রিসেট

দেশে এখন দারিদ্র্য ২৮ শতাংশ, ঝুঁকিতে ১৮ শতাংশ পরিবার

প্রকাশিত: ২৬ আগস্ট (মঙ্গলবার), ২০২৫ Archive 2022Source: অর্থনৈতিক রিপোর্টার

তিন বছরের ব্যবধানে দেশে দারিদ্র্য বেড়েছে ১০ শতাংশের মতো। দেশে এখন দারিদ্র্যের হার প্রায় ২৮ শতাংশ। সরকারি হিসাবে ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৮.৭। এর বাইরে ১৮ শতাংশ পরিবার দারিদ্র্য সীমায় নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। 
সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয় ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) যৌথভাবে পরিচালিত এক গবেষণায় দারিদ্র্য বৃদ্ধির এই চিত্র উঠে এসেছে। ‘ইকনোমিক ডায়নামিকস অ্যান্ড মুড অ্যাট হাউজহোল্ড লেবেল ইন মিড ২০২৫’ শিরোনামের এই গবেষণা ফলাফল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এলজিইডি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রকাশ করা হয়। গবেষণাটি উপস্থাপন করেন পিপিআরসি’র নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান।
গবেষণাটি করা হয় গত মে মাসে, যেখানে ৮ হাজার ৬৭টি পরিবারের ৩৩ হাজার ২০৭ জন সদস্যের মতামত নেয়া হয়। পিপিআরসি বলেছে, দেশের এখন তিন ধরনের সংকটের প্রভাব চলমান। এগুলো হলো- কোভিড (২০২০-২০২২), মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। গত বছরের ৫ই আগস্টের পর থেকে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন প্রসঙ্গে পিপিআরসি প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের আগস্টের পর ঘুষ কমেছে। গবেষণায় অংশ নেয়া উত্তরদাতাদের মধ্যে গত বছরের আগস্ট মাসের আগে ৮.৫৪ শতাংশ সেবা নিতে ঘুষ দিয়েছেন। আগস্ট মাসের পর এই হার ৩.৬৯-এ নেমে এসেছে। এখনো সবচেয়ে বেশি ঘুষ দেয়া হয়েছে সরকারি অফিসে। এর পরে পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাদের বেশি ঘুষ দিয়েছে মানুষ। তবে সার্বিকভাবে ঘুষ দেয়া কিছুটা কমলেও বর্তমানে কোনো কাজ করতে গিয়ে ঝামেলা এড়াতে বেশি ঘুষ দিচ্ছে মানুষ। আওয়ামী লীগের সময়ে যেটি ছিল ২১.৫১ শতাংশ, সেটি এখন বেড়ে হয়েছে ৩০.৭৯ শতাংশ। 

পিপিআরসি’র গবেষণা অনুসারে, অতিদারিদ্র্যের হারও বেড়েছে। সরকারি হিসাবেই ২০২২ সালের অতিদারিদ্র্যের হার ছিল ৫.৬। ২০২৫ সালে এসে অতিদারিদ্র্য হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.৩৫-এ। এতে আরও বলা হয়েছে, এখনো ১৮ শতাংশ পরিবার যেকোনো সময় গরিব হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের পরিবারগুলোর গড় আয় কমেছে। কিন্তু খরচ বেড়েছে। শহরে মাসিক গড় আয় বর্তমানে ৪০ হাজার ৫৭৮ টাকা, খরচ ৪৪ হাজার ৯৬১ টাকা। ২০২২ সালে শহরের গড় আয় ছিল ৪৫ হাজার ৫৭৮ টাকা।
অন্যদিকে, গ্রামের পরিবারগুলোর গড় আয় কিছুটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ২০৫ টাকা এবং খরচ ২৭ হাজার ১৬২ টাকা। ২০২২ সালে গ্রামের গড় আয় ছিল ২৬ হাজার ১৬৩ টাকা। জাতীয় পর্যায়ে পরিবারের গড় আয় মাসে ৩২ হাজার ৬৮৫ টাকা, খরচ ৩২ হাজার ৬১৫ টাকা। ফলে সঞ্চয় প্রায় নেই বললেই চলে।

পিপিআরসি’র নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার সংগত কারণেই সামষ্টিক অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু এখন প্রয়োজন জনমুখী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। অর্থনীতির আলোচনাকে শুধু জিডিপি ঘিরে সীমাবদ্ধ না রেখে সমতা, ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীনতা ও নাগরিক কল্যাণ নিয়ে আলোচনা বাড়ানোর তাগিদ দেন তিনি। 
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় পাঁচটি নতুন ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র আমাদের বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। প্রথমত, আমাদের মাঝে দীর্ঘস্থায়ী রোগের বোঝা ক্রমেই বাড়ছে। ক্রনিক রোগ মোকাবিলার জন্য একটি নতুন ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, নারীপ্রধান পরিবারগুলো সমাজের সবচেয়ে নিচের স্তরে পড়ে আছে, তাই এদের বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, ঋণের বোঝা বাড়ছে, যা একটি বড় ধরনের সমস্যা হয়ে উঠছে। চতুর্থত, ক্রমবর্ধমান খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা। এটি এখনো ব্যাপক আকারে হয়নি, তবে ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং যা উদ্বেগজনক। পঞ্চমত, স্যানিটেশন সংকট উত্তরণ করে এসডিজি অর্জনের জন্য আমাদের হাতে মাত্র পাঁচ বছর আছে, কিন্তু এখনো প্রায় ৩৬ শতাংশ মানুষ নন-স্যানিটারি টয়লেট ব্যবহার করছে। ফলে নিরাপদ স্যানিটেশন নিশ্চিত করাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে, সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর এক সেমিনারে জানানো হয়, বাসাবাড়িতে নারীরা-পুরুষের তুলনায় চারগুণ বেশি কাজ করেন। ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ওপর এ ধরনের কাজের চাপ বেশি। তারা সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা এ ধরনের কাজ করেন। যেখানে একই বয়সী পুরুষেরা সপ্তাহে মাত্র ৫ ঘণ্টা কাজ করেন। তবে যৌথ পরিবারের নারীদের তুলনামূলক কাজের চাপ কম থাকে। ফলে তাদের জন্য উৎপাদনমুখী কাজের সুযোগ বেশি থাকে।