রিসেট

নজরুলের উচ্চারণে হাদির চূড়ান্ত ঠিকানা

প্রকাশিত: ২১ ডিসেম্বর (রবিবার), ২০২৫ Archive 2022Source: নিয়াজ মাহমুদ

বাংলা কবিতার ইতিহাসে কিছু পঙ্‌ক্তি আছে, যা কেবল কবিতাই নয়-একটি দার্শনিক অবস্থান, একটি জীবনবোধ, একটি বিদ্রোহী আত্মপরিচয়ের দলিল। ‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই’-এই পঙ্‌ক্তি তেমনই। এটি ধর্মীয় অনুভূতির সহজ উচ্চারণ নয়, বরং সাম্য, মানবতা ও আত্মমর্যাদার এক অনন্য ঘোষণাপত্র। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার জীবনে যেমন এই বিশ্বাস ধারণ করেছিলেন, মৃত্যুতেও তেমনই তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর আজ সেই কবির কবরের পাশেই শায়িত হয়েছেন হাদি- এই ঘটনা নিছক একটি দাফন সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি গভীর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বার্তা।
হাদি কে? তিনি হয়তো রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রের কেউ নন, ইতিহাসের পাঠ্য বইয়ে তার নাম বড় করে লেখা থাকবে কি না, সেটিও সময় বলে দেবে। কিন্তু তিনি এমন এক জীবন যাপন করেছেন, যা নজরুলীয় চেতনার সঙ্গে আশ্চর্য রকমের সাযুজ্যপূর্ণ অসামপ্রদায়িক, স্পষ্টভাষী, আপসহীন এবং ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়াতে সাহসী। নজরুল যেখানে ধর্মকে দেখেছেন মানবিকতার আলোকে, হাদিও তেমনই ধর্ম, রাজনীতি ও সমাজকে দেখেছেন মানুষের চোখ দিয়ে, ক্ষমতার নয়।

হাদি নজরুলকে শুধু পড়তেন না, তিনি অনুভব করতেন। ঘরোয়া আড্ডায়, সংকটময় রাজনৈতিক আলোচনার ফাঁকে, কিংবা নিছক এক কাপ চায়ের টেবিলে হাদি মাঝেমধ্যে আবৃত্তি করতেন নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। কণ্ঠ উঁচু করে নয়, নাটকীয় ভঙ্গিতে নয়-বরং গভীর বিশ্বাস নিয়ে। যেন কবিতার শব্দগুলো তার নিজেরই অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসছে। ‘আমি চির-বিদ্রোহী বীর’-এই উচ্চারণ তার কাছে সাহিত্যিক লাইন ছিল না, ছিল ব্যক্তিগত অঙ্গীকার।

আজকের বাংলাদেশে ধর্মকে প্রায়ই রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ধর্মের নামে বিভাজন, বিদ্বেষ এবং ক্ষমতার বৈধতা তৈরির চেষ্টা নতুন কিছু নয়। এই প্রেক্ষাপটে নজরুলের কবরের পাশে হাদির দাফন যেন এক নীরব প্রতিবাদ। এটি বলে দেয়- ধর্ম কোনো দলের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়, এটি মানবতার আশ্রয়। মসজিদের পাশ মানে কেবল ধর্মীয় পরিচয় নয়, বরং নৈতিক অবস্থান।

হাদির দাফন সেই ধারালো দিকটিকেই সামনে আনে। এটি মনে করিয়ে দেয়, কবিতা কেবল বইয়ে থাকে না, কবিতা জীবনেও বাস করে। নজরুল গীতি বা কবিতা যেমন ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে, সামপ্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, তেমনই হাদির জীবনও ছিল আপসহীন সত্যভাষণের উদাহরণ। তাই তাদের পাশাপাশি শায়িত হওয়া কোনো কাকতাল নয়, এটি এক ধরনের ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার।

নজরুলের পাশে হাদিকে শুইয়ে রাখা মানে- আমরা এমন একটি বাংলাদেশ কল্পনা করি, যেখানে ধর্ম মানবতার বিপরীত নয়, যেখানে কবিতা ও প্রতিবাদ একে-অন্যের শত্রু নয়, এবং যেখানে মৃত্যুর পরও মানুষ তার বিশ্বাসের জায়গায় অবিচল থাকতে পারে।
ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায় এক মুসলিম পরিবারে ১৯৯৩ সালের ৩০শে জুন জন্মগ্রহণ করেন শরীফ ওসমান হাদি। তার বাবা ছিলেন মাদ্রাসা শিক্ষক। শৈশব কেটেছে সীমিত আয়ের পারিবারে, সংগ্রামের ভেতর দিয়ে। টিনশেডের ছোট ঘরেই তার বেড়ে ওঠা। মাওলানা আব্দুল হাদি ও তাসলিমা হাদির ছয় সন্তানের মধ্যে সবার ছোট ওসমান হাদি। এলাকাবাসীর ভাষ্য, শৈশব থেকেই হাদি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর।
 

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
E-mail: [email protected]