বিশ্ববাজারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশের বাজারেও পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটছে সোনার দাম। প্রায় প্রতিদিনই বাড়ছে। গড়ছে রেকর্ডের পর রেকর্ড। এতে প্রায় দুই যুগের ব্যবধানে সোনার দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এখন প্রতি ভরির দাম দুই লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। দাম কমবে, এমন কোনো লক্ষণ নেই। উল্টো দাম আরও বাড়ার ইঙ্গিত রয়েছে। সোনার দামের পাশাপাশি রুপার দামও বাড়ছে। মূলত বৈশ্বিক বাজারে টানা মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের বাজারেও সোনার দাম বাড়ছে বলে মনে করেন জুয়েলার্স ব্যবসায়ীরা। আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স (৩১.১০৩৪৭৬৮ গ্রাম) সোনার দাম ৪ হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ দর। এদিকে, নিরাপদ বিনিয়োগের সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দাম হু হু করে বাড়ায় বিক্রি কমেছে গয়নার।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে সোনা। সমাজের উচ্চ শ্রেণি ছাড়া আর কেউ সোনার অলংকার কিনছে না। এতে অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যদের ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিক্রয়কেন্দ্রগুলো ক্রেতাশূন্য। আর ছোট ও মাঝারি দোকানগুলো বেচা বিক্রির খরায় ভুগছে। তাদের মতে, বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশে স্বর্ণ ধরে রাখতে তাদেরও দাম বাড়াতে হচ্ছে, না হলে সব স্বর্ণ চলে যাবে সীমান্তের বাইরে অন্য কোনো দেশে। এমন পরিস্থিতিতে দেশে সার্বিকভাবে স্বর্ণ কেনা-বেচা ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশের মতো কমে গেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
সরজমিন দেখা গেছে, রাজধানীর স্বর্ণবাজারে দোকানে ভিড় আছে, কিন্তু বিক্রি নেই। কেউ পুরনো গয়না বদলাচ্ছেন। কেউ ছোট গয়না কিনছেন সামর্থ্য মতো। কেউ সঞ্চয়ের জন্য স্বর্ণ কিনছেন আবার কেউ শুধুই দাম জানতে এসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিরে যাচ্ছেন।
বিশ্ববাজারের প্রভাব: বিশ্ববাজারের প্রভাবে দেশেও হু হু করে বাড়ছে স্বর্ণের দাম। গত বুধবার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বর্ণের সর্বোচ্চ দাম উঠেছে। দেশের বাজারে এক মাস আগে অর্থাৎ আগস্টে এক ভরি স্বর্ণের যে দর ছিল তার থেকে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে এখন। এক মাসের ব্যবধানে কিনে রাখা এক ভরি স্বর্ণের দর বেড়ে গেছে ২০ শতাংশের মতো। গেল ৩০শে অগাস্ট ২২ কারেটের প্রতি গ্রাম স্বর্ণের দর ছিল ১৪ হাজার ৯৪৫ টাকা। সবশেষ গত বুধবার তা হয় ১৭ হাজার ৯২৭ টাকা। অর্থাৎ প্রতি গ্রামে বেড়েছে ২ হাজার ৯৮২ টাকা বা ১৯.৯৫ শতাংশ। এতে এক ভরিতে (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম বেড়েছে ৩৪ হাজার ৭৮২ টাকা।
দেশের ইতিহাসে রেকর্ড: সবচেয়ে ভালো মানের (২২ ক্যারেট) প্রতিভরির দাম বেড়েছে ৬ হাজার ৯০৫ টাকা। দেশের ইতিহাসে এর আগে কখনই সোনার দর একবারে এতটা বাড়েনি। ফলে এক ভরি ২২ ক্যারেট মানের সোনার গহনা কিনতে ২ লাখ ৯ হাজার ১০০ টাকা লাগছে। অন্যান্য মানের সোনার দরও প্রায় একই হারে বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে দেশের স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)।
মাস জুড়ে অস্থির: বাজুসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর মাস জুড়ে অস্থির ছিল দেশের সোনার বাজার। পুরো মাসে মোট ১২ বার দাম সমন্বয় করেছে বাজুস। এরমধ্যে ১০ বারই বেড়েছে দাম, কমেছে মাত্র দুইবার। সেপ্টেম্বর মাসে ২২ ক্যারেট মানের প্রতিভরি সোনার দাম বেড়েছে ২১ হাজার ৬৬ টাকা। সেই উল্লম্ফন অক্টোবর মাসেও চলছে। এই মাসের আট দিনে চার দফায় ২২ ক্যারেট মানের সোনর দাম ভরিতে ১৩ হাজার ৭১৫ টাকা বেড়েছে। চলতি বছর (২০২৫ সাল) এখন পর্যন্ত মোট ৬৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় হয়েছে। এরমধ্যে ৪৫ বারই বেড়েছে, আর কমেছে মাত্র ১৮ বার। গত বছর (২০২৪ সাল) পুরো সময়ে দাম সমন্বয় হয়েছিল ৬২ বার।
