পড়তে পারে। ১১. ইডেন, বদরুন্নেসা ও হোম ইকোনোমিক্স কলেজকে একীভূত করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। ১২. জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বড় কলেজগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হবে। ১৩. সকল নিয়োগ হবে মেধাভিত্তিক। ১৪. ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স্ক ও ৫ বছরের নিচে শিশুদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হবে। ১৫. ৬৪ জেলায় ৬৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হবে। ১৬. ‘ফার্স্ট থাউজেন্ড ডেইজ প্রোগ্রাম’-এর আওতায় গর্ভধারণ থেকে শুরু করে শিশুর বয়স দুই বছর বয়স পর্যন্ত মা ও শিশুর প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় নিয়ে আসা হবে। 

১৭. দক্ষ জনশক্তি ও জব প্লেসমেন্টের জন্য নতুন মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। ১৮. ৫ বছরে ১ কোটি তরুণকে বাজারভিত্তিক স্কিল প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। ১৯. প্রতিটি উপজেলায় গ্র্যাজুয়েটদের জন্য ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ স্থাপন করা হবে। ২০. প্রতিটি জেলায় ‘জেলা জব ইয়ুথ ব্যাংক’ গঠন করে ৫ বছরে ৫০ লাখ জব এক্সেস নিশ্চিত করা হবে। ২১. নারী, তরুণ ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে প্রাধান্য দিয়ে ৫ লাখ উদ্যোক্তা তৈরি করা হবে। ২২. ১৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার তৈরি করা হবে। ২৩.স্বল্পশিক্ষিত যুবকদের জন্য উপযোগী স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালু করা হবে।  ২৪. আইসিটি সেক্টর উন্নয়নে ‘ভিশন ২০৪০’ ঘোষণা করা হবে। ২৫. ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ লাখ আইসিটি জব সৃষ্টি ও প্লেসমেন্ট করা হবে। ২৬. ফ্রিল্যান্সার ও ডিজিটাল রপ্তানির জন্য ন্যাশনাল পেমেন্ট গেটওয়ে স্থাপন করা হবে। ২৭. আইসিটি সেক্টর থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় করার লক্ষমাত্রা গ্রহণ করা হবে। ২৮. আইসিটি খাতে সরকারের ১৫০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় সাশ্রয় লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হবে। ২৯.  শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হবে। 

৩০. দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে ৫-৭ বছরের মধ্যে রেমিট্যান্স আয় দুই থেকে তিনগুণ বৃদ্ধি করা হবে। ৩১. অর্থনৈতিক রেমিট্যান্সের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশি প্রফেশনাল, গবেষক, শিক্ষকদের দেশে নিয়ে আসা হবে ‘ইন্টেলেকচুয়াল রেমিট্যান্স’ হিসেবে। 

পলিসি সামিটে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, পাকিস্তান, কসোভো, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, শ্রীলংকা, ব্রুনাই, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, ডেনমার্ক, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, ইরান, কানাডা, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, লিবিয়া, আলজেরিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, নরওয়ে, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, দক্ষিণ কোরিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, স্পেন, ব্রাজিল, জাতিসংঘ, ইউএনডিপি, আইআরআইসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন। 

বিশিষ্টজনের মধ্যে সিপিডি’র প্রথম নির্বাহী পরিচালক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, প্রবীণ সাংবাদিক আবুল আসাদ, দৈনিক নয়াদিগন্তের সম্পাদক সালাউদ্দিন বাবর, দ্য নিউ নেশন সম্পাদক মোকাররম হোসেন, ডিইউজে- সভাপতি শহিদুল ইসলাম, প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। 

জামায়াতের নেতাদের মধ্যে ছিলেন নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মু. তাহের ও মাওলানা আ.ন.ম. শামসুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এ.টি.এম. মা’ছুম, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম ও এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন ও মোবারক হোসাইন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।