হেভিওয়েট সংসদীয় আসন চট্টগ্রাম-৮। দক্ষিণ চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলা এবং নগরের চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ ও বায়েজিদ বোস্তামি থানার আংশিক অংশ নিয়ে গঠিত এ আসন। বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপি’র দুর্গ হিসেবে পরিচিত। একসময় এ আসনে বিএনপি’র প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় থাকতেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরশেদ খান। তবে তার অবর্তমানে বিএনপি’র কিছুটা শক্তি ক্ষয় হয়েছে। তবে হারানো দুর্গ ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে দলটি। আর জামায়াত এক জনপ্রিয় চিকিৎসক নেতাকে প্রার্থী ঘোষণা করে মাঠে নামিয়েছে। আগামী নির্বাচনে মূলত বিএনপি’র সঙ্গে জামায়াতের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।
চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপি’র মনোনয়ন যুদ্ধে আছেন মূলত দু’জন। তারা হলেন- চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি’র আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ ও দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র সাবেক আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান। এছাড়া দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র সাবেক সদস্য সচিব মোস্তাক আহমেদ খানও মনোনয়নপ্রত্যাশী। তবে মাঠে তৎপরতা রয়েছে এরশাদ উল্লাহ ও আবু সুফিয়ানের। অপরদিকে, জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী হলেন- বিএমএ’র সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের নেতা ডা. আবু নাছের। ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আসনটি বিএনপি’র নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে নবম সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে জাসদ নেতা মঈনুদ্দীন খান বাদল নৌকা প্রতীক নিয়ে এ আসনে এমপি হন। তার মৃত্যুর পর দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দীন আহমেদ উপ-নির্বাচনে এমপি হন। তার মৃত্যুর পর উপ-নির্বাচনে এমপি হন মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নোমান আল মাহমুদ। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে এমপি হন আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুচ ছালাম।
এবার চট্টগ্রাম-৮ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী মহানগর বিএনপি’র আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ। গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সাবেক এ সিনিয়র সহ-সভাপতি ২০০৮ সালেও ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সে সময় তিনি জাসদ নেতা মঈনউদ্দীন খান বাদলের কাছে হেরে যান। এরপর তাকে আর মনোনয়ন দেয়া হয়নি। এবার তাকে মনোনয়ন দেয়ার জন্য দলের এক তরুণ নেতা জোর তদবির চালাচ্ছেন বলে কথিত আছে। আলহাজ এরশাদ উল্লাহ বলেন, ২০০৮ সালে চারদলীয় ঐক্যজোট থেকে আমাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল। সে সময় ষড়যন্ত্র করে আমাকে হারানো হয়েছিল। কিন্তু সেই থেকে এখনো সাধারণ মানুষের সঙ্গে রয়েছি। মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। আশা করছি দল আমাকে মূল্যায়ন করবে।
এদিকে মনোনয়ন যুদ্ধে এরশাদ উল্লাহর সমানে সমানে আছেন দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাবেক আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান। বিএনপি’র দুঃসময়ের এই নেতা দলটির হাইকমান্ডের গুড বুকে ছিলেন। বিশেষ করে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পূর্ববর্তী আন্দোলনে সক্রিয় থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। সে সময় চট্টগ্রামে বিএনপি’র যে কয়েকজন নেতা মাঠে ছিলেন তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তবে ৫ই আগস্টের পর ব্যবসায়ী এস আলম ইস্যুতে দল থেকে বহিষ্কৃত হন তিনি। যদিও পরবর্তীতে দলের প্রাথমিক সদস্য পদ ফিরে পেয়েছেন তিনি। এরমধ্যে নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠে সরব আছেন সাবেক এ ছাত্রনেতা। আবু সুফিয়ান মানবজমিনকে বলেন, দলের মনোনয়ন পেয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলাম। দুঃসময়ে-দুর্দিনে দলের পক্ষে কাজ করতে গিয়ে হামলা-মামলা সহ্য করতে হয়েছে। আশা করি আগামী নির্বাচনেও দল আমার ওপর আস্থা রাখবে। আগামী নির্বাচনে দল নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে সর্বোচ্চ ভোটে জয়ী হয়ে বিএনপিকে এ আসনটি উপহার দেয়ার চেষ্টা করবো।
অন্যদিকে, এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ডা. আবু নাছের। এলাকায় তিনি গরিবের ডাক্তার বলে পরিচিত। তার স্ত্রীও একজন স্বনামধন্য গাইনি চিকিৎসক। ভালো চিকিৎসক হিসেবে খ্যাতি থাকায় ভোটারদের বেশ প্রভাবিত করতে পারছেন ডা. নাছের। এরমধ্যে তিনি চান্দগাঁও, মোহরা, পাঁচলাইশ থেকে বোয়ালখালীর প্রত্যন্ত জনপদে গণসংযোগ করেই যাচ্ছেন। তার গণসংযোগে তরুণ ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গেছে। ডা. আবু নাছের বলেন, আমি দল-মত নির্বিশেষে জনগণের সঙ্গে ছিলাম এবং আছি। বছর জুড়ে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করেছি। আমরা সময় কাজে লাগাচ্ছি। আশা করছি, জনগণ আমাদের ওপর আস্থা রাখবেন। এছাড়াও আসনটিতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দলটির দক্ষিণাঞ্চলের যুগ্ম মুখ্য সংগঠক জোবায়রুল হাসান আরিফের নাম শোনা যাচ্ছে। তবে এনসিপি’র কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব মীর আরশাদুল হক জানান, এখনও কে কোন আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, তা চূড়ান্ত হয়নি। শিগগিরই চূড়ান্ত হবে।
এ আসনের কয়েকজন বাসিন্দা আক্ষেপ করে জানান, শহরের সঙ্গে যুক্ত এই আসন। মাঝখানে কর্ণফুলী নদী এবং কালুরঘাট একমুখী সেতু বিভক্ত করেছে উপজেলার লোকজনকে। তাই সবসময় এ আসনের শহরের অংশে উন্নয়ন বেশি হয়। পিছিয়ে থাকে বোয়ালখালীর বাসিন্দারা। বর্তমানে বোয়ালখালীবাসীর একটি দাবি কালুরঘাট সেতু নির্মাণ। যিনি প্রার্থী হবেন তার কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, এই সেতু যেন দ্রুত নির্মাণ করা হয়। পাশাপাশি বোয়ালখালীর স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়ন চাই আমরা।