আন্তর্জাতিক বাজারে রেকর্ড গড়ার পর দেশের বাজারেও মূল্যবান এই ধাতুর দাম বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছে বাজুস। বাজুসের নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার থেকে দেশের বাজারে হলমার্ক করা এক গ্রাম ২২ ক্যারেট মানের সোনা ১৭ হাজার ৯২৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতিভরি বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ৯ হাজার ১০০ টাকায়। ২১ ক্যারেটের এক ভরি কিনতে লাগছে ১ লাখ ৯৯ হাজার ৫৯৪ টাকা। ১৮ ক্যারেটের ১ লাখ ৭১ হাজার ৮৮ টাকায় এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতিভরি সোনা ১ লাখ ৪২ হাজার ৩০১ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রুপার দরও বেড়েছে: রুপার দামও বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বাজুস। সংগঠনটি জানিয়েছে হলমার্ক করা প্রতিভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেট মানের রুপা ৪ হাজার ৯৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বুধবার বিক্রি হয়েছে ৪ হাজার ৬৫৪ টাকায়। এ হিসাবে ২২ ক্যারেট মানের রুপার দাম ভরিতে ৩৯৯ টাকা বেড়েছে।
বিশ্ববাজারে আরও দাম বেড়েছে: বিশ্ববাজারেও সোনার দর রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ছে। প্রতি আউন্সের (৩১.১০৩৪৭৬৮ গ্রাম) দাম ৪ হাজার ৫০ ডলার ছাড়িয়েছে। গত বুধবার বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৭৩ ডলার ৩৯ সেন্ট বেড়ে ৪ হাজার ৫৩ ডলার ৭৯ সেন্টে উঠেছে। শতাংশ হিসাবে বেড়েছে প্রায় ২ শতাংশ।
দাম আরও বাড়বে: রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় কারণে বিনিয়োগকারীরা সোনায় বিনিয়োগে ঝুঁকেছেন। যুক্তরাষ্ট্র নীতি সুদহার আরও কমাতে পারে-এ আশঙ্কায় দাম আরও বেড়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে সোনা ক্রয় করছে। সে কারণে চলতি বছর বৈশ্বিক বাজারে সোনার দাম এখন পর্যন্ত ৫১ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক ও আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস গত সোমবার দেয়া এক পূর্বাভাসে বলেছে, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৪ হাজার ৯০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
সরজমিন: বায়তুল মোকাররমের গ্রামীণ জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী জাহিদুর রহমান বলেন, স্বর্ণের সরবরাহ কমে গেছে। বেশির ভাগই আসছেন পুরনোটার সঙ্গে আরও কিছুটা যোগ করে নতুন নকশার গয়না তৈরি করে নিতে। একেবারে নতুন যারা কিনছেন তারা বেশির ভাগই এক ভরি ওজনের কিনছেন। তিনি বলেন, আমরা তো আমদানি করি না। বেশি আসে হাতে হাতে। বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে যা পাই, তাই কিনি। দাম তো তারাই ঠিক করে। তারা স্বর্ণের বার বিক্রি করে, গয়না তৈরি করি আমরা। তিনি বলেন, ‘গোল্ড’ হচ্ছে এখন ‘সেকেন্ড কারেন্সি’। ডলারের দাম নাকি কমে যাবে, তাই স্বর্ণ কিনে রাখছে সবাই। এজন্যই দিনকে দিন দাম বেড়ে যাচ্ছে। এখন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে আমাদের দেশেও বাড়াতে হবে। কারণ হলো, এটা না বাড়ালে স্বর্ণ তো দেশে থাকবে না। সব পাচার হয়ে যাবে।
শনির আখড়া অন্যন্যা জুয়েলার্সের শাখা ব্যবস্থাপক ভুবন দেবনাথ বলেন, স্বর্ণের দাম বাড়ায় বিক্রি কমে গেছে প্রায় ৩০ শতাংশের মতো। এভাবে দাম বাড়তে থাকলে মধ্যবিত্তরা তো কখনোই সোনার জিনিস কিনতে পারবে না। এখন যাদের টাকা আছে তারা সামনে দাম বাড়বে ভেবে স্বর্ণ কিনে জমিয়ে রাখছেন। তিনি বলেন, স্বর্ণের দাম বাড়ায় আমরা নিরাপত্তায় আশঙ্কায় আছি- কয়েকদিন আগে এক দোকানের ৫০০ ভরি স্বর্ণ লুট হয়ে গেছে। প্রশাসনের উচিত মার্কেটগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জাহিদ হাসান বিয়ে করেছেন তিন মাস আগে। বউকে নিয়ে এসেছেন কানের দুল নিতে। তিনি বলেন, ভেবেছিলাম দাম কমে গেলে কিনবো- কিন্তু যেই হারে স্বর্ণের দাম হু হু করে বাড়ছে তা আয়ের বাইরে চলে যাবে তাই এখনই কিনতে এসেছি। আমরা মধ্যবিত্ত মানুষ দাম বেড়ে গেলে আমাদের কেনার সামর্থ্য থাকে না। বেতন তো আর বাড়ে না। নতুন কেনার সামর্থ্য নেই তাই পুরনোটা গলিয়ে নতুন করে নকশা করে নিচ্ছি।
বিক্রি নিয়ে ব্যবসায়ীদের বক্তব্য: জুয়েলার্স সমিতির সাবেক সভাপতি এনামুল হক বলেন, সোনা যেভাবে দ্রুত দামি হচ্ছে, তাতে বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে ধাতুটি। যদিও বিনিয়োগের সুযোগ নেই বললেই চলে। বেসরকারি তফসিলি ব্যাংকের মাধ্যমে সোনা বেচা-বিক্রির সুবিধা যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক চালু করে, তাহলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হতো। একই সঙ্গে জুয়েলারিশিল্পও লাভবান হতো।
বাজুসের দর নির্ধারণ সংক্রান্ত কমিটির চেয়ারম্যান মাসুদুর রহমান বলেন, ঢাকায় যেমন ক্রেতা কমেছে, তেমনি কমেছে সারা দেশেও। ঢাকার বাইরে ৪০ শতাংশের মতো ক্রেতা কমার ধারণা দিয়ে মাসুদুর রহমান বলেন, শুধু বাংলাদেশেই না, ভারতেও কমেছে ৩০ শতাংশের মতো।
