রিসেট

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের খসড়া মহাপরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন সিপিডি’র

প্রকাশিত: ১৬ জানুয়ারি (শুক্রবার), ২০২৬ Archive 2022Source: অর্থনৈতিক রিপোর্টার

অন্তর্বর্তী সরকারের করা জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা কার স্বার্থে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। এমনকি এটি কোনো চুক্তির পূর্বশর্ত পূরণে করা হয়েছে কিনা সেই প্রশ্নও সংস্থাটির। এ ছাড়া এ মুহূর্তে এলএনজিসহ জ্বালানি খাতে যে সংকট রয়েছে, খসড়ায় তা অনুপস্থিত রয়েছে বলেও দাবি সিপিডি’র।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমণ্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত “অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবিত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (২০২৬-২০৫০): সিপিডি’র তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায়” সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এসব তথ্য জানান। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ 
উপস্থাপন করেন সিপিডি’র সিনিয়র রিসার্চ এসোসিয়েট হেলেন মাশিয়াত প্রিওতি।

এই মহাপরিকল্পনা কোনো চুক্তির পূর্বশর্ত পূরণ কিংবা কার স্বার্থে করা হয়েছে এমন প্রশ্ন রেখে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, একটি উন্মুক্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশে যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া গবেষণামূলক হওয়ার কথা, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি দেশের লক্ষ্যের সঙ্গে তা সাযোজ্যপূর্ণ হওয়ার কথা, যেখানে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সম্পৃক্ত হওয়ার কথা, যেখানে এ ধরনের প্রক্রিয়া অংশগ্রহণমূলক হওয়ার কথা, তার কোনোটিই আমরা এখানে দেখলাম না।

তিনি বলেন, এমনকি এই মুহূর্তে বিভিন্ন রকমের যে সংকট চলছে সেই সংকট সমাধানের বিষয়গুলোকেও যে বিবেচনায় নেয়ার কথা- এই খসড়া প্রণয়নে তার খুবই ম্রিয়মান উপস্থিতি বা বলতে গেলে সেগুলো আসলে এক অর্থে অনুপস্থিত। তাহলে প্রশ্ন হলো অন্তর্বর্তী সরকার মাত্র এক মাস সময়কালের আগে যখন তারা নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন, কেন তাড়াহুড়া করে এই মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ, কেন এই তোড়জোড়? এটা কি কাউকে তুষ্ট করার জন্য? কোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্ব শর্তের অংশ হিসেবে কি এরকম কিছু করা হচ্ছে? তিনি আরও বলেন, আমাদের কাছে মনে হয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মহাপরিকল্পনার যে খসড়া, তা ত্রুটিপূর্ণ। যা অংশগ্রহণমূলক নয় এবং একটি বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ এখানে রক্ষা করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এ পরিকল্পনা কার্বন নিঃসরণ রোধ প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করবে এবং দেশে জীবাশ্ম জ্বালানির সমপ্রসারণ করবে ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করবে। অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত এই মহাপরিকল্পনার কার্যক্রম স্থগিত করা।’ একইসঙ্গে নতুন নির্বাচিত সরকারের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন তিনি। গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘নতুন নির্বাচিত সরকারের একটি নতুন পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া উচিত। তা যেন গবেষণাধর্মী, অংশগ্রহণমূলক ও দেশের সকল পক্ষকে সঙ্গে রেখে একটি সাযুজ্যপূর্ণ পরিকল্পনা তৈরি করা হোক।’ গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দশককাল ধরে সিপিডি পাওয়ার এনার্জি সেক্টর নিয়ে কাজ করছে। কোনো ধরনের আলাপ আলোচনা ছাড়া, কোনো বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ছাড়া, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এ ধরনের একটা কাজ গোপনে শেষ করা আগের সরকারের আচরণের মতোই। তিনি আরও বলেন, আগামীতে যারা নির্বাচিত হবে, সেই সরকারে জ্বালানি খাতে যেন সাউন্ড মন্ত্রী আসেন।

সিপিডি’র মতে, মহাপরিকল্পনায় বিদ্যুতের চাহিদা অত্যধিক দেখানো হয়েছে এবং নেপাল ও ভুটান থেকে সাশ্রয়ীমূল্যে বিদ্যুৎ আনার সুযোগ পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। সরকার একটি ২৪ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি ২০৫০ সালের মধ্যে সৌর বা সোলার বিদ্যুতের উৎপাদন লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩২ গিগাওয়াট। তবে মহাপরিকল্পনায় দেখা যায়, ২০৪০ সালের আগে সৌর বিদ্যুৎ নিয়ে বড় কোনো প্রকল্প বা উদ্যোগ নেই।

সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নও খসড়া পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এতে ২০৪০ সালের জন্য ৫০ হাজার ৩৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। সিপিডি’র হিসাব অনুযায়ী, চাহিদা ৩০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হবে না। বাংলাদেশে নতুনভাবে কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আগ্রহ নেই। সিপিডি বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ভর্তুকি কমানোর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। সিপিডি আরও জানায়, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ চাহিদা ৭০ হাজার ৫১২ মেগাওয়াটে পৌঁছাবে। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত জ্বালানির মধ্যে ৪৫ শতাংশ আসে প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলএনজি থেকে, যা ২০৫০ সালের মধ্যে ২৯ শতাংশে নেমে আসবে। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বর্তমানে ১৭ শতাংশ, যা ২০৫০ সালের মধ্যে মাত্র ১ শতাংশে নামানো হবে। নতুন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ২০৫০ সালের মধ্যে জ্বালানি খাতে প্রায় ৭০ থেকে ৮৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। বিদ্যুৎ খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ধরা হয়েছে ১০৭.৪ বিলিয়ন ডলার।

সংবাদ সম্মেলনে সিপিডি’র পক্ষ থেকে আরও উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র রিসার্চ এসোসিয়েট হেলেন মাশিয়াত, রিসার্চ এসোসিয়েট মেহেদী হাসান শামীম, আবরার আহমেদ, আতিকুজ্জামান সাজিদ, সাবিহা শারমিনসহ অন্য গবেষকরা।